যাওয়ার আনন্দ, ফেরার দুঃখ

গত ২৯ জুলাই সকাল ৭টা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। মাকে বলি বিকেলের মধ্যে ফিরে আসব। একে একে বন্ধুরা এসে জড়ো হয় কোচিং সেন্টারের সামনে। সেখানে চা-নাশতা করি। বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে সবই উৎফুল্ল। যথাসময়ে মাইক্রোবাস চলে আসে। গাড়িতে ওঠার আগে একসঙ্গে ছবি তুলি। যে ছবিটি পরে অনেকেই দেখেছে। সেই গ্রুপ ছবিতে সবাই আছি আমরা। সকাল ৮টার দিকে খৈয়াছড়া ঝরনার উদ্দেশে রওনা দিই।

চালক, চালকের সহকারীসহ মাইক্রোবাসে আমরা ছিলাম ১৮ জন। তাঁরাও আমানবাজার এলাকার বাসিন্দা। মিরসরাই যাওয়ার পথে আমরা অনেক আনন্দ করেছি। কখনো গান গেয়েছি, কখনো হাসি–ঠাট্টায় মেতে উঠেছি। এভাবে আনন্দ করতে করতে ১০টার দিকে ঝরনায় পৌঁছাই।

আগে আমরা কেউ খৈয়াছড়ায় যাইনি। বৃষ্টির হয়েছে বলে ঝরনাও সেদিন প্রাণ পেয়েছে। দূর পাহাড়ের পানি এখানে এসে ছন্দ তুলছিল। সেই ছন্দে মেতেছিলেন আরও কিছু পর্যটক। আমরাও নেমি পড়ি, ঝরনার জলে শীতল হই। কখনো সবাই মিলে, কখনো একা ছবি তুলি। হইহুল্লোড়ে মেতে উঠি।

সুন্দর মুহূর্ত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সেদিনও তা–ই হলো। বেলা একটার দিকে আমরা ফেরার পথ ধরি। একে একে সবাই গাড়িতে উঠে বসি। পেছনের সারিতে আমিসহ পাঁচজন জায়গা নিই।

default-image

গাড়িতে উঠলেই আমার বমি পায়। এটা কাটানোর নিজস্ব একটা উপায় আবিষ্কার করেছি। সেটা হচ্ছে—ঘুম। সেদিনও গাড়িতে উঠেই ঘুমিয়ে পড়ি। অন্য সময় হলে এত দ্রুত ঘুম আসত না। সেদিন ক্লান্ত ছিলাম। সবাই গল্পগুজবে মেত উঠলেও আমি টুপ করে ঘুমিয়ে পড়ি।

কিছুক্ষণ পরই বিকট আওয়াজে আঁতকে জেগে উঠি। প্রচণ্ড ধাক্কায় গাড়ির পেছনের ডালা খুলে গেলে পাঁচজনই ছিটকে গিয়ে পড়ি রেললাইনের পাশে। তীব্র ব্যথা অনুভব করি। চোখ মেলে দেখি পাশ দিয়ে ঘটাং ঘটাং শব্দে চলে যাচ্ছে ট্রেনের চাকা। কলিজার পানি শুকিয়ে যায়। একপাশে তাকিয়ে দেখি আমার বন্ধু মাহিন। অন্যদের কী অবস্থা, ভাবার মতো অবস্থা তখন ছিল না। এরই মধ্যে একজন আমাকে ও মাহিনকে টেনে তোলে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারি, পিঠে ব্যথা পেয়েছি। কী হয়েছে বা হচ্ছে, আর কিছু জানি না।

স্থানীয় একটা হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাদের। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এখনো এখানেই আছি।

default-image

সত্যটা মেনে নিতে পারছি না

একটি দুর্ঘটনা আমাদের জীবনটা তছনছ করে দিল। এমন একটা ঘটনা ঘটবে, কল্পনাও করিনি। সহপাঠী মুসাহেদ আহমেদ, ইকবাল হোসেনসহ ১১ বন্ধু নেই। গতকাল মারা গেল আয়াতও। মাইক্রোবাসে সে আমার পাশেই বসেছিল। জুনায়েদ কায়সার মোটামুটি সুস্থ। তবে মাহিনের অবস্থা ভালো না। তার জ্ঞান নাকি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। কাউকে চিনতেও পারছে না। মাইক্রোবাসে পাশে বসা তাসফির হাসান, সৈকতের অবস্থাও ভালো না। কারও মাথার সমস্যা, কারও পা ভেঙে গেছে, কারও হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা ধরা পড়েছে। জানি না, কী হবে। হাসপাতালের বিছানায় বসে এসব আর ভাবতে পারছি না।

হয়তো একদিন সুস্থ হয়ে উঠব। হয়তো কিছুদিন পর বাড়িও ফিরব। কিন্তু কোনো দিন আর বন্ধুদের দেখা পাব না। এই সত্যটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন