‘নিজ হাতে বউকে স্বর্ণের গয়না বানিয়ে দিয়ে বিয়ে করেছিলাম’

নিয়মিত সোনার দাম বাড়ছে। বিয়েতে তাই সোনার কদর দিন দিন কমছে। বাজারে সোনার দাম বাড়লেও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কারিগরদের দিন বদলাচ্ছে কি! যশোরের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও কারিগরের গল্প শোনাচ্ছেন জিনাত শারমিন

মিজান জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান
ছবি: প্রথম আলো

৫৩ সরদার মার্কেট, কাপুড়িয়াপট্টি, যশোর। এটাই ‘মিজান ভাই’–এর দোকান। তিন পুরুষ ধরে তাঁদের সোনার কারবার। যশোর বড় বাজারের কাপুড়িয়াপট্টির একটি গলিতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে ৭০ থেকে ৮০টি সোনার দোকান।

গলিটির নাম তাই মুখে মুখে হয়ে গেছে সোনাপট্টি। সরদার মার্কেটের নিচতলায় একেবারে শেষ মাথায় ডান পাশের ছোট্ট গলিতে ঢুকলেই মিজান জুয়েলার্স। স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান। ‘বান্ধা’ ক্রেতারা একনামে যাঁকে চেনেন ‘মিজান ভাই’ বলে।

আশির দশকের শুরুতে মিজানুর রহমানের বয়স যখন সবে ১৪ কি ১৫ বছর, প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েই চাচার সোনার দোকানে কাজ শেখা শুরু করেন। এরপর ১৯৮৯ সালে এই সোনাপট্টিরই সালেহা জুয়েলার্সে কাজ শুরু করেন মিজান।

এখানেই কাজ করেছেন এক যুগের বেশি সময়। ২০০৫ সালে এসে নিজেই সোনার দোকান দেন। সেই হিসাবে মিজান জুয়েলার্সের বয়স ২০ পেরিয়ে ২১ বছরে পড়ল—একেবারে টগবগে তরুণ যাকে বলে!

১৯৯৪ সালে মিজানুর রহমান যখন বিয়ে করেন, দোকানের কর্মচারী হিসেবে জমানো টাকা দিয়ে স্ত্রীর জন্য দুই ভরি সোনা কেনেন। এরপর নিজের পছন্দমতো নকশায় গয়না গড়ে দেন—হাতের রুলি, কানের দুল, আংটি।

আরেকটু সামর্থ্য হলে পরে বানিয়ে দেন গলার চিক। বললেন, ‘অন্যদের জীবনসঙ্গী গয়না কিনে দেন। আমরা গড়ে দিই। এ–ই যা পার্থক্য।’ গল্প করতে করতেই জানালেন, বিয়েতে স্ত্রীকে যে নাকফুল গড়ে দিয়েছিলেন, ৩১ বছর ধরে সেটিই তাঁর নাকে শোভা পাচ্ছে। নিজ হাতে বউকে স্বর্ণের গয়না বানিয়ে দিয়ে বিয়ে করেছিলাম এটাই তো বিশেষ ঘটনা।

বর্তমানে সোনার দাম ওঠানামা করছে প্রায় নিয়মিতভাবে
ছবি: পেক্সেলস

মিজানুর রহমান যখন সোনার কারবারিতে নতুন প্রবেশ করেন, তখন মানুষ সোনা কিনতেন খুবই কম। তাঁর চাচার দোকানে সেই সময় মাসে দেড় থেকে দুই ভরি সোনা বিক্রি হতো। এই সোনার কারিগর ও ব্যবসায়ীর মতে, ২০০০ সালের পর থেকে মূলত উচ্চমধ্যবিত্তদের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও সোনা কিনতে শুরু করেন।

মিজান বলেন, ‘২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল—এই ১০ বছর ভালো ব্যবসা করেছি। শিশুর মুখেভাত বা মুসলমানির দাওয়াত, বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে, এমনকি কেউ কোথাও বেড়াতে যাওয়া উপলক্ষেও সোনার গয়না কিনতেন, উপহার দিতেন। ২০১৫ সালের পর থেকে সোনার দাম বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে বিক্রিতে ভাটা নামে। এখন তো সোনা নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে বলা চলে।’

দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা মিজানুর রহমান। বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন বছরখানেক হলো। পুত্রবধূকেও উপহার দিয়েছিলেন তিন ভরি সোনার গয়না। বললেন, ‘হাত, কান ও গলায় মিলিয়ে সেট গড়ে দিয়েছি। অনেকে সোনা দিয়ে দেনমোহর শোধ করে। আমি কিন্তু তা করিনি। দেনমোহর নগদ টাকা দিয়ে শোধ করা হয়েছে। আর এই সোনা আমাদের পক্ষ থেকে পরিবারের নতুন সদস্যের জন্য উপহার।’

আরও পড়ুন
৪০ বছরের বেশি সময় ধরে সোনার জুয়েলারি কেনাবেচার পেশায় যুক্ত আছেন মিজানুর রহমান
ছবি: প্রথম আলো

সোনার ব্যবসা করেই এত বছর ধরে সংসার চালাচ্ছেন মিজানুর রহমান। বড় ছেলে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। মেয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। আর ছোট ছেলে উচ্চমাধ্যমিক শেষে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে এই পেশায় যুক্ত আছেন মিজানুর রহমান।

সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় বেচাকেনা এখন কম। ১৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যখন মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলছি, আধা ঘণ্টার ভেতরে অন্তত চারজন এলেন তাঁদের নিজের সংগ্রহে থাকা সোনা বিক্রি করতে। সে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মিজান বলেন, ‘বোঝাই যাচ্ছে, নিম্নবিত্তদের হাতে এ মুহূর্তে খুব একটা টাকা নেই। করোনার পর সোনার বিক্রি কমেছে। এখন তো এতটাই দাম বেড়েছে যে কেনা বাদ দিয়ে অনেকে দরকার মেটাতে নিজেদের সংগ্রহে থাকা সোনা বিক্রি করে দিচ্ছেন।’

মিজানুর রহমান চার দশক ধরেই দেখেছেন, মানুষ প্রয়োজনে, বিপদ–আপদে সোনা বিক্রি করেন। তবে সেই প্রয়োজন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি বলেই তাঁর মনে হচ্ছে।

পেশাজীবনে ২৬ জনকে সোনার কারবার শিখিয়েছেন মিজানুর রহমান। এর ভেতর রয়েছেন তাঁর আপন ছোট ভাই আবদুল জলিলও। কাজ শিখে ছোট ভাইও নিজে দোকান দিয়েছেন পাশেই। সোনার কাজ শিখে সবাই এখন প্রতিষ্ঠিত।

মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাইলাম, আপনার পর এই পেশার হাল ধরবে কে? বললেন, ‘আমি তো চাই আমার অন্তত একটা ছেলে এই লাইনে আসুক। কিন্তু ওরা না চাইলে তো আর হবে না। এটা তো জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো বিষয় নয়। তবে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আমি যত দিন আছি, আমার দোকানটাও থাকবে।’

(লেখাটি বর্ণিল বিয়ে জানুয়ারি ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত)

আরও পড়ুন