আম্মু, তোমার বিকেলগুলো এখন বুঝি

আজ মা দিবসের বিশেষ আয়োজনে লিখেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আমিনা মুমতারিন

মায়ের সঙ্গে গর্বিত সন্তান
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

বিকেলবেলা অন্য মায়েরা যখন তাঁদের সন্তানদের পাশে বসে সারা দিনের গল্প শুনতেন, আমার আম্মু তখন স্কুল থেকে ফিরে বাসার ছোট্ট একটা ঘরে পাড়ার সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। ছোটবেলায় এটা দেখে আমার খুব অভিমান হতো। মনে হতো, সারা দিন এত ব্যস্ত থাকলে আমাকে সময় দেবে কখন?

অভিমানটার কথা কখনো আম্মুকে বলা হয়ে ওঠেনি। বুকের ভেতর চুপচাপ জমিয়ে রেখেছিলাম। বড় হয়ে বুঝেছি, সেই না-পাওয়া বিকেলগুলোতেই আম্মু আমাকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা দিচ্ছিলেন।

আমার মা শাহনাজ পারভীন। বগুড়ার শেরপুর উপজেলা সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। ২০০৯ সালে তিনি বগুড়া জেলার সেরা শিক্ষক এবং ২০১৩ সালে দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। ‘ভার্কি ফাউন্ডেশনের গ্লোবাল টিচার প্রাইজ ২০১৭ ’-এর বিশ্বসেরা ৫০ শিক্ষকের তালিকায় জায়গা পেয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া ২০২১ সালে প্রথম আলোর প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা থেকে শুরু করে ২০২২ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষক—তাঁর ঝুলিতে আছে অনেকগুলো পুরস্কার। এই সম্মাননাগুলোর পেছনে যে মানুষটা আছেন, আমার কাছে তাঁর পরিচয় একটু অন্য রকম।

আরও পড়ুন

সকালে পরিবারের সব কাজ শেষ করে ছুটতেন স্কুলে। স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে আম্মু আবার সেই ছোট্ট ঘরে বসতেন। আসত পাড়ার সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা, যাদের বাবা দিনমজুর, মা গৃহকর্মী, যারা সারা দিন মাঠে কাজ করে, যাদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। নিজের বেতনের টাকা দিয়ে তাদের স্লেট-চক কিনে দিতেন আম্মু। তাদের জন্য বিকেলের নাশতা নিয়ে যেতেও ভুলতেন না। তাঁর চেষ্টায় সেই ছোট্ট ঘর এখন সরকারের অধীন শেরপুর শিশুকল্যাণ স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

ক্লান্তি ছিল, পরিশ্রম ছিল, এখনো আছে। কিন্তু তাঁকে কখনো অভিযোগ করতে দেখিনি। একদিন আম্মুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘স্কুলের বাচ্চাদের জন্য এত কষ্ট করো কেন?’ আম্মু হেসে বলেছিলেন, ‘একটা শিশু যদি অক্ষর চেনে, সে নিজের জীবনটা নিজে লিখতে পারবে। এখানেই আমার সার্থকতা।’

ছোটবেলার অভিমান এখন গভীর কৃতজ্ঞতায় বদলে গেছে। যে বিকেলগুলোয় মায়ের অনুপস্থিতি আমার মন খারাপ করত, আজ বুঝি সেগুলোই আমাকে শিখিয়েছে সহমর্মিতা আর দায়িত্ববোধ, দিয়েছে মানুষের জন্য কিছু করতে পারার দৃঢ় প্রত্যয়।

কৃতী মায়ের মেয়ে হওয়ার একটা অদৃশ্য ভার থাকে, কখনো যা আমার বা আমার বোনের কাঁধে চাপিয়ে দেননি আম্মু। নিঃশব্দে, খুব সহজভাবে আমাদের চারপাশটা এমনভাবে গড়ে রেখেছেন, যেখানে ভয় বা চাপ নেই; আছে শান্তভাবে নিজের মতো করে বড় হয়ে ওঠার জায়গা।

আরেকটা কথা না বললেই নয়। যখন দেখতাম সাংবাদিকেরা আম্মুর সাক্ষাৎকার নিতে আসছেন, টেলিভিশনের ক্যামেরা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, তখন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। হয়তো সেখান থেকেই গল্প বলার প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে। তাই হয়তো আজ আমি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী।

মায়ের স্বপ্ন ছিল প্রতিটি শিশু আলোয় আসুক। আমার স্বপ্ন, সেই আলোর গল্পগুলো যেন হারিয়ে না যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া।

আরও পড়ুন