একসময় যেসব সমস্যাকে অসম্ভব মনে হতো, সেগুলোরও সমাধান তুমি করতে পারবে
মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএমডির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিসা সু। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সমাবর্তন বক্তা ছিলেন তিনি। তাঁর নির্বাচিত কথামালা অনুবাদ করেছেন মো. সাইফুল্লাহ
জীবনে বহু বক্তৃতা দিয়েছি। তবে আজকের বক্তৃতাটা অন্য রকম। ব্যক্তিগতও বলতে পারো। আর কাণ্ড দেখো, মার্ফির সূত্র মেনে ঠিক আজকেই আমার গলা গেছে ভেঙে। কথাগুলো যদি একটু ফ্যাসফেসেও শোনায়, দয়া করে সহ্য কোরো।
১৯৮৬ সালের এক শরতে আমি এমআইটিতে এসেছিলাম। মা–বাবা আমাকে নেক্সট হাউসে (এমআইটির একটি হল) নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। তখন বয়স ১৭। জন্ম তাইওয়ানে, বড় হয়েছি (নিউইয়র্ক সিটির) কুইন্সে…আর তখন মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে গণিতে আমার দখল বেশ ভালো।
অতঃপর ক্লাসে ঢুকলাম। দুই সপ্তাহের মধ্যেই বুঝে গেলাম, এমআইটিতে এমন আরও অনেকে আছেন, গণিতে যাঁদের দখল শুধু ভালো নয়, অত্যধিক ভালো! মনে আছে, প্রথম দিকের সেই প্রবলেম সেটগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, বাপরে, কী কঠিন!
এমআইটির একটি অসাধারণ দিক আছে। এই প্রতিষ্ঠান তোমাকে এমন জায়গায় ঠেলে নিয়ে যাবে, যেখানে তুমি ভাবোইনি কখনো পৌঁছাতে পারবে। তুমি হয়তো একটা সমস্যা সমাধানের জন্য লড়াই করছ। একটি-দুটি সার্কিট পুড়িয়ে ফেলেছ। তারপর, কোনো না কোনোভাবে…জিনিসটা কাজ করেছে। সেই মুহূর্তে তোমার মনে হবে, আমি পারি! তোমার মনে হতে শুরু করবে, আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার।
স্নাতক পর্যায়েই গবেষণায় যুক্ত হতে পারার সুযোগও এমআইটির একটি দারুণ দিক। এটাই আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। প্রফেসর হ্যাঙ্ক স্মিথের ল্যাবে কাজ করতাম। সেই সময়ই সেমিকন্ডাক্টরের প্রেমে পড়ি।
এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, এমআইটিতে সম্ভবত ওই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি বেড়ে উঠেছিলাম। নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম। এই বিশ্বাস নয় যে আমি সব প্রশ্নের উত্তর জানি, বরং উত্তরটা না জানলেও আমি সেটা খুঁজে বের করতে পারব।
এখন বুঝি, এমআইটি আমাকে সেমিকন্ডাক্টর ফিজিকসের চেয়েও বড় কিছু শেখাচ্ছিল—মেনস ইত ম্যানুস (লাতিন কথাটার মানে মন ও হাত)। যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন ভাবতাম, এটা শুধুই এমআইটির মূলমন্ত্র। এখন মনে হয়, এই দুটি শব্দের জন্যই এমআইটি বিশেষ। এমআইটি তোমাকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়।
কিন্তু একই সঙ্গে কিছু করতেও শেখায়। নিজের ভাবনাগুলো পরীক্ষা করতে শেখায়। প্রথম পরীক্ষা, এমনকি পঞ্চম পরীক্ষাটাও যখন কাজ করে না, তখনো চেষ্টা চালিয়ে যেতে শেখায়। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করো, একসময় যেসব সমস্যাকে অসম্ভব মনে হতো, সেগুলোরও সমাধান তুমি করতে পারবে।
ক্যাম্পাস ছাড়ার পরও এই অনুভূতিটা আমি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম।
আইবিএমে যোগ দেওয়ার পর দেখলাম, আমাকে আবার সবকিছু একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হচ্ছে। আইবিএমে তখন কয়েক লাখ কর্মী। আমি ২৫ বছরের একজন তরুণী। ভাবছিলাম—এত বড় একটা প্রতিষ্ঠানে আদৌ কি কোনো পরিবর্তন আমি আনতে পারব?
কিন্তু খুব দ্রুতই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখে গেলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং তোমার বয়স নিয়ে ভাবে না। তোমার আইডিয়াটা কাজের কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমার একজন মেন্টর (পরামর্শক) একটা কথা বলেছিলেন, আজও সেটা আমি ভুলিনি, ‘সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর দিকে এগিয়ে যাও।’
তখন পুরোপুরি বুঝিনি এর অর্থ কী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, এটা ছিল আমার পাওয়া সবচেয়ে ভালো পরামর্শ। কারণ, কঠিন সমস্যাই তোমাকে শেখায়, তুমি আদতে কতটা সক্ষম।
একটা সময় এই পরামর্শটা পরখ করে দেখার সুযোগ পেলাম। এএমডির সিইও হলাম। এএমডির বিশাল সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু কোম্পানিটা বেশ কঠিন সময় পার করছিল। প্রথমেই আমাদের ঠিক করতে হয়েছিল, বড় হয়ে আমরা আদতে কী হতে চাই। বুঝতে পারছিলাম, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। আমরা আমাদের মেধাবী দলকে বড় করে ভাবার স্বাধীনতা দিলাম। পরের কয়েক বছরে এমন প্রযুক্তি তৈরি করলাম, যা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারগুলোকে সক্ষম করে তুলল।
আর এই পুরো যাত্রায় আমি এমআইটিতে শেখা প্রতিটি দক্ষতা কাজে লাগিয়েছি। আমি একে বলি প্রকৌশলীর সহজাত প্রবৃত্তি। যে সমস্যাকে অসমাধানযোগ্য মনে হচ্ছে, তার সামনে দাঁড়ানো, সমস্যাটাকে ছোট ছোট ভাগে ভেঙে ফেলা, আর ধাপে ধাপে পদ্ধতিগতভাবে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
গত কয়েক দশকে আমরা প্রযুক্তির বেশ কিছু বড় পরিবর্তন দেখেছি। ইন্টারনেট আমাদের যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। মোবাইল কম্পিউটিং আমাদের জীবনযাপন বদলে দিয়েছে। ক্লাউড কম্পিউটিং বদলে দিয়েছে কাজের ধরন। আর এখন আমরা এআই-ঢেউয়ের একদম শুরুর দিকে দাঁড়িয়ে।
এআই আমার কাছে অন্য পরিবর্তনগুলোর চেয়ে আলাদা। এটা এমন কোনো টুল নয়, যা আমাদের কাজ আরও দ্রুত করতে সাহায্য করবে; বরং এর ব্যাপ্তি আরও গভীর। প্রতিটা ক্ষেত্রে আবিষ্কারের গতি বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা এআইয়ের আছে। এআই আমাদের এমন সব সমস্যা সমাধানে সাহায্য করবে, যেগুলো আমরা আগে কখনোই করতে পারিনি।
এআই মানুষের জায়গা নেবে না; বরং মানুষকে আরও সক্ষম করবে।
ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেটা প্রযুক্তি ঠিক করে দেবে না। ঠিক করবে মানুষ। এআই যত সম্ভাবনাই তৈরি করুক, কোন সমস্যার সমাধান করা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা এআই ঠিক করতে পারে না। অসম্পূর্ণ তথ্য হাতে নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটাও এআইয়ের নয়। কোনো ফলাফলের দায় এআই নেয় না। এই দায়িত্ব আমাদের, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি।