যে বিদ্যুৎকেন্দ্র কখনো থামবে না, বাংলাদেশেও কি এভাবে বিদ্যুৎ তৈরি সম্ভব

সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে সারা বিশ্ব যখন তর্কবিতর্কে ব্যস্ত, ঠিক তখনই জাপান একেবারে নীরবে এমন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে ফেলেছে, যা কখনোই থামবে না। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো সোলার প্যানেল নেই, নেই কোনো বিশাল উইন্ড টারবাইন। জীবাশ্ম জ্বালানির তো কোনো নামগন্ধই নেই। এটি চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রযুক্তিতে, যার নাম অজমোটিক পাওয়ার।

সাগর ও নদীর মোহনায় যেখানে মিঠাপানি ও নোনাপানি এসে মেশে, ঠিক সেখানে তৈরি হওয়া চাপ
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

সাগর ও নদীর মোহনায় যেখানে মিঠাপানি ও নোনাপানি এসে মেশে, ঠিক সেখানে তৈরি হওয়া চাপকে কাজে লাগিয়েই এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দিনরাত ২৪ ঘণ্টা একটানা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলেছে। রোদ থাকুক বা না থাকুক, বাতাস বয়ে যাক বা না যাক—কিছুতেই এর কিছু যায়-আসে না।

প্রকৃতি লাখো-কোটি বছর ধরে পৃথিবীর প্রতিটি উপকূলে এই চাপ তৈরি করে আসছে। আর এখন জাপানি প্রকৌশলীরা সেই প্রাকৃতিক শক্তিকেই নিজেদের কাজে লাগানোর উপায় বের করে ফেলেছেন।

অজমোটিক পাওয়ার আদতে কী

স্কুলের বিজ্ঞান বইয়ে আপনি নিশ্চয়ই অভিস্রবণের কথা পড়েছেন। যে প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের শিকড় মাটি থেকে পানি টেনে নেয় বা আমাদের শরীরের কোষগুলো আর্দ্র থাকে, এটি ঠিক সেই একই প্রক্রিয়া। অজমোটিক পাওয়ারের ধারণাটি মূলত এই অভিস্রবণের নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

সত্তরের দশকে প্রথম ধরিত্রী দিবসের সময় এই ব্লু এনার্জির ধারণা সামনে আসে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যখন একটি বিশেষ অর্ধভেদ্য পর্দার একপাশে কম ঘনত্বের লবণাক্ত পানি এবং অন্যপাশে বেশি ঘনত্বের লবণাক্ত পানি রাখা হয়, তখন প্রাকৃতিক নিয়মেই মিঠা পানি লোনাপানির দিকে ছুটে যায়।

পানি ও আয়নের এই ছুটে চলার কারণে লোনাপানির অংশে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপকে কাজে লাগিয়েই ঘোরানো হয় বিশাল টারবাইন। সেই টারবাইন ঘুরলেই জেনারেটরের মাধ্যমে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

ফুকুওকার বুকে এক নতুন ইতিহাস

ফুকুওকায় গড়ে তোলা হয়েছে এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ অজমোটিক পাওয়ার প্ল্যান্ট
ছবি: উমিনোনাকামিচি নাতা সি ওয়াটার ডিস‍্যালিনেশন সেন্টার

জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর ফুকুওকা। এ শহরের আশপাশে বড় কোনো নদী নেই। কিন্তু বৃহত্তর ফুকুওকার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের এই শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানির প্রয়োজন হয়।

এই চাহিদা মেটাতে শহরটিতে আছে উমিনোনাকেমিচি নাতা সি ওয়াটার ডিস্যালিনেশন সেন্টার। স্থানীয়ভাবে একে মামিজুপিয়া বলা হয়। ২০০৫ সাল থেকে এই প্ল্যান্ট সমুদ্রের লোনাপানি থেকে লবণ আলাদা করে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ মানুষের জন্য ৫০ হাজার কিউবিক মিটার সুপেয় পানি তৈরি করে আসছে

কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় একটি বড় সমস্যা ছিল। সুপেয় পানি আলাদা করার পর যে অতিরিক্ত ঘন লবণাক্ত পানি অবশিষ্ট থাকত, তা আবার সাগরে ফেলে দেওয়া হতো। অন্যদিকে শহরের পয়োনিষ্কাশন কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত মিঠা পানিও সাগরে গিয়ে পড়ত।

জাপানি প্রকৌশলীরা ভাবলেন, এই দুটি অব্যবহৃত পানিকে একসঙ্গে কাজে লাগালে কেমন হয়?
এই ভাবনা থেকেই ফুকুওকায় গড়ে তোলা হয়েছে এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ অজমোটিক পাওয়ার প্ল্যান্ট।

২০২৩ সালে ডেনমার্কে প্রথম এমন একটি প্ল্যান্ট চালু হয়েছিল। তবে জাপানের এই প্ল্যান্ট আকারে বেশ বড় এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক বেশি আধুনিক। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার কিলোওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে, যা দিয়ে ২২০ থেকে ৩০০টি সাধারণ পরিবারের সারা বছরের বিদ্যুতের চাহিদা অনায়াসে মেটানো সম্ভব। আপাতদৃষ্টিতে পরিমাণটি খুব বিশাল না হলেও এটি আদতে দুটি ফুটবল মাঠের সমান সোলার প্যানেলের উৎপাদিত বিদ্যুতের সমান।

সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের চেয়ে এটি কেন আলাদা

নবায়নযোগ্য শক্তির কথা উঠলেই আমাদের মাথায় সবার আগে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের নাম আসে। কিন্তু এই দুটি উৎসেরই একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো নির্ভরযোগ্যতা।

সূর্য ডুবে গেলে বা মেঘলা দিনে সোলার প্যানেল কাজ করে না। আবার বাতাস না থাকলে উইন্ড টারবাইন ঘোরে না। এ কারণে এই বিদ্যুৎগুলোকে জমিয়ে রাখার জন্য বড় বড় ব্যাটারির প্রয়োজন হয়।

কিন্তু অজমোটিক পাওয়ারের ক্ষেত্রে এমন কোনো ঝামেলা নেই। ফুকুওকার এই প্ল্যান্ট বছরের ৩৬৫ দিনই ২৪ ঘণ্টা একটানা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। সমুদ্রের লোনাপানি কখনো ফুরিয়ে যায় না, অভিস্রবণপ্রক্রিয়াও কখনো বন্ধ হয় না। আবহাওয়া বা জলবায়ুর ওপর এর কোনো নির্ভরতা নেই।

প্ল্যান্টটির পরিচালনাকারী সংস্থা সিওয়াটার ডিস্যালিনেশন সেন্টারের পরিচালক কেনজি হিরোকাওয়ার মতে, এটি কার্বন নিঃসরণমুক্ত এবং সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য একটি পদ্ধতি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা আছে।

ফুকুওকার এই প্ল্যান্ট বছরের ৩৬৫ দিনই ২৪ ঘণ্টা একটানা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে
ছবি: উমিনোনাকামিচি নাতা সি ওয়াটার ডিস‍্যালিনেশন সেন্টার

এটি কেন আগে ব্যবহার করা হয়নি

শুনতে খুব সহজ মনে হলেও অজমোটিক পাওয়ারের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ কিন্তু পাহাড়সম। এর সবচেয়ে বড় বাধা হলো দক্ষতা। লোনা ও মিঠাপানি মেশালে শক্তি তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু এই পানিগুলোকে পাম্প করে পর্দার কাছে আনতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।

আবার মেমব্রেনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ঘর্ষণের কারণে শক্তির একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে এর আগে গবেষণাগারে এটি কাজ করলেও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করা কঠিন ছিল।

তবে জাপানের আধুনিক মেমব্রেন প্রযুক্তি এবং শক্তির অপচয় রোধকারী পাম্প এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান করেছে। জাপান ডিস্যালিনেশন মেমব্রেনের বিশ্ববাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

মেমব্রেন বা পর্দার যে সমস্যাটি বিজ্ঞানীদের এত দিন ভাবাচ্ছিল, জাপানের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান টয়োবো তার সমাধান নিয়ে এসেছে। তাদের তৈরি রিভার্স অজমোসিস মেমব্রেনগুলো বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ টন সুপেয় পানি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দিয়ে ৬৪ লাখ মানুষের পানির চাহিদা মেটে।

ফুকুওকার বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই উন্নত মেমব্রেন ব্যবহার করায় তা অত্যন্ত উচ্চ চাপেও নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ ছাড়া সাধারণ সমুদ্রের পানির বদলে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের ফেলে দেওয়া অতিরিক্ত ঘন লোনাপানি ব্যবহার করায় লবণাক্ততার পার্থক্য অনেক বেড়ে গেছে। ফলে শক্তি উৎপাদনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

অজমোটিক শক্তির এই ধারণা নিয়ে বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ কাজ করছে। জাপান ও ডেনমার্কের পাশাপাশি নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন ও কাতারেও এর পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় নিউ সাউথ ওয়েলস ও সিডনির চারপাশের বিশাল লবণাক্ত হ্রদগুলো ব্যবহার করেও এই শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ফুকুওকার প্ল্যান্টটি প্রমাণ করেছে, এই প্রযুক্তি এখন পরীক্ষাগারের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

জাপানের পরবর্তী চমক কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ

জাপান শুধু অজমোটিক পাওয়ার নিয়েই থেমে নেই। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য আরও অনেক বড়। তারা এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যা সরাসরি বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নিয়ে তাকে কৃত্রিম জ্বালানিতে রূপান্তর করবে। এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ফটোসিনথেসিস বা কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ।

গাছপালা যেমন সূর্যের আলো, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি ব্যবহার করে নিজেদের খাবার তৈরি করে, ঠিক একই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি থেকে ইথানল বা হাইড্রোকার্বনের মতো প্রয়োজনীয় রাসায়নিক জ্বালানি তৈরির চেষ্টা করছেন।

জাপানে একে নাসার অ্যাপোলো প্রজেক্টের মতো একটি বৈশ্বিক মিশন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা ফুয়েল সেলে ব্যবহৃত বিশেষ গ্যাস ডিফিউশন ইলেকট্রোড ও সৌরশক্তি ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে সরাসরি হাইড্রোকার্বনে রূপান্তর করতে সফল হয়েছেন।

এর মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে আগে পানিতে দ্রবীভূত করার ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলেছে। এ প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তিকে হাইড্রোকার্বনে রূপান্তরের দক্ষতা পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৭১ শতাংশ, যা প্রকৃতির স্বাভাবিক সালোকসংশ্লেষণের প্রায় সমান।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত একটি রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ প্রযুক্তির আংশিক সামাজিক বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, ২০৩৫ সালের মধ্যে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করারও পরিকল্পনা আছে, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে পৃথিবীর নির্ভরতা কমানো যায়।

যদি কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ থেকে তৈরি ইথানলের দাম সাধারণ গ্যাসোলিন বা বায়োইথানলের চেয়ে কমে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে এর বিশাল চাহিদা তৈরি হবে।

জাপান শুধু অজমোটিক পাওয়ার নিয়েই থেমে নেই। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য আরও অনেক বড়
ছবি: উমিনোনাকামিচি নাতা সি ওয়াটার ডিস‍্যালিনেশন সেন্টার

একটি নীরব বিপ্লবের অপেক্ষায় বিশ্ব

গত কয়েক দশকে পুরো বিশ্বের শক্তি উৎপাদনব্যবস্থা একটি দ্বিমুখী সংকটে আটকে আছে। একদিকে পরিবেশ ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি, অন্যদিকে সৌর বা বায়ুশক্তির মতো অনিয়মিত নবায়নযোগ্য শক্তির সীমাবদ্ধতা। কিন্তু অজমোটিক পাওয়ার ও কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণের মতো প্রযুক্তিগুলো এই দুইয়ের মাঝখানে একটি নতুন পথের সন্ধান দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত বাধাগুলো পার হতে পারলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটানো সম্ভব হতে পারে এই অজমোটিক পাওয়ারের সাহায্যে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।

এসব প্রযুক্তি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; বাস্তবেই কাজ করছে।
ফুকুওকার প্ল্যান্টটি প্রমাণ করেছে, ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট, বন্দর, উপকূলীয় শহর ও দ্বীপ অঞ্চলগুলোতে এই প্রযুক্তি স্থাপন করা সম্ভব। পৃথিবীর যেকোনো উপকূলীয় দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।

আগামী দশকের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলো হয়তো বিশাল কোনো জমকালো ঘোষণার মাধ্যমে আসবে না; আসবে খুব নীরবে। টোকিওর কোনো ল্যাবরেটরিতে কিংবা ফুকুওকার কোনো প্ল্যান্টে সেসব এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। যখন বাকি বিশ্ব এই নতুন প্রযুক্তিগুলোর দিকে নজর দেবে, তত দিনে এর অবকাঠামো পুরোপুরি দাঁড়িয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশেও কি এভাবে বিদ্যুৎ তৈরি সম্ভব

এককথায় বললে, অবশ্যই সম্ভব। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শত শত নদী এঁকেবেঁকে সোজা গিয়ে মিশেছে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে। অজমোটিক পাওয়ার বা ব্লু এনার্জির মূল শর্তই হলো মিঠাপানি ও লোনাপানির মিলনস্থল।

পদ্মা, মেঘনা বা ব্রহ্মপুত্রের মতো বিপুল জলরাশির মিঠাপানি যেখানে সাগরের লোনাপানির সঙ্গে মিশছে, প্রাকৃতিকভাবেই সেখানে তৈরি হচ্ছে অজমোটিক চাপের বিশাল এক আধার।

আমাদের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পায়রা বা মোংলার মোহনাগুলো এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে।

তবে জাপানের মতো আমাদেরও কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ আছে। এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র চাইলেই বানানো যাবে, কিন্তু তাতে কতটা লাভ হবে, তা–ও বিবেচনা করতে হবে।

বরগুনার খাকদোন নদের মোহনা, যেখানে বিষখালী নদী মিশেছে।
ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি সম্ভব কি না, তা জানতে কথা বলেছিলাম ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স রিসার্চের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের পরিচালক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম রেজওয়ান খানের সঙ্গে।

এম রেজওয়ান খান বলেন, ‘বিদ্যুৎ তৈরির অনেক পদ্ধতি। গরম ও ঠান্ডার পরিবর্তন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে, সমুদ্রের ঢেউ থেকে হতে পারে। কিন্তু এসব সাধারণত বেশি ব্যবহার করা হয় না। কারণ, এসবে যে খরচ, তা আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে কম নয়। জাপানের মতো দেশের এই সামর্থ্য আছে। ভবিষ্যতে তারা হয়তো আরও বড় প্রজেক্ট করবে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি কাজ না করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, খরচ কত পড়বে। ল্যাবে ছোট টেস্টের জন্য তৈরি করলে তা ভিন্ন জিনিস, কিন্তু আপনি যদি বড় পরিসরে এটা করতে চান, তাহলে খরচের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে।’

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স, জেডএমই সায়েন্স, জাপান ডটগো ডটজেপি, গ্লোবাল এনার্জি প্রাইজ ডট অর্গ এবং চ্যালেঞ্জ-জিরো ডটজেপি

আরও পড়ুন