২০২৬ সালে ইউটিউব কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবে, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নিয়ে কী ভাবনা

দুনিয়া এখন কনটেন্টের। আরও স্পষ্ট করে বললে—কনটেন্ট নির্মাতাদের। আগামী দিনগুলোতে এই ধারণা যে আরও জোরালো হবে, সে রকম আভাসই পাওয়া গেল ইউটিউবের সিইও নিল মোহন–এর লেখা এক নিবন্ধে। ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে যাঁরা ভাবেন, এই লেখা তাঁদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।

কেনাকাটার জন্য ইউটিউব হয়ে উঠুক দর্শকদের পছন্দের গন্তব্য, এমনটাই তাদের চাওয়াছবি: পেক্সেলস

২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি, সৃজনশীলতা আর প্রযুক্তির মাঝখানের সীমারেখাটা ক্রমে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। শুরু হচ্ছে উদ্ভাবনের নতুন এক যুগ। বাঁকবদলের এ সময়ে কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাজি তো আমাদের ধরতেই হবে।

সংস্কৃতির কেন্দ্রে এখন ইউটিউব। কনটেন্ট নির্মাতারা বিনোদনের সংজ্ঞা নতুন করে লিখছেন। তাঁদের হাত ধরেই গড়ে উঠছে ভবিষ‍্যতের ‘মিডিয়া কোম্পানি’। ২০২৬ সালে কোন বিষয়গুলো আমাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে, চলুন জানা যাক।

আরও পড়ুন

বদলে যাওয়া বিনোদন

দর্শক ইউটিউবে কেন আসেন? কারণ, তাঁরা বড় সাংস্কৃতিক মুহূর্তগুলো কাছ থেকে উপভোগ করতে চান। তাঁরা চান জেসার বা কে অ‍্যাডামসের মতো নির্মাতাদের সঙ্গে সামনের সারি থেকে সুপার বোলের খেলা উপভোগ করতে; অস্কারের লালগালিচায় কী হচ্ছে, তা দেখতে; টেইলর সুইফট বা বিটিএসের অ‍্যালবাম প্রকাশ ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনায় ডুবে যেতে। ইউটিউবে এই সবকিছুই পাওয়া যায়।

ইউটিউবাররা এখন হলিউডসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে স্টুডিও সাইজের জায়গা কিনছেন, নতুন ধরনের কাজ করছেন। তৈরি করছেন উচ্চমানের, ‘মাস্ট সি’ (অবশ্য দ্রষ্টব্য) কনটেন্ট। এসব কনটেন্টকে কেবল ইউজিসি (ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্ট, অর্থাৎ ব‍্যবহারকারীদের তৈরি কনটেন্ট) বলে হালকাভাবে দেখার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। এগুলো পুরোদস্তুর পেশাদার শো! জুলিয়ান শাপিরো বার্নামের আসন্ন সিরিজ আউটসাইড টুনাইট–এর কথাই ধরুন। ডিজিটাল দুনিয়ার জন‍্য এক নতুন ‘লেট নাইট শো’–এর অভিজ্ঞতা দেবে এই আয়োজন। কনটেন্টের প্রযোজনা ও পরিবেশন (ডিস্ট্রিবিউশন) যেখানে নির্মাতার হাতে, সেখানে কল্পনাই তো তাঁর একমাত্র সীমাবদ্ধতা!

হাতে ধরা ছোট স্ক্রিনে হোক বা ঘরের সবচেয়ে বড় টিভি, দর্শক ইউটিউব বেছে নিচ্ছেন এখানকার কনটেন্টের বৈচিত্র্যের কারণে। লম্বা দৈর্ঘ্যের ভিডিও, শর্টস, মিউজিক ভিডিও, সরাসরি সম্প্রচার, পডকাস্ট—সব আছে।

ছোটখাটো আগ্রহের বিষয় থেকে শুরু করে বৈশ্বিক ট্রেন্ড, পছন্দের সব কনটেন্টই শর্টসে খুঁজে পাচ্ছেন দর্শক। শর্টস এখন প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার কোটি ভিউ পাচ্ছে। চলতি বছর শর্টসে আমরা আরও বৈচিত্র্য আনব। ছবি পোস্ট করার মতো বিভিন্ন ফরম্যাট সরাসরি ফিডে যুক্ত করব, যেন প্রিয় নির্মাতাদের সঙ্গে যুক্ত থাকা আরও সহজ হয়।

আমরা গানেও বিনিয়োগ করছি। নতুন প্রিয় শিল্পী খুঁজে পাওয়া, গানগুলোর পেছনের গল্প জানা, নতুন মুক্তি পাওয়া গান আবিষ্কার কিংবা উপভোগ, সবকিছুকেই আরও সহজ করে তুলছি। খুব শিগগিরই আমরা বিশেষায়িত ‘মাল্টিভিউ’ চালু করব। ইউটিউবে খেলাধুলা, বিনোদন ও খবর—এই তিন বিভাগে ১০টির বেশি বিশেষায়িত টিভি প্ল্যান আসবে। সাবস্ক্রাইবারদের হাতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতেই এসব প্রচেষ্টা।

শিশু-কিশোরদের উপযোগী

শিশুকিশোররা শেখার জন‍্য ও একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে ইউটিউবের ওপর নির্ভর করে। ক্লাসরুমের ভেতরে, বাইরেও। ২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮-২৭ বছর বয়সী দর্শকদের ৯৩ শতাংশ মনে করেন, ইউটিউব তাদের নতুন দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে। আবার ২০২৫ সালের অক্সফোর্ড ইকোনমিকস জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭৯ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, ইউটিউব শিক্ষার্থীদের শেখায় সহায়ক। আমাদের লক্ষ্য হলো ইউটিউব অনুসন্ধান ও শেখার জায়গা হোক, তবে এই যাত্রায় দিকনির্দেশনা দেওয়ার সক্ষমতা যেন মা-বাবার হাতে থাকে।

মা-বাবারা যেন তাঁদের সন্তানদের জন‍্য আরও সহজে অ‍্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, অ‍্যাকাউন্ট বদল করতে পারেন, সেসব উদ্যোগ আমরা চলতি বছরেই নেব। সন্তান শর্টস স্ক্রল করার পেছনে কতটুকু সময় ব্যয় করতে পারবে, খুব শিগগির মা-বাবারা সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

ইউটিউবের সিইও নিল মোহন
ছবি: উইকিমিডিয়া

নির্মাতাদের আয়-উপার্জন

নির্মাতারা ইউটিউবকে পছন্দ করেন। কারণ, এই প্ল্যাটফর্মে আয়ের পথটা সবচেয়ে স্থিতিশীল। শুধু গত চার বছরেই আমরা নির্মাতা, শিল্পী ও মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি দিয়েছি।

২০২৪ সালে ইউটিউবের ইকোসিস্টেম যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে যোগ করেছে ৫৫ বিলিয়ন ডলার। কনটেন্ট নির্মাতারা যেভাবে নিজেদের ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, তাতে শুধু এই এক দেশেই ৪ লাখ ৯০ হাজারের বেশি পূর্ণকালীন চাকরি তৈরি হয়েছে।

একজন নির্মাতার মাথায় যত রকম আইডিয়া আসে, সব আইডিয়ার সঙ্গেই মানানসই আয়ের মডেল তৈরি করা আমাদের লক্ষ্য। আমার চাই, কেনাকাটার জন‍্যও ইউটিউব হোক দর্শকের গন্তব্য। কারণ, দর্শক যাঁদের ভিডিও দেখেন, তাঁদের পরামর্শ ও পণ্যের ওপর আস্থা রাখেন। বিনীত মালহোত্রার মতো নির্মাতারা ২০২৫ সালে ইউটিউব শপিংয়ের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছেন। এখন ইউটিউব শপিংয়ে যুক্ত আছেন পাঁচ লাখের বেশি নির্মাতা। তাই ঝামেলাহীন কেনাকাটার ওপর এখন আমরা আরও বেশি জোর দিচ্ছি।

খুব শিগগির আরও নানা সুবিধা আসবে। যেমন কোনো নির্মাতা, ধরা যাক ক্রিস্টেন ডোমিনিক একটা পণ্যের ব্যাপারে সুপারিশ করলেন, আপনি ইউটিউব অ‍্যাপ ছাড়াও সেটি কিনে ফেলতে পারবেন।

কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য ব্র্যান্ডের সঙ্গে অংশীদারত্ব (পার্টনারশিপ) খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঠিকঠাক নির্মাতা খুঁজে নেওয়া, তাঁর সঙ্গে কাজ করা এবং সফল ক্যাম্পেইন চালানো—এসব কাজ ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং এজেন্সি ও ব্র্যান্ডগুলোর জন্য আমরা সহজ করে দিচ্ছি। সবই হবে আমাদের ‘ক্রিয়েটর পার্টনারশিপ হাব’–এর মাধ্যমে।

সেই সঙ্গে আমরা নির্মাতাদের হাতে তুলে দিচ্ছি কিছু নতুন টুল। যেমন শর্টসে সরাসরি কোনো ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইটের লিংক যোগ করা, বা কোনো চুক্তি শেষ হয়ে গেলে সেই ব্র্যান্ডেড অংশটুকু বদলে দেওয়া। এতে পুরোনো ভিডিওগুলোও নতুন করে আয় করার সুযোগ পায়। আমাদের লক্ষ্য একটাই—পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ‘ক্রিয়েটর ইকোনমি’ গড়ে তোলা।

আরও পড়ুন

সৃজনশীলতাকে শক্তিশালী করা ও নিরাপদ রাখা

বহু বছর ধরেই এআই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনের নীরব চালিকাশক্তি। পরের কোন ভিডিওটা দেখবেন, সেই পরামর্শ দেওয়া থেকে শুরু করে নীতিমালা ভঙ্গ করা কনটেন্ট সরিয়ে রাখা—সবখানেই এআই সক্রিয়।

একসময় সিন্থেসাইজার, ফটোশপ বা সিজিআই যেমন শব্দ আর ছবির দুনিয়া বদলে দিয়েছিল, এআইও তেমনই বড় সুযোগ। এই সুযোগ সেই সব সৃজনশীল মানুষের জন্য, যাঁরা এটাকে কাজে লাগাতে প্রস্তুত। গত ডিসেম্বরেই প্রতিদিন ১০ লাখের বেশি চ্যানেল আমাদের এআই ক্রিয়েশন টুল ব্যবহার করেছে।

এ বছর আপনি নিজের চেহারা ব্যবহার করে শর্টস বানাতে পারবেন, স্রেফ লিখে লিখেই গেম তৈরি করতে পারবেন, কিংবা নতুনভাবে গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবেন। একটি বিষয় স্পষ্ট—এই পুরো যাত্রায় এআই হয়ে থাকবে সৃজনশীলতার হাতিয়ার, মানুষের বিকল্প নয়।

দিন দিন বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছে—কোনটা বাস্তব, আর কোনটা এআই দিয়ে তৈরি। ডিপফেকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। ইউটিউবের এআই টুল দিয়ে তৈরি কনটেন্ট আমরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিই। নির্মাতাদের জন্যও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নিম্নমানের কনটেন্ট (যাকে অনেকে ‘এআই স্লপ’ বলেন) নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আমরা নানা ধরনের মতপ্রকাশের সুযোগ দিই। তবে ইউটিউবে সময় কাটিয়ে মানুষ যেন ভালো বোধ করে, এটা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব।

গত ২০ বছরে আমরা শিখেছি, ক্রিয়েটর ইকোসিস্টেমে আগে থেকেই কোনো ধারণা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এএসএমআর (ভিডিওতে এমন শব্দের ব্যবহার, যা মস্তিষ্ককে আরাম দেয়) বা অন্যকে গেম খেলতে দেখার ভিডিও একসময় অদ্ভুত মনে হতো। এখন কিন্তু এসবও হয়ে উঠেছে মূল ধারার বিনোদন।

আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয়—আগামী ৫ বা ১০ বছরে ইউটিউবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়েটর কে হবেন? আমার উত্তর সব সময় একটিই—তিনি এমন কেউ, যাঁর নাম আপনি এখনো শোনেননি। সেই মানুষটি হয়তো আজই তাঁর চ্যানেল শুরু করছেন।

ইংরেজি থেকে অনূদিত