একা ইফতার করতে করতে মনে পড়ছে দেশের কথা
বরফে ঢাকা নীরব শহর। জানালার ওপারে নিঃশব্দে ঝরছে সাদা তুষার। ঘরের ভেতর টেবিলে সাজানো ইফতারি। মনে হচ্ছে, ঘড়ির কাঁটা যেন আজ ইচ্ছা করেই ধীরে চলছে। ইফতারের সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট। মুঠোফোনে অ্যালার্ম সেট করা আছে, তবু অস্থিরতা কমছে না। কারণ, এখানে আজানের ধ্বনি শোনা যায় না। ইফতারের সূচনা হয় মুঠোফোনের যান্ত্রিক শব্দে। আমি বসে আছি সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে—কানাডার সাস্কাচুয়ান প্রদেশের সাস্কাটুন শহরে।
প্রবাসজীবনে প্রতিদিন পরিবার নিয়ে ইফতার করার সৌভাগ্য হয় না। আজ কাজ নেই, তাই একটুখানি স্বস্তি। কাজের দিনগুলো ভিন্ন রকম। সময়মতো ব্রেক মেলে না অনেক সময়। কোনোরকমে পানি দিয়ে রোজা ভাঙা, তারপর সুযোগ হলে বাসা থেকে বক্সে করে আনা ইফতারি খাওয়া।
বেশির ভাগ দিন একাই ইফতার করি। মাঝেমধ্যে যদি রোজাদার সহকর্মীদের সঙ্গে ব্রেক মিলে যায়, তখন ছোট্ট পরিসরে জমে ওঠে ইফতারের উষ্ণতা। ক্ষণিকের সেই আনন্দ মনকে ছুঁয়ে যায়।
কানাডার মুসলিম কমিউনিটি বিশাল। বিভিন্ন দেশের মানুষ, নানা সংস্কৃতি, নানা ভাষা। মসজিদে ইফতারের আয়োজন হয়, বসে কমিউনিটির মিলনমেলা। তবে সেখানে যেতে বরফ ঠেলে গাড়ি নিয়ে পাড়ি দিতে হয় দূরপথ। তার চেয়েও বড় বাধা সময়।
কাজের চাপ, দায়িত্ব, ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে সব সময় সেই মিলনমেলায় উপস্থিত হওয়া হয়ে ওঠে না। অথচ এই আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত। বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য মসজিদ যেন এক আশ্রয়। সারা দিন ক্লাস, তারপর কাজ—ক্লান্ত দিন শেষে সেই জায়গাটুকুই অনেকের স্বস্তি।
প্রবাসজীবন একসঙ্গে সাহ্রি বা ইফতার অনেকের কাছেই বিলাসিতা। পরিবার দূরে। আত্মীয়স্বজন দূরে। আপনজন দূরে।
রমজানের মতো পরিবারঘনিষ্ঠ সময়গুলোয় একাকিত্ব যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নীরব শহর, বরফঢাকা পথ, কাজের চাপ—সব মিলিয়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। অদ্ভুত লাগে আরেকটি বিষয়। আমাদের দেশে রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যায়। অথচ এখানে রমজান উপলক্ষে অনেক পণ্যে ছাড় চলে। সংস্কৃতি ভিন্ন, বাস্তবতা ভিন্ন, তবু রমজানের অনুভূতি একই থাকে।
বাবার চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কেটেছে শৈশব। কলোনির সেই রোজার দিনগুলো আজও স্পষ্ট হয়ে আছে। চাঁদ দেখা ছিল এক উৎসব। নিজের বাসার টিনের ছাদে ওঠা যেত না, তাই পাশের বাসার ছাদে উঠে চাঁদ খোঁজা। গাছের আড়াল থেকে চাঁদ উঁকি দেবে—এ বিশ্বাসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। তারাবিহর নামাজ, টিভিতে গজল, সাহ্রির ব্যস্ততা—সবকিছুতেই ছিল এক উষ্ণতা।
শীতের গভীর রাতে মাটির চুলায় আম্মুর কাঁপতে কাঁপতে রান্না করা। দূরের মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসা ঘোষণা—‘সম্মানিত এলাকাবাসী, আর মাত্র ৫ মিনিট বাকি...’
আম্মুর ডাকে ঘুম ভাঙত না, ভাঙত মাইকের ডাকে। তড়িঘড়ি উঠে নাকেমুখে খেয়ে নেওয়া দুধভাত আর পাটালি গুড়—সাহ্রির সেই স্বাদ আজও অমলিন। সবচেয়ে স্পষ্ট যে স্মৃতি—বাবা। সাহ্রি শেষে আমাদের দুই বোনের বরফশীতল হাত নিজের হাতের স্পর্শে উষ্ণ করে দিতেন বাবা। কম্বলের ভেতর বসে বাবা রোজার নিয়ত বলতেন,
আমরা সঙ্গে সঙ্গে বলতাম। বাবার সঙ্গে নিয়ত না পড়লে রোজা যেন পূর্ণ হতো না। বাবা রোজার আগে ঢাকা যেতেন। ফেরার পথে ব্যাগভর্তি এক মাসের খেজুর, কমলা, আঙুর ও ডালিম নিয়ে আসতেন। আমরা আব্বু আর আব্বুর সঙ্গে থাকা ব্যাগের অপেক্ষায় থাকতাম। বাসায় ঢুকলেই দুই বোন মিলে আঙুর লুকিয়ে রাখতে ব্যস্ত হয়ে যেতাম। ইফতার শেষে দেখিয়ে দেখিয়ে খেতে হবে যে!
সময় বদলেছে। বড় হয়েছি। দেশ ছেড়েছি। প্রবাসের রমজান এখন দায়িত্ব, সময় আর একাকিত্বের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে। তবু রমজান এলেই মন ফিরে যায় টিনের ছাদের দিনগুলোতে, শীতের কুয়াশায়, আম্মুর রান্নাঘরের আলোয়, বাবার স্নেহমাখা স্পর্শে।
ঠিক তখনই—মুঠোফোনের অ্যালার্ম বেজে উঠল। একমুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। যান্ত্রিক শব্দ জানান দিল ইফতারের সময় হয়েছে।
নাহ...মনে হলো যেন সাহ্রির সময়ই শেষ হয়ে গেল।
বাইরে তখন নিঃশব্দে তুষার ঝরছে। আর আমি জানালার ওপারে তাকিয়ে আছি—ছলছল চোখে ভাবছি, আহা রে প্রবাস!