এবারও ৮ লাখ টাকার রেণুপোনা বিক্রি করেছেন হালদা নদীর ডিম সংগ্রাহক কামাল উদ্দিন
জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে ১৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এবার মৎস্য পদক দিয়েছে সরকার। রৌপ্যপদক পেয়েছেন মো. কামাল উদ্দিন। ৬৮ বছর বয়সী মানুষটা ৫৫ বছর ধরে হালদায় মাছের ডিম সংগ্রহের পাশাপাশি নদীর পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে চলেছেন। এস এম ইউসুফ উদ্দিনকে নিজের জীবনের গল্প বললেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এই ডিম সংগ্রাহক
আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই হালদা বয়ে চলেছে। এই নদীর পানি গায়ে লাগিয়েই বড় হয়েছি। বুঝ হওয়ার পর থেকেই দেখছি, দাদা-চাচারা মৌসুমের সময় হালদায় মাছের ডিম সংগ্রহ করেন। এ সময়ে ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়েই নদীতে নামেন তাঁরা। আমারও ইচ্ছা করত তাঁদের সঙ্গে যেতে, কিন্তু ছোট বলে নিতে চাইতেন না।
বয়স তখন ৮ কি ১০ বছর। ডিম ধরার মৌসুমে একদিন বজ্রবৃষ্টি শুরু হলো। হালদায় নামল পাহাড়ি ঢল। মাথায় জুইর (বাঁশ ও তালপাতার তৈরি জুইর বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে ব্যবহার করা হয়) দিয়ে দাদার সঙ্গে নৌকা নিয়ে ছুটলাম। নদীতে তখন শত শত নৌকা, জাল পেতে বসে আছেন হাজারো ডিম সংগ্রাহক। এভাবেই ডিম ধরা দেখার অনেক দিনের ইচ্ছা পূরণ হলো।
নদীর পাড় থেকে একটু ভেতরে পানিতে কিছু জায়গায় ‘কুম’ (স্রোতের কারণে সৃষ্ট গভীর স্থান) থাকে। মূলত এসব কুমেই ডিম ছাড়ে মাছ। ভাসানো জালে আটকে ছেঁকে ছেঁকে নৌকায় তুলে রাখা হয় ডিম। সেদিন শুধু দেখা নয়, জাল থেকে ডিম সংগ্রহের কাজও শুরু করি। হাতে নিয়ে দেখি ডিমগুলো মুক্তার দানার মতো। নৌকা ভরে ডিম নিয়ে ডাঙায় ফিরেছিলাম সেদিন।
কাজের ফাঁকে ডিম ধরি
আমার আব্বা ছিলেন জাহাজের মাস্টার। কাজ করতেন নারায়ণগঞ্জে। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিল, আমি লেখাপড়া করি। স্কুলেও ভর্তি করিয়েছিলেন। কিন্তু দশম শ্রেণিতে ওঠার পর আর পড়াশোনা করতে পারিনি। আগে দাদা-চাচাদের সঙ্গে টুকটাক ডিম সংগ্রহ করতাম, ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে পেশাদার সংগ্রাহক হয়ে গেলাম।
প্রতিবছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে রুই–কাতলার মতো কার্পজাতীয় মাছ হালদায় এসে ডিম ছাড়ে। আমরা হালদাপারের মানুষেরা বুঝি, কখন ডিম সংগ্রহ করতে হবে। সবাই তখন নদীতে ছুটে যাই। এ সময় ছাড়া সারা বছর যে যার মতো অন্য কাজ করি। আমি যেমন নার্সারি করি, কাঠের ব্যবসা করি, মুরগির ফার্মও আছে।
প্রথমে দুইটা নৌকায় ডিম সংগ্রহ করতাম। আস্তে আস্তে নৌকার সংখ্যা বেড়েছে। ১৯৯১ সালে নৌকার সংখ্যা হলো ১০। সেবার ঘূর্ণিঝড়ে ৬টি নৌকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। খুব মন খারাপ নিয়ে নিজের ৪টি আর ভাড়া করা ৬টি নৌকা নিয়ে নদীতে নামি। আশ্চর্য, দুর্যোগের মধ্যেও ১০টি নৌকাই ভর্তি করে ডিম সংগ্রহ করি। সেবার ৬০ কেজি রেণুপোনা সংগ্রহ করেছিলাম। আমার জীবনে সেটাই ছিল সর্বোচ্চ। ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে সেসব বিক্রি করেছিলাম।
দিনে দিনে কত বদল
একসময় ডিম ধরার সময়টা হালদাপারের মানুষের জন্য ছিল উৎসবের মতো। সেই চিত্র এখন অনেক বদলে গেছে। এখন এক নৌকায় কয়েক বালতি ডিম পাওয়া যায় মাত্র। দাদার সঙ্গে নাতি বা বাবার সঙ্গে ছেলেও আর এখন নদীতে নামে না। অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে তারা। তবে আমার তিনটা ছেলে এখনো ডিম ধরার কাজে আমাকে সহযোগিতা করে। এই মৌসুমে ১৪টি নৌকায় ৩৫ বালতি ডিম ধরেছি। আট কেজি রেণুপোনা বিক্রি করে দাম পেয়েছি ৮ লাখ টাকা। রেণুপোনা এখন ১ থেকে দেড় লাখ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। চার দিন বয়সী পোনা কেজিতে ৩ লাখের মতো থাকে।
প্রতিবছরই যে অনেক ডিম পাই, তেমন নয়। অনেক বছর একদমই ডিম ধরা পড়ে না। ২০১৬ সালেই যেমন, মাত্র ৯৫০ গ্রাম ডিম পেয়েছিলাম। এত লোকজন নিয়ে নদীতে নেমে ডিম না পেলে তো মাথায় হাত। অনেক টাকা লোকসান হয়ে যায়।
ডিম সংরক্ষণ আর বিতরণেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। একসময় ডিম সংগ্রহ করে বাড়িতে কূপ বানিয়ে রেণু ফোটাতে হতো। সনাতন এই পদ্ধতি ছিল অনেক পরিশ্রমের। ২০০০ সাল থেকে হ্যাচারির মাধ্যমে রেণু তৈরি করি। এসব আবার মাটির হাঁড়িতে বিক্রি করতাম একসময়। এখন পলিথিনে অক্সিজেন দিয়ে পাঠানো যায়।
আমার রেণুপোনা ভারত-মিয়ানমারেও গেছে। এখনো দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। মৌসুমের সময় দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এসে হালদাপার থেকে পোনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
এই পদক সবার
নদী ভালো না থাকলে তো মাছ আসবে না। তাই ডিম ধরার পাশাপাশি নদীর পরিবেশ, মা মাছ ও ডলফিন এবং জলজ প্রাণীর সুরক্ষায় কাজ করি। আমি হালদা রক্ষা কমিটির সদস্য, হালদা নদী মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি। এসব কাজে ঝামেলাও অনেক। ২০১৩ সালে নদীতে অবৈধ কার্যক্রম দেখে প্রশাসনকে তথ্য দেওয়ায় হামলার শিকার হয়েছিলাম। তবে থামিনি।
পূর্বপুরুষের করে আসা কাজটা দিয়ে যেকোনো দিন পুরস্কার-পদক পাব, তা–ও আবার রাষ্ট্রীয়, স্বপ্নেও ভাবিনি। এটা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় উপহার। আমি মনে করি, পুরস্কারটা হালদা রক্ষায় যাঁরা জড়িত—সবার। আমি এটি সবাইকে উৎসর্গ করেছি।