ফরিদপুরের ধুলোমাখা মাঠ থেকে জার্মানির বন—বাংলাদেশের হকির নতুন পোস্টার বয় কে এই আমিরুল

বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে প্রতি বৈশাখেই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দেও ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসা, গবেষণায় অগ্রগামী ৭ তরুণকে নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে পড়ুন বাংলাদেশ হকি দলের ডিফেন্ডার আমিরুল ইসলামের গল্প।

বাংলাদেশ হকি দলের ডিফেন্ডার আমিরুল ইসলামছবি: শামসুল হক

বাংলাদেশের হকির মানচিত্রে কমলাপুর পরিচিত এক নাম। পুরান ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি হকি খেলোয়াড় ফরিদপুরের এই এলাকা থেকেই এসেছে। ষাট-সত্তরের দশকে সাব্বির ইউসুফ, আশির দশকে বায়েজিদ হায়দার, নব্বইয়ের দশকে মাহবুব হারুনসহ অনেক নামী হকি খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে এই কমলাপুর। মুসা মিয়া, ইসা মিয়া ও ইয়ামিনদের মতো আলোচিত তিন ভাইও এ এলাকারই সন্তান। এসেছেন মিরাজুল ইসলাম, মামুনুর রহমান, মাইনুল ইসলাম, খন্দকার হাসানরা।

বাংলাদেশের হকির নতুন পোস্টার বয় আমিরুল ইসলামের গায়েও লেগে আছে কমলাপুরের মাটির গন্ধ। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২১ জুনিয়র বিশ্বকাপ হকিতে আলো কেড়েছেন এই বাংলাদেশি ড্র্যাগ ফ্লিক ‘বিশেষজ্ঞ’, অনেকে যাঁকে বাংলাদেশের ‘হকির হামজা’ বলেও ডাকেন। ফুটবলার হামজা চৌধুরীর মতো চুলের বাহার আছে বলেই শুধু নয়, দেশের জার্সিতে হামজার মতো অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন বলেই এমন নামকরণ।

অথচ ছোটবেলায় তাঁর নেশা ছিল ফুটবল আর ক্রিকেট। ২০১৫ সালের জুনে হুট করেই বদলে যায় ছক। ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয়ে তখন চলছিল আন্তস্কুল হকির প্রশিক্ষণ। কমলাপুরের হকি কোচ নুরুল ইসলামের হাত ধরে সেই প্রথম হকিস্টিক স্পর্শ করেন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আমিরুল, ‘তারপর আর ছাড়া হয়নি। হকিই হয়ে ওঠে আমার জীবনের বড় একটা অংশ।’ সম্পর্কে আমিরুলের চাচা হন নুরুল ইসলাম।

অনূর্ধ্ব-২১ জুনিয়র বিশ্বকাপ হকিতে আলো কেড়েছেন বাংলাদেশি ড্র্যাগ ফ্লিক ‘বিশেষজ্ঞ’ আমিরুল ইসলাম
ছবি: শামসুল হক

স্কুল হকির পারফরম্যান্স তাঁকে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পা রাখেন সাভারে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। সেখানে সাত দিনের বিশেষ ক্যাম্পে টিকে যান। সে বছর ফেব্রুয়ারিতেই বিকেএসপির নিয়মিত ছাত্র হিসেবে শুরু হয় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক হকি–চর্চা। তবে বিকেএসপির হকি দলে সুযোগ পেতে কষ্ট করতে হয়েছে অনেক। অতিরিক্ত অনুশীলন করেই নিজেকে তৈরি করেছেন। ফল পেতেও দেরি হয়নি। ২০১৯ সালেই জায়গা করে নেন জাতীয় অনূর্ধ্ব-২১ দলে। ওমান-বাংলাদেশ যুব সিরিজে তাঁর পারফরম্যান্স নির্বাচকদের নজর কাড়ে। এরপর ২০২১ সালে ঘরোয়া হকির সবচেয়ে বড় মঞ্চ ঢাকা প্রিমিয়ার হকি লিগে গায়ে জড়ান মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জার্সি।

২০২৩ সালে আমিরুলের গায়ে ওঠে যায় জাতীয় দলের জার্সিও। বর্তমানে তিনি জাতীয় দলের রক্ষণের অতন্দ্র প্রহরী। কিন্তু তাঁর আসল শক্তি পেনাল্টি কর্নারে। বিকেএসপির কোচ শেখ মোহাম্মদ নান্নু ও জাহিদ হোসেনের অধীন ড্র্যাগ ফ্লিকে নিজেকে ঝালিয়ে নিয়েছেন। এই তরুণের প্রতিভার সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটে অনূর্ধ্ব-২১ যুব বিশ্বকাপে। তাতে আমিরুল যা করেছেন, বাংলাদেশের হকির জন্য তা রীতিমতো রূপকথা। ৬ ম্যাচে ১৮ গোল করে হয়েছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাঁর ঝুলিতে ছিল পাঁচটি হ্যাটট্রিক আর চারটি ম্যাচসেরার পুরস্কার। হ্যাটট্রিক করেন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া (দুবার), ওমান ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে।

জুনিয়র বিশ্বকাপ হকিতে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়া আট দলের মধ্যে হওয়া স্থান নির্ধারণী পর্বটিকে চ্যালেঞ্জার ট্রফি নাম দিয়েছে আন্তর্জাতিক হকি সংস্থা। ট্রফিটি জেতে বাংলাদেশ। ২৪ দলের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের চূড়ান্ত অবস্থান হয় ১৭তম। দেশের হকি ইতিহাসে প্রথম কোনো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই এমন দারুণ ফলের অনেকটাই আমিরুলের অর্জন। জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২৫ ম্যাচে ৭ গোল করেছেন। যুব পর্যায়ে লাল-সবুজ জার্সিতে তাঁর পরিসংখ্যান—২৯ ম্যাচে ৪৫ গোল!

সতীর্থদের সঙ্গে আমিরুল
ছবি: শামসুল হক

মাঠে আমিরুল যতটা আগ্রাসী, মাঠের বাইরে ততটাই শান্ত। বাবা শেখ আবুল বাশার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) কর্মরত, মা সাদেকুন নাহার গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি মেজ। পরিবার তাঁকে সামনে এগিয়ে দিয়েছে। জাতীয় হকি দলের ড্র্যাগ ফ্লিকার আশরাফুল ইসলাম আর গুরু ‘নান্নু স্যার’কে আদর্শ মানেন। ফুটবলের প্রতি টানটা এখনো আছে। পছন্দের ফুটবলার লিওনেল মেসি আর প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনা। হকি খেলোয়াড় না হলে নাকি ফুটবলারই হতেন আমিরুল।

২০২৪ সালের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পর নতুনভাবে গঠিত ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো ঘরোয়া খেলা শুরু করলেও হকি আজও তা করতে পারেনি। আর এখানেই আমিরুলের আক্ষেপ, ‘ঘরোয়া খেলা না থাকলে হকি বাঁচবে কী করে! আমরা কীভাবে টিকে থাকব, বলুন?’

সেই টিকে থাকার লড়াইয়ে কয়েক দিন আগে জার্মানিতে গেছেন আমিরুল। জার্মানির ঘরোয়া হকিতে তৃতীয় বিভাগের দল এইচটিসি শোয়ার্টজ-ওয়াইস বন ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন। ৩ মে বন শহরের ক্লাবটির প্রথম ম্যাচে ৯-০ গোলের জয়ে আমিরুলের গোল দুটি। দেশে ঘরোয়া হকির স্টিকগুলোয় যখন ধুলো জমছে, তখন সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপারে জার্মানিতে নতুন করে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন এই তরুণ হকি তারকা। ফরিদপুরের সেই ধুলোমাখা মাঠ থেকে জার্মানির বন—আমিরুলের এই যাত্রা শুধু একজন তরুণের নয়, বরং স্থবির হয়ে পড়া দেশের ঘরোয়া হকির পুনর্জাগরণের ডাকও।

আরও পড়ুন