আমি শুধু চেকটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম

যুক্তরাষ্ট্রের বল স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে বক্তৃতা করেছেন অস্ট্রেলীয়-ব্রিটিশ অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান। পড়ুন নির্বাচিত অংশ।

অস্ট্রেলীয়-ব্রিটিশ অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান
ছবি: উইকিমিডিয়া

এ ধরনের বক্তৃতায় আমাকে বহুবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সব সময়ই না করে এসেছি, কারণ টাকাপয়সা খুব একটা পাওয়া যায় না (হাসি)।

আরে নাহ! আসল কারণ হলো আমার কখনোই নিজেকে তৈরি মনে হয়নি। নিজেই নিজেকে বলতাম, ‘আর কটা বছর যেতে দাও।’ কারণ, ১০ মিনিটের এমন একটা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখার সুযোগ জীবনে একবারই মেলে।

প্রশ্ন হলো, এবার আমি রাজি হলাম কেন? সত্যি বলতে, আমি জানি না! যদি আজকের বক্তৃতার একটা নামকরণ করতে বলা হতো, সম্ভবত এটাই হতো আমার শিরোনাম—‘আমি জানি না!’

অনেকে হয়তো ভাবছ, হিউ জ্যাকম্যান বুঝি এখনই আটটি পয়েন্টে সাফল্যের পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দিয়ে দেবেন। বলে দেবেন, ‘স্বপ্নের ক্যারিয়ার চান? এই নিন সহজ ফর্মুলা!’ বানিয়ে বানিয়ে আমিও হয়তো কয়েকটা চমৎকার গল্প বলে দিতে পারি। ‘কঠিন লক্ষ্য, কঠোর পরিশ্রম, আর একটুখানি ভাগ্য সঙ্গ দিলেই আপনিও এভাবেই একদম শীর্ষে পৌঁছে যাবেন।’ কিন্তু ভাইলোক, সত্যি বলতে জীবনে কিন্তু এভাবে কোনো হিসাব মেলে না। অন্তত আমার জীবনে মেলেনি।

আমার জীবনের সিংহভাগ সময়ে আমি নিজেই কিচ্ছু জানতাম না। ২২ কিংবা ২৭ বছর বয়সের কথা কিন্তু বলছি না। ধরো ছয় মাস আগে, কিংবা গতকালের ক্ষেত্রেও তা-ই।

উদাহরণ দিই। ছয় বছর বয়স থেকেই আমি কোনো না কোনোভাবে অভিনয় করতাম। তবে সবই ছিল অপেশাদার, শখের বশে। থিয়েটার করেছি, মিউজিক্যাল করেছি, কনসার্ট করেছি। এসব ভালোও বাসতাম। কিন্তু কখনো কি ভেবেছিলাম, এটাকেই পেশা বানাব? ভুলেও না!

আরও পড়ুন

এমনকি ১৯ বছর বয়সেও একবার মডেলিং এজেন্সিতে ছবি জমা দিয়ে এসেছিলাম। কারণ, আমার এক বন্ধু তখন মডেলিং করে প্রচুর টাকা কামাচ্ছিল। আর এজেন্সির প্রধান ব্যক্তিটিও আমাকে সোজাসাপটা বলে দিয়েছিল, ক্যামেরা নাকি আমাকে একদমই পছন্দ করে না। আমি দেখতেও ‘ফটোজেনিক’ নই। এই একটা মন্তব্য আমাকে অনেক দিন হীনম্মন্যতায় ভুগিয়েছে। প্রায়ই মনে হয়েছে, আমি হয়তো এই জগতের নই।

আমি অভিনয়ে কীভাবে এলাম, সেই গল্পটা শুনতে চাও? ঠিক আছে, বলি।

কমিউনিকেশনসে লিবারেল আর্টস ডিগ্রি নিয়েছিলাম। সাংবাদিকতা ছিল আমার মেজর (মূল বিষয়)। হ্যাঁ, কোনোমতে ডিগ্রি পাওয়ার জন্য যতটুকু পড়াশোনা দরকার, ঠিক ততটুকুই করতাম। আহা, এই কথায় তালি দিয়ো না, মা-বাবা কিন্তু পাশেই বসে আছেন!

তো ঘটনাটা এমন—গ্র্যাজুয়েশনের শেষ বছরে আমার ২৪ ক্রেডিট নেওয়ার কথা ছিল। ভুল করে ২২ ক্রেডিট নিয়ে ফেলেছিলাম। অতএব বলা হলো, ফিনিশিং লাইন পেরোনোর জন্য আমাকে একটা ছোটখাটো ইলেকটিভ সাবজেক্ট (ঐচ্ছিক বিষয়) নিতে হবে।

এক বন্ধু বলল, সবচেয়ে সহজ হলো ‘থিয়েটার অ্যাপ্রিসিয়েশন’ ক্লাস। তাঁর বক্তব্য, ‘দারুণ বিষয়! কোনো হোমওয়ার্ক নেই, পরীক্ষা নেই। শুধু ১০ সপ্তাহ ক্লাসে গিয়ে বসে থাকলেই পাস!’ আমি বললাম, ‘এই তো চাই! নাম লিখিয়ে ফেলো।’

পড়ালেখার ব্যাপারে আমি এতই উদাসীন ছিলাম যে প্রথম তিন সপ্তাহ ক্লাসেই যাইনি। কারণ, জানতাম যে নিয়ম অনুযায়ী তিনটা ক্লাস মিস করলেও পাসে কোনো সমস্যা হবে না।

হিউ জ্যাকম্যান
ছবি: উইকিমিডিয়া

আচ্ছা ঠিক আছে, মানছি, এতটাও অলস হওয়া ঠিক না! তো ৪ নম্বর সপ্তাহে ক্লাসে গিয়ে হাজির হলাম। গিয়েই জানলাম, ওই বিষয়ের ইতিহাসে প্রথমবার শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দিয়ে একটা নাটক করাবেন। শোনামাত্র আমার প্রায় টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ার দশা। কিন্তু কী কপাল, দৈবচয়নের মধ্য দিয়ে আমিই পেয়ে গেলাম প্রধান চরিত্র!

ক্লাস শেষে এক দৌড়ে গেলাম প্রফেসরের কাছে। হাতে–পায়ে ধরে আকুতি জানালাম, এবারের মতো ছেড়ে দিন। তিনি বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রথম তিন সপ্তাহ ক্লাসে এলে হয়তো বিবেচনা করতাম।’ বলেই সটান হেঁটে বেরিয়ে গেলেন।

ব্যস, ফাইনাল ইয়ারের ৯০ শতাংশ সময় চলে গেল ওই নাটকের পেছনে। আমার মূল বিষয় কিংবা ওই ২২ ক্রেডিটে আর মনোযোগ ছিল না। শেষমেশ আমরা সেই নাটকটা নিয়ে একটা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনী করতে গেলাম। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা নাটক করত, তাঁদের সঙ্গেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। যখনই ওই বাড়িতে পা রাখলাম, অভিনয়শিল্পীরা আমাদের স্বাগত জানাল, আচমকা শরীরের প্রতিটা কোষ যেন জানান দিল—আমি আমার সগোত্রীয় মানুষ খুঁজে পেয়েছি। এত দিন ভুল ডিগ্রির পেছনে তিনটা বছর নষ্ট করেছি।

ভাবলাম, ‘ঠিক আছে, এবার মোড় ঘোরানোর সময় এসেছে।’ সিডনির অ্যাক্টরস সেন্টারে এক বছরের একটা অভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য অডিশন দিলাম। আসন ছিল মাত্র ২০টি। প্রথমে সুযোগ পাইনি। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যখন তাঁর অফার বাতিল করল, আমাকে আবার ডাকা হলো আরেকটা অডিশনের জন্য। গিয়ে দেখি মাত্র আটজন প্রতিযোগী ওই শেষ সিটটার জন্য লড়ছে। শেষমেশ পেয়ে গেলাম।

এত খুশি হয়েছিলাম! সুযোগ পাওয়ার চিঠিটা যখন হাতে এল, আমি তখন আনন্দে আত্মহারা! কিন্তু চিঠির শেষ লাইনটা পড়েই মাথায় হাত! লেখা ছিল—প্রথম দিনই ক্লাসে যাওয়ার সময় সঙ্গে সাড়ে তিন হাজার ডলারের একটা চেক নিতে হবে। ওই সময় ওটাই আমার কাছে এক মিলিয়ন ডলারের সমান। মাত্রই একটা ডিগ্রি শেষ করেছি, সেটার টাকাও বাবা দিয়েছেন। তাঁর কাছে আরও সাড়ে তিন হাজার ডলার চাওয়ার মতো সাহস আমার ছিল না। তাই একঝটকায় চিঠিটা ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। ভাবতে লাগলাম, এরপর কী করব! সব লক্ষণই বলছিল, অভিনয় আমার কপালে নেই।

ঠিক তার পরদিনই ডাকযোগে একটা চেক হাতে পেলাম। ঘটনা কী? দাদির উইলের (ইচ্ছাপত্র) সুবাদে আমি কিছু টাকা পেয়েছি। অঙ্কটা কত? সাড়ে তিন হাজার ডলার! সত্যি বলছি। আমি শুধু চেকটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। সবটাই মনে হচ্ছিল সিনেমার মতো। ডাস্টবিন থেকে ছেঁড়া চিঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে শুরু হলো আমার অভিনয়শিল্পী হওয়ার যাত্রা।

ফাঁকিবাজ, কম খেটে কোনো মতে পাস করা ছেলেটার কথা তোমাদের মনে আছে তো? সে কিন্তু তত দিনে গায়েব হয়ে গেছে। এরপর চার বছর আমি অভিনয় নিয়ে পড়াশোনা করেছি। ওই চার বছরে আমি একটা ক্লাসও মিস করিনি। একটাও না!

এটাকে তোমরা কী বলবে? কোনো অলৌকিক সংকেত, অদৃশ্য সাহায্যের হাত, নাকি প্রার্থনা কবুল হওয়া? নিতান্ত কাকতালীয় ঘটনাও বলতে পারো। কে জানে! তবে পথনির্দেশ যেখান থেকেই আসুক না কেন, সংকেতগুলো কি সব সময়ই এতটা স্পষ্ট হয়? মোটেও না! অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সংকেত হয় নীরব, সূক্ষ্ম। বেশির ভাগ সময়ই এরা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় ‘ব্যর্থতার’ ছদ্মবেশে।

বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জোসেফ ক্যাম্পবেল একবার বলেছিলেন, ‘জীবনের মই বেয়ে একদম ওপরে ওঠার পর যদি আবিষ্কার করেন যে আপনি ভুল দেয়ালে মই ঠেকিয়েছিলেন, এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু হয় না।’ তোমার হৃদয়, তোমার ভেতরের ছোট্ট কণ্ঠস্বরটাই আদতে বলে দেবে, কোনটা তোমার জন্য সঠিক দেয়াল আর কোনটা সঠিক মই।

আশা করি, তুমি তোমার নিজের জীবনটাই যাপন করবে। কারণ, ওই একটা জিনিস তোমার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।