কেমন হয় ভর্তি পরীক্ষা?

ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন ব্যবহারিক পরীক্ষায়। যেখানে ভর্তি-ইচ্ছুকদের সংগীতের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান যাচাই করা হয়। পরে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বরের সমন্বয়ে করা মেধাতালিকা অনুসারে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ফতেহ আলী খান বলছিলেন, ‘ব্যবহারিকে মূলত আমাদের গানের বনিয়াদি জ্ঞানটা দেখা হয়। গানের তাল, লয় ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে ব্যবহারিকে উত্তীর্ণ হওয়া সহজ হয়।’

পাঠ্যসূচি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই সংগীত বিভাগের প্রথম বর্ষে কিছু সাধারণ কোর্স থাকে, যা সবাইকেই পড়তে হয়। কোর্সগুলো তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দুই রকমেরই হয়। প্রথম বর্ষের পড়াশোনায় শিক্ষার্থীরা মূলত সংগীতের ইতিহাস, বাংলা গানের ইতিহাস, পঞ্চগীতির মতো সংগীতসংক্রান্ত তাত্ত্বিক কোর্স করার সুযোগ পান। অন্যদিকে ব্যবহারিকে কণ্ঠ সাধনা, তালবিষয়ক কোর্স পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীরা সংগীতে নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। যেমন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় বর্ষ থেকে ক্ল্যাসিক্যাল, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীত অনুসারে তিনটি মেজরে আলাদা হয়ে পাঠ নেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসবের বাইরেও আছে লোকসংগীত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তবলা’ নিয়েও মূল পড়ালেখা (মেজর) করার সুযোগ আছে।

তবে সংগীত বিভাগে শুধু যে গান নিয়েই পড়াশোনা হয়, তা নয়। এই বিভাগের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ের কোর্স। যেমন মনোবিজ্ঞান, কম্পিউটার, ইংরেজি। এমনকি সাংবাদিকতা, নৃবিজ্ঞানের মতো বিভাগের কোর্সও পড়ানো হয়।

শখ থেকে ডিগ্রি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসফিয়া শেখ। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গানের প্রতি শখ। গান শেখা না হলেও নিয়মিতই গান গেয়েছেন নিজের মতো করে; অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। বলছিলেন, ‘মূলত শখের বশেই গান করা হতো। গান ভালো লাগে বলেই এই বিভাগে ভর্তি হওয়া। আমার বাবারও ইচ্ছা ছিল আমি যেন সংগীত নিয়ে পড়ি। তাই শখটাই ডিগ্রিতে রূপান্তর করার পথে এগোচ্ছি।’

নানা সংগীতের যোগসূত্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ থেকে সদ্যই স্নাতকোত্তর করেছেন ইন্ট্রোয়েট ব্যান্ডের ভোকাল ও গিটারিস্ট শাহান কামাল। লোকসংগীতে মেজর করেছেন, তবে নিজের ব্যান্ডের সঙ্গে করছেন রক মিউজিক। লোকসংগীতের জ্ঞানের সঙ্গে ব্যান্ডের গানের সামঞ্জস্য খুঁজে পান কি না, জানতে চাইলে বললেন, ‘আমরা তো এখানে শুধু গান গাওয়া শিখি না। আমরা শিখি একটা গানের ধরনের আদ্যোপান্ত। এর ইতিহাস, বেড়ে ওঠা, ভৌগোলিক দিকটা নিয়েও পড়াশোনা করি। লোকসংগীত নিয়ে পড়েছি, তাই ভৌগোলিক উপাদান অনুযায়ী মানুষের গানের পছন্দে যে পরিবর্তন আসে, সংগীতের ধারায় যে পরিবর্তন হয়, এসব সম্পর্কে বিশদভাবে বুঝতে পেরেছি। এই জ্ঞান আমি যে ধরনের গানই করি না কেন, সেটিতেই কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। এর মাধ্যমে আমি আমার শ্রোতাকে বুঝতে পারি।’

সুযোগ

বর্তমানে বিভিন্ন রেডিও, সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশনে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন বিভিন্ন পর্যায়ে। ‘এখন তো বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েই চালু হয়েছে সংগীত বিভাগ। সেগুলোতে শিক্ষকতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রমেও বিষয়টি যুক্ত হওয়ার কথা চলছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে মাধ্যমিকেও আমাদের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষকতার সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষকের পদে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের অগ্রাধিকার থাকে,’ বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ নাসরীন। তবে আক্ষেপের সুরে একটু ভিন্ন কথা বললেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের অধ্যাপক আলী এফ এম রেজোয়ান, ‘আমার মনে হয় আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রেই আমাদের বিভাগের ছেলেমেয়েরা কাজ করার দক্ষতা রাখে। তবে পর্যাপ্ত সুযোগটা তারা পাচ্ছে না। যেখানে বিশেষভাবে সংগীতের ছেলেমেয়রা ভালো করবে, সেখানে অন্য যেকোনো বিষয় পড়ুয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এটি শুধু আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য না, এই ক্ষেত্রেরও ক্ষতির কারণ।’

গবেষণা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা গবেষণার সুযোগ পান। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমেও আসে গবেষণার সুযোগ। সংগীতের অনেক শিক্ষার্থীই উচ্চশিক্ষার জন্য এখন বিদেশে যাচ্ছেন। তাঁদের একটি বড় অংশই যান ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ভারতে গান নিয়ে পড়ার জন্য দুটি উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয় হলো রবীন্দ্রভারতী ও বিশ্বভারতী।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন