ছেলেটাকে শেষ দেখাও দেখতে পেলাম না
গত ২১ মার্চ ছোট নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে পানি আর খাবারের অভাবে মারা গেছেন ২২ জন। তাঁদের একজন সুনামগঞ্জের শায়েক আহমদ। ছেলে হারানোর শোক বুকে চেপেই শায়েকের ইউরোপযাত্রার কথা শোনালেন বাবা আখলুছ মিয়া।
১৮ বছর কুয়েতে ছিলাম। প্রবাসে থাকার কী কষ্ট, তা আমি জানি। তাই চাইছিলাম, ছেলেটা লেখাপড়া করে দেশেই কিছু একটা করে চলুক। কিন্তু এলাকার ছেলেরা ইউরোপে যাচ্ছে দেখে সেও পাগল হয়ে পড়ে। প্রথমে পাত্তা দিইনি। আর আমার তো সামর্থ্যও নেই। কিন্তু ধীরে ধীরে চাপ বাড়ে। শেষে দুবছর আগে এক দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিছু জমি বিক্রি করে ছেলেকে সার্বিয়ায় পাঠানোর জন্য সাড়ে চার লাখ টাকা দিই। আজ না কাল, হবে-হচ্ছে করে করে আর হয় না। পরে টাকাটাই মার যায়। চেষ্টা করেও দালালের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করা যায়নি।
এ ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছি, এর মধ্যে ইউরোপে যাওয়ার জন্য সবাই যেন পাগল হয়ে গেছে। আজ এ বাড়ি ছাড়ে, তো কাল আরেকজন। এবার শুরু হয় গ্রিসে যাওয়ার বায়না। শায়েকের সঙ্গী–সাথিরা কেউ কেউ যাবে। কিন্তু আমি রাজি নই। প্রথমত, টাকা নেই। দ্বিতীয়ত, গেমে (কাঠ বা প্লাস্টিকের ছোট ছোট নৌকায় করে জান হাতে নিয়ে সাগরপথে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়া) আমার ভয় ছিল। গেমে কত শত যুবকের মরার খবর জানি। আমাদের এলাকার দুই ছেলে দুবছর আগে মারা গেছে। আমার বুক কাঁপে। কিন্তু আমার বুকের ধন তো পাগল। যেকোনো মূল্যে বিদেশে তাকে যেতেই হবে। একপর্যায়ে রাজি হই। ভাবি, যদি যেতে পারে, পরিবারের একটা গতি হবে। এমনিতে কত টানাটুনি করে চলি। তার একটা উপায় হবে। অভাব কমবে।
লিবিয়ায় জিম্মি জীবন
ইছগাঁওয়ের দালাল আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যেতে আরও কয়েকজনের মৌখিক চুক্তি হয়েছে। আমিও আলোচনা শুরু করি। কিন্তু আগে টাকা লাগবে। এখন সাড়ে চার লাখ আর লিবিয়ায় যাওয়ার পর গেমে তোলার আগে বাকি সাড়ে সাত লাখ। আমি সাড়ে চার লাখ টাকা দেওয়ার পর গ্রামের আরও কয়েকজনের সঙ্গে চার মাস আগে বাড়ি ছাড়ে শায়েক। প্রথমে সৌদি আরব, পরে কুয়েত, মিসর হয়ে লিবিয়া। কথা হয়, সেখান থেকে কাঠের বড় নৌকায় করে তাকে গ্রিসে পাঠানো হবে।
দালালেরা জানায়, লিবিয়ায় শায়েকরা ক্যাম্পে আছে। আসলে ওটা কোনো ক্যাম্প নয়। একটি ঘরে সবাইকে ঠেসে রাখা। খাবার কষ্ট, থাকার কষ্ট। একধরনের জিম্মি অবস্থা। অনেকের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। টাকার জন্য মারধর করা হয়। সেই মারধরের ছবি, ভিডিও পাঠানো হয় যাতে দ্রুত টাকা পাঠানো হয়। টাকার জন্য শায়েককেও নির্যাতন করা হয়েছে। খাবার দেওয়া হতো না। মাঝেমধ্যে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো। মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যেত। হঠাৎ অন্য কারও নম্বর থেকে ফোন করে বলত, ‘যোগাযোগ করার দরকার নেই, দোয়া কোরো।’ একবার তো শায়েক কান্নাকাটি শুরু করে, লিবিয়ার ক্যাম্প থেকে তাকে যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করি। সে নাকি বাঁচবে না। কীভাবে আনব, দালাল তো পাত্তা দেয় না। এখন নাকি সময় শেষ। যেকোনো সময় গেম।
শায়েকের তাগাদা, ‘টাকা পাঠাও। দালালের চাপ, টাকা দাও।’
গেমের জন্য অপেক্ষা
আমি দিশাহারা হয়ে পড়ি। এর-ওর কাছে ধার চাই, পাই না। পরে ঘরের গরু, জমি বিক্রি করে আরও সাড়ে সাত লাখ টাকা পাঠাই। এরপর একদিন ফোন করে কান্নাকাটি শুরু করে ছেলে। একটা গেম মিস হয়ে গেছে। সাগরতীরে দৌড়াতে গিয়ে পায়ে আঘাত পেয়ে পড়ে গেছে। তাই যেতে পারেনি। তাকে সান্ত্বনা দিই। কিন্তু ভেতরে বুকটা ভেঙে যায়।
২১ মার্চ ফোন করে শায়েক। বলে, আজ একটা গেম আছে, তবে এটাতে মনে হয় যেতে পারবে না। ২৩ তারিখের গেমে যেতে পারবে।
মনে মনে আল্লাহ–আল্লাহ জপি। শায়েকে বলে, ‘আব্বা, আর মনে অয় কথা অইত না। আমার ভাইবইনরে দেইখ্যা রাইক্কো। চিন্তা কইরো না, দোয়া কইরো।’
কিন্তু ২৩ মার্চ ফোনে তাকে পাই না। দালালও ফোন ধরে না। মনে অশান্তি শুরু হয়, কিছুই ভালো লাগে না। কাউকে ফোনে পাই না।
২৮ মার্চ বিকেলে এলাকার মানুষে শায়েকের খবর জানতে চায়। জিজ্ঞাসা করে, ‘শায়েক ভালা আছেনি?’ আমার বুক–ধরফর শুরু হয়। পরে শুনি, ২১ তারিখের গেমেই আমার শায়েক ছিল। নৌকায় পানি আর খাবারের অভাবে আমার কলিজার টুকরা মারা গেছে। তাকে শেষ দেখাটাও দেখতে পেলাম না।
অনুলিখন: খলিল রহমান