গসিপ করলে শরীরে কী পরিবর্তন হয়, জানেন?

গসিপ (পরচর্চা) কি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে? মস্তিষ্ক আর হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে? এককথায় এই প্রশ্নের উত্তর হবে, ‘হ্যাঁ।’ তবে ‘কিন্তু’ আছে। গসিপ মানসিক চাপ কমাবে নাকি বাড়াবে, মস্তিষ্ক ও হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখবে নাকি অবনতি ঘটাবে, তা কী ধরনের গসিপ করছেন, কী মাত্রায় করছেন, যার সঙ্গে করছেন সে কতটা নির্ভরশীল, এমন নানা কিছুর ওপর নির্ভর করে।

গসিপ করার সময় শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়ছবি: এআই/প্রথম আলো

গবেষণায় দেখা গেছে, গসিপ করার সময় শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোনকে অনেক সময় লাভ হরমোন বা বন্ডিং হরমোনও বলা হয়। এটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, সংযোগ ও সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করে। তাই ঠিক যে কারণে মানুষ প্রেমে পড়তে ভালোবাসে, একই কারণে গসিপ করেও আনন্দ পায়। গবেষণা বলছে, গসিপ মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। তাই বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় অন্যদের নিয়ে কথা বললে ‘ভালো লাগা’ তৈরি হয়, এটা শুধু মানসিক নয়, শারীরিকও। মস্তিষ্কে ‘রিওয়ার্ড’-এর অনুভূতি তৈরি হয়। মানুষ নিজেকে ‘গ্রুপের অংশ’ ও শক্তিশালী মনে করে।

গসিপ কেন মানসিক চাপ কমাতে পারে

১. আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেয়

আমরা যখন কারও সঙ্গে অন্য কারও বিষয়ে কথা বলি, তখন আসলে নিজের অনুভূতিগুলোও প্রকাশ করি। এর মাধ্যমে নিজের ভেতরের চাপ কিছুটা হালকা হয়।

২. সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে

গবেষণায় দেখা গেছে, গসিপ মানুষের খারাপ আচরণ প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণ করে। অসৎ বা প্রতারণামূলক মানুষ সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করে। মানুষকে ভালো আচরণ করতে উৎসাহ দেয়। সামাজিক নিয়ম বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৩. অন্যদের রক্ষা করার একটি উপায়

গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকে এমনকি নিজের ক্ষতি (টাকা হারানো, চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাই) নিয়ে অন্যদের সতর্ক করতে গসিপ করেন। মানে, গসিপ সব সময় খারাপ উদ্দেশ্যে নয়। অনেক সময় এটি ‘প্রোটেকটিভ বিহেভিয়ার’ বা নিরাপত্তামূলক আচরণের অংশ। এ কারণেই ‘প্রোসোশ্যাল গসিপ’কে বলা হয় সবচেয়ে উপকারী। কেননা, এখানে উদ্দেশ্য হয় অন্যকে সাহায্য বা সতর্ক করা।

গসিপের মাধ্যমে আমরা অনেক সময় সামাজিক নিয়ম, সম্পর্ক বা পরিস্থিতি সম্পর্কে শিখি
ছবি: প্রথম আলো

৪. সামাজিক সংযোগ বাড়ায়

মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ গসিপের মাধ্যমে সামাজিক বিশ্বস্ত বলয় তৈরি করে আসছে। বলা হয়, আপনি নিজের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ মানুষদের সঙ্গেই গসিপ করেন, হাসেন। গসিপ অনেক সময় বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে ‘বন্ধন’ তৈরি করে, যা মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।

৫. তুলনা করে খানিকটা স্বস্তি পাওয়া যায়

কখনো কখনো অন্যের সমস্যা শুনে মানুষ নিজের পরিস্থিতি নিয়ে একটু ভালো বোধ করে, এটিও মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

৬. তথ্য আদান-প্রদান

গসিপের মাধ্যমে আমরা অনেক সময় সামাজিক নিয়ম, সম্পর্ক বা পরিস্থিতি সম্পর্কে শিখি। একটা মানুষ সম্পর্কে পূর্বধারণা পেতেও সাহায্য করে। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে সাহায্য করে।

কখন গসিপ ‘স্বাস্থ্যকর’

এককথায়, যখন কাউকে ছোট করা, ক্ষতি বা অপমানের উদ্দেশ্যে গসিপ করা হয় না; বরং নিজের অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা শেয়ার করার অংশ হিসেবে হয়, তখন সেটি মন্দ নয়; বরং ভালোই।

গসিপ কি হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কের জন্যও ভালো

নিরীহ আলাপ বা গসিপ যদি আপনাকে হাসায়, তাহলে কর্টিসলসহ অন্যান্য স্ট্রেস হরমোন কমতে পারে
ছবি: পেক্সেলস

মানসিক চাপ কমলে হৃৎস্বাস্থ্যে কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। হালকা, নিরীহ আলাপ বা গসিপ যদি আপনাকে হাসায়, স্বস্তি দেয়, তাহলে কর্টিসলসহ অন্যান্য স্ট্রেস হরমোন কমতে পারে। স্ট্রেস কমলে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপও কিছুটা কমে। এটা হার্টের জন্য ভালো। আবার গসিপ সামাজিক যোগাযোগের একটি উপাদান। মানুষে মানুষে যোগাযোগ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কাজ করে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প করা, নানা কিছু শেয়ার করা—এসব মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। হালকা আড্ডা বা গসিপ অনেক সময় মন ভালো করে।

তবে…

সব গসিপ ভালো নয়। অনেক সময় ‘নেতিবাচক গসিপ’ নিজের ভেতরে অপরাধবোধ তৈরি করে। অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করে। নেতিবাচকতার চর্চা নিজের ভেতরেও নেতিবাচকতা বাড়ায়। অতিরিক্ত গসিপ করলে মানসিক অস্থিরতা কমার বদলে বাড়তে পারে। আর সময়, শক্তি ও মনোযোগ নষ্ট হয়। গসিপ থেকে যদি ভুল–বোঝাবুঝি বা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তাহলে তা উল্টো মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়, যা হার্টের জন্যও ক্ষতিকর। সব সময় অন্যের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকলে নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট হতে পারে। নিজের মনোযোগ বা সৃজনশীলতার জন্যও সেটা ক্ষতিকর।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে