নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এমন নয় যে আমি সব জানি বলে আপনাদের আজ উপদেশ দিচ্ছি। আমি হচ্ছি ‘নিজের জন্য না বাঁচা’ এক অপদার্থ। আমার বয়স এখন ৪৮। দুই-তিন বছর ধরে হয়তো আমি নিজের জন্য বাঁচার চেষ্টা করছি। এর আগে জীবনের ৪৫টা বছর আমি শুধু অন্যে কী ভাববে, এই ভেবে ছুটে গেছি।

লোকে বলে, আমি বড় চাকরি ছেড়ে লেখক হয়েছি। নিজের মনের কথা শুনেছি। সফল হয়েছি। আরও অনেক কিছু। কিন্তু গল্প শুধু এটুকুই নয়। সফল হয়েছি ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি কি আদৌ সুখী হতে পেরেছি? না। কেন? কারণ, আমি নিজেকে প্রাধান্য দিইনি কখনোই। আমি চাকরি করতাম ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং খাতে। সেখানে মোটা অঙ্কের বেতন ছিল। অঙ্কটা এতই বড় ছিল যে মাঝেমধ্যে নিজেই অবাক হয়ে যেতাম, ‘বাপ রে! আমি এত টাকা আয় করি!’ হঠাৎ একদিন চাকরি ছেড়ে দিলাম। কারণ, আমার স্বপ্ন ছিল লেখক হব, নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটব, স্বপ্ন পূরণ করব। স্বপ্ন পূরণ করলামও। শুরুর দুই-তিন বছর একটু সংগ্রাম করতে হলো, কিন্তু আমি মোটা বেতনের মায়া ভুলে গিয়ে লেখক হলাম। কিন্তু তারপর?

অন্য জীবন

কাজের খাত বদলে গেলেও পুরোনো বন্ধুরা তো আর রাতারাতি বদলে যায় না। আমি পড়েছি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। স্বাভাবিকভাবেই আমার ক্যাম্পাসের বন্ধুরা কেউ স্থপতি, কেউ প্রকৌশলী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ আবার করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বস। আমি নিয়মিত তাদের সঙ্গেই আড্ডা দিতাম। কেউ দাওয়াত করলে তাদের সঙ্গেই পার্টি করতে যেতাম। একদিন এমনই এক পার্টিতে আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তো ব্যাংকের বড় চাকরি ছেড়ে দিয়েছ। বইপত্র লিখছ। এখন মাসে কেমন আয় তোমার?’ 

সে খুব সাধারণভাবেই আমাকে প্রশ্নটা করেছিল, পরক্ষণেই সে অন্য কথায় হারিয়ে গেছে। আমি জানি, সে অনেক কিছু ভেবে কথাটা জিজ্ঞেস করেনি, কিন্তু আমার মনে ঠিকই ওই প্রশ্ন গেঁথে গেল। বন্ধুকে প্রশ্নের উত্তরট দিতে না পারাটা আমাকে খুব আহত করল। মাথায় ঢুকে গেল, তাহলে কি এই পার্টিতে আসা সব বন্ধু ভাবছে চাকরি ছেড়ে, বই লিখে, এত খ্যাতি অর্জন করার পরও আমি পিছিয়ে আছি? ওরা সবাই কি আমাকে পিছিয়ে পড়া একজন ভাবছে? এসবই শুধু মাথায় ঘুরছিল।

আদতে বন্ধুরা হয়তো ভাবছিল পার্টিতে খাবার কখন দেওয়া হবে, সেই কথা। কিন্তু আমার মাথায় আমি নিজের কথা না ভেবে, অন্যরা কী ভাবছে, সেটা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেলাম। সেই রাতে ঠিক করলাম, যে করেই হোক, অনেক অনেক টাকা রোজগার করব। ওরা আমাকে যতটা পিছিয়ে পড়া ভাবছে, আমি অনেক অনেক আয় করে ওদের সেই ধারণাকে ছাপিয়ে যাব। তাই বন্ধুর প্রশ্নের মোক্ষম জবাব দেওয়ার জন্য অনেক অনেক টাকা আয় করতে লেগে পড়লাম। বড় বড় পত্রিকায় কলাম লেখা শুরু করলাম, অর্থের বিনিময়ে বই লিখতে থাকলাম, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দিতে থাকলাম। লোকে আমার বক্তৃতা শোনার জন্য আমাকে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া শুরু করল। এভাবে আমার আয়ও বাড়তে থাকল। একটা সময় হিসাব করে দেখলাম, আমি বছরে ৭০-৮০টার মতো অনুষ্ঠান করছি। ২০১৯ সালে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমাকে ১৩০ বার উড়োজাহাজে চড়তে হয়েছে। ভাবুন তো একবার, ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৩০ দিনই আমি বিমানবন্দরে কাটিয়েছি। আর বছরের অর্ধেকটা সময় কাটিয়েছি একেক শহরের একেক হোটেলে, গেস্টহাউসে। এই সময়ের মধ্যে আমার প্রচুর আয় করেছি, আমার ব্যাংক ব্যালেন্স বেড়েছে। আমি খুশি মনে, গর্বে বুক ফুলিয়ে আবার বন্ধুদের ওই পার্টিতে গেছি, কিন্তু ওই বন্ধু আমার ‘আয়’ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করেনি! আমি ওর এক প্রশ্নের জন্য এত কিছু করলাম আর বন্ধুটি আমার কাছে দ্বিতীয়বার কিছু জানতে চাইল না!

করোনার শুরু, ভাবনার শুরু

আমি আমার অর্থ উপার্জনের ধারা অব্যাহত রাখলাম। আয় করতে থাকলাম। ফোনে ব্যাংকিং অ্যাপে এক ছোঁয়াতেই যখন আমার ব্যাংক-ব্যালেন্সের নম্বরটা দেখতাম, ভালো লাগত। সংখ্যাগুলো যখন বাড়ত, ভালো লাগাও বাড়ত। কিন্তু এটাই কি আদতে সুখ? প্রচুর অর্থ যোগ হতে থাকল আমার, এর সঙ্গে সঙ্গে আরও কী যোগ হলো জানেন? শরীরে অতিরিক্ত ওজন যোগ হলো, যোগ হলো কোলেস্টেরল। কমতে থাকল মাথার চুল, চোখের ঘুম। আমি ভাবলাম, বয়স হলে তো এসব একটু-আধটু হয়ই, হোক না! লোকে তো এসব মেনে নেবেই। আমি আবার ‘লোক’-এর কথা ভেবে আয় করে যেতে থাকলাম। তবে মন থেকে বলছি, আমি মোটেও আমার অবস্থা নিয়ে সুখী ছিলাম না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর অনুষ্ঠানগুলোয় যে চেহারাই থাকুক না কেন, আদতে আমি ভেতরে-ভেতরে বিধ্বস্ত ছিলাম। ভেঙে পড়েছিলাম। আর এসবই হয়েছিল আমার ওই বন্ধুর কারণে, যার এক প্রশ্নে প্রভাবিত হয়ে আমি কী অস্থির ঘোড়দৌড়টাই না শুরু করেছিলাম। কিন্তু আজ দেখুন, ওই বন্ধুর হয়তো আমার কথা মাথাতেও নেই। আর আমি ওর কথা ভেবে নিজেকে কী একটা পর্যায়ে নিয়ে এলাম!

এরপর করোনা মহামারি শুরু হলো। ঘরে বন্দী হয়ে নিজেকে নিয়ে ভাবার মতো একটু অবসর পেলাম। ভেবে দেখলাম, আমি এমন কিছু মানুষের কথায় প্রভাবিত হয়ে দৌড়াচ্ছি, যারা জানেও না তাদের কথার জন্য আমি নিজেকে কোন অবস্থায় নিয়ে গেছি! আসলে আমরা সবাই অন্যের জন্য বাঁচি। অন্যের কথা, অন্যের চাহনি, অন্যের স্বীকৃতি—এসবের ওপর ভর করে নিজেকে ভেঙেচুরে ফেলি।

অতঃপর বদল

অন্যের কথার চাপ নিজের ওপর নিয়ে আর বাঁচতে পারছিলাম না। এ জন্য করোনা মহামারির সময় নিজেকে নিজের জন্য বদলে ফেলি। ৪৬ বছর বয়সে আমি দৌড়ানো শুরু করি, নিজের একটা ইউটিউব চ্যানেল শুরু করি। কারণ, এই কাজগুলো আমি ভালোবাসি। হয়তো আগের মতো অত বেশি উপার্জন করি না। কিন্তু আগের চেয়ে আমি এখন অনেক বেশি সুখী, সুস্থ আর সফল। আজ যদি কোনো পার্টিতে আমার ওই বন্ধু আবার আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার আয় কত?’ আমি বলব, ‘যত টাকাই আয় করি না কেন, আমি এখন সেটা নিজের জন্য করি। আর এই আয়ে যে তৃপ্তি, সেটা অমূল্য।’

নিজের জন্য বাঁচার মানে হলো, যখন আমি আমার স্বপ্নগুলো শুধু নিজের কথা ভেবে পূরণ করতে নামব। কে কী ভাবল, কে কী বলল—এই চিন্তা যখন আমার স্বপ্নের সামনে প্রাধান্য পাবে না, তখনই আমি নিজের জন্য বাঁচতে পারব, নিজেকে ভালো রাখতে পারব।

সূত্র: টেড এক্সের ভিডিও