থ্রিএমটি প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশি বিজয়ী আতিয়া বিনতে আমিন

সাময়িক ব্যর্থতাই আসল গন্তব্যে নিয়ে এসেছে আতিয়া বিনতে আমিনকে
ছবি: সংগৃহীত

মা–বাবা চাইতেন মেয়ে চিকিৎসক হোক। মেয়ের মাথায়ও ছোটবেলা থেকে মা-বাবার এই চাওয়া শক্তভাবে গেঁথে গিয়েছিল। স্কুল–কলেজেও তিনি বরাবর ভালো ফলই করেছেন। তবে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় পর বড় ধরনের হোঁচট খেলেন, ভর্তির জন্য যথেষ্ট নম্বর পাননি। এর চেয়ে বড় ধাক্কাটা এল চারপাশ থেকে। আশপাশের সবার দৃষ্টিতে একধরনের উপেক্ষা—‘এত ভালো ছাত্রী, পারল তো না!’ মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন আতিয়া বিনতে আমিন। পরের বছরও পরীক্ষা দিয়ে সফল হলেন না। তবে সেবার আর অতটা ভেঙে পড়লেন না। কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, মেডিকেল ভর্তি হতে না পারার ব্যর্থতা তাঁকে তাই–ই শিখিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপে আতিয়া আমিন বলেন, ‘সাময়িক ব্যর্থতাই আমাকে আসল গন্তব্যে নিয়ে এসেছে। বুঝতে পারি, আমি আসলে চিকিৎসক নয়, বিজ্ঞানীই হতে চেয়েছিলাম। ’

কানাডার মনট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবদেহের জিনতত্ত্বের ওপর এখন পিএইচডি করছেন আতিয়া বিনতে আমিন। গত ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ‘নর্থ আমেরিকান ফাইনাল’ নামে থ্রি মিনিট থিসিস বা থ্রিএমটি প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন তিনি। থ্রিএমটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীকে তিন মিনিটে স্নাতক গবেষণার বিষয়বস্তু বর্ণনা করতে হয়। সেই বর্ণনা হতে হয় এমন, যাতে সাধারণ মানুষও সহজে বুঝতে পারে। আতিয়া বলেছিলেন কালাজ্বর নিয়ে। একই প্রতিযোগিতায় এর আগে কানাডায় বিশ্ববিদ্যালয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্বে বিজয়ী হন তিনি। আনন্দের কথা, এ বছর ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে গত ২৮ নভেম্বর কানাডা সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ‘ভ্যানিয়ের স্কলারশিপ’ও পেয়েছেন আতিয়া। এই বৃত্তির আর্থিক মূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার (১ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি)।

গবেষণা কাজের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের জন্য বৃত্তি নিয়ে পড়ার সুযোগ পান আতিয়া
ছবি: সংগৃহীত

আতিয়া আমিন ময়মনসিংহের মেয়ে। তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে আতিয়া বড়। আতিয়া ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিদেশে পাড়ি দেওয়ার আগে ২০১৬ সালে বিয়ে করেন। স্বামী হক মুহাম্মদ ইশফাকও ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করছেন।

‘২০১২ সালের আগে কম্পিউটার চালাইনি’

আতিয়া বললেন, ‘দেশে কোনো পরিবারে পরপর তিন মেয়ে থাকাকে ভালো চোখে দেখা হয় না। একেবারে সাধারণ পরিবারে বড় হয়েছি। আশপাশের মানুষের মনোভাব দেখে ভাবতাম, অনেক পড়ালেখা করতে হবে। বাকি দুই বোন যেন আমাকে অনুসরণ করে।’ তিনি জানান, মা–বাবা কোনোদিন মেয়ে বলে বৈষম্য করেননি; বরং পড়ালেখার পাশাপাশি নাচ, গান, আবৃত্তি, বিতর্কসহ নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আর সেসব কাজে যুক্ত হয়ে তিনি বাসা ‘ভর্তি’ করে ফেলেছেন পুরস্কার দিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে আরেক সমস্যার মুখোমুখি হন আতিয়া। আর তা হলো, স্নাতকের ছাত্রছাত্রীদের জন্য গবেষণার সুযোগের অপ্রতুলতা। তিনি বলেন, ‘গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য যেকোনো ল্যাবে একটু কাজের সুযোগের জন্য কত জায়গায় যে গিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। মাত্র দ্বিতীয় বর্ষে পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী গবেষণা করতে চায়, দেশের বাইরে বৃত্তি নিয়ে মাস্টার্স করতে যেতে চায়, এটা হয়তো তখনো অতটা বিশ্বাসযোগ্য ছিল না।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সুযোগ দেওয়ার পর তাঁর অধীনে দুই বছর গবেষণা ল্যাবে কাজ করেন আতিয়া। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ক্লাস করার পর রাত নয়টা পর্যন্ত ল্যাবে কাজ করতেন। ওই গবেষণা কাজের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের জন্য বৃত্তি নিয়ে পড়ার সুযোগ পান তিনি।

আতিয়া বলেন, ‘২০১২ সালের আগে যে ‘আমি’ নিজে নিজে কম্পিউটার কীভাবে চালাতে হয় জানতাম না, সেই ‘আমি’ই এখন কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করি। বিশাল বিশাল জিনোমিক ডেটা নিয়ে সবচেয়ে দ্রুতগতির ক্লাউড কম্পিউটারে আমার কাজ। যে আমি ইংরেজিতে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না, সেই আমি এখন থ্রি মিনিট থিসিসের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিজয়ী।’

সম্প্রতি দেশে এসেছিলেন আতিয়া
ছবি: সংগৃহীত

গত জানুয়ারি মাসে দেশে এসেছিলেন আতিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ নিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত। তিনি বলেন, ‘জীবনে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে!’

এখন যা করছেন

আতিয়াদের ছয়জনের দল গবেষণায় দেখিয়েছে, কালাজ্বর সৃষ্টিকারী পরজীবী কীভাবে ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কীভাবে একধরনের বুদ্‌বুদ (বিজ্ঞানের ভাষায় এক্সোসোম) তৈরির মাধ্যমে পরজীবীটি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে, কীভাবে বুদ্‌বুদের মাধ্যমে ওষুধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় জিন নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদান করে। আতিয়া বলেন, এই গবেষণার ফলাফল শুধু কালাজ্বরের কার্যকর ওষুধ তৈরিতেই নয়, ক্যানসারের জন্য নতুন ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কারেও ভূমিকা রাখবে। কারণ, মানবদেহের কোষও একই ধরনের বুদ্‌বুদ তৈরি করে। ক্যানসার সৃষ্টিকারী কোষগুলো এই বুদ্‌বুদের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। গবেষণাটি গত বছর ২২ হাজার গবেষণার মধ্যে কানাডার কুইবেক প্রদেশে শীর্ষ দশে স্থান পেয়েছে।

আতিয়া বলেন, কন্যাসন্তান বোঝা নয়; বরং সুযোগ পেলে তাঁরা যে বিশ্ব জয় করার ক্ষমতা রাখে, দেশের প্রতে৵ক মা–বাবা সেটি উপলব্ধি করুক, নারী দিবসে এটিই তাঁর চাওয়া।