সেমিকন্ডাক্টরের বিশাল বাজার, আছে বহু চাকরির সুযোগ
সেমিকন্ডাক্টরকে বলা যায় আধুনিক প্রযুক্তির ‘হৃৎপিন্ড’। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ল্যাপটপ, গাড়ি, কিংবা স্যাটেলাইট, সবকিছুতেই এই যন্ত্র কাজে লাগে। সারা বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টরের বিশাল বাজার আছে, যার অংশ হতে চেষ্টা করছে বাংলাদেশও। সেমিকন্ডাক্টর খাতে কী কী সুযোগ আছে, কীভাবে শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন, এসব নিয়েই লিখেছেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাদিম চৌধুরী
আজকের বাস্তবতায় যে দেশ ‘চিপ’ নিয়ন্ত্রণ করে, প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকে সে-ই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সবকিছুর কেন্দ্রেই আছে সেমিকন্ডাক্টর। শিল্প সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের দিকে এগোচ্ছে। অথচ এই খাতে দক্ষ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি আছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে ভাবতে হবে। গবেষণা ও শিল্প—দুই ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশ চাইলে এই খাতে জায়গা করে নিতে পারে; তবে সঠিক পথ বেছে নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের করণীয় কী
আমার অভিজ্ঞতায়, সেমিকন্ডাক্টর খাতে পেশাজীবী হিসেবে সফল হতে হলে তিনটি বিষয় জরুরি। পড়ালেখার শক্ত ভিত্তি, লক্ষ্য ঠিক রাখা ও হাতে-কলমে কাজ।
সবার আগে একটি ‘ট্র্যাক’ বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু একসঙ্গে শেখার চেষ্টা না করে নির্দিষ্ট একটি দিকের ওপর জোর দিন। ডিজিটাল ভিএলএসআই ও ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন ও টাইমিং, অ্যানালগ/মিক্সড-সিগন্যাল বা পাওয়ার ইলেকট্রনিকসে কাজ শিখতে পারেন। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ভেরিফিকেশন ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা অনেক, তাই এটি অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশপথ হতে পারে। মৌলিক ধারণা পরিষ্কার থাকলে যেকোনো উন্নত টুল শেখা সহজ হয়। এ জন্য সেমিকন্ডাক্টর ফিজিকস, সিএমওএস ও ভিএলএসআই ডিজাইনসহ পাইথন বা লিনাক্স সম্পর্কে জানতে হবে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ভেরিলগ/সিস্টেম ভেরিলগ, ওপেন-সোর্স পিডিকে ও ডিজাইন ফ্লো ব্যবহার এবং গিট দিয়ে ভার্সন কন্ট্রোল শেখা শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য।
বর্তমানে ওপেন সোর্স টুলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ছোট ছোট চিপ ডিজাইন ফ্লো সম্পন্ন করতে পারে। দশ বছর আগেও এটা সম্ভব ছিল না। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সিজিপিএ নয়, বরং প্রজেক্টে কাজের অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পায়। নিজের আরটিএল ব্লক ডিজাইন করে সিমুলেশন রিপোর্ট তৈরি করুন, ডকুমেন্টেশন লিখুন, গিটহাবে প্রকাশ করুন। বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির আবেদন করার সময় এসব আর্কাইভ আপনাকে এগিয়ে নেবে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যেসব খাতে কাজ হয়
সেমিকন্ডাক্টর শিল্প একটি বহুমাত্রিক ও আন্তসংযোগ ইকোসিস্টেম। এই ভ্যালু চেইনকে সাধারণভাবে চারটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়। তবে প্রতিটি স্তরে বাংলাদেশের সুযোগ সমান নয়। কিছু খাতে দ্রুত অগ্রসর হওয়া সম্ভব, আর কিছু খাতে প্রবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও কাঠামোগত প্রস্তুতি প্রয়োজন।
১. চিপ ডিজাইন (ফ্যাবলেস ডিজাইন): এখানে আরটিএল ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন, ডিএফটি, অ্যানালগ ও মিক্সড-সিগন্যাল ডিজাইন সবই অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের জন্য এটি সবচেয়ে বাস্তবসম্মত খাত, যেখানে আমরা দ্রুত প্রবেশ করতে পারি। বর্তমানে আমি নিজেও একটি চিপ ডিজাইনভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য ডিভাইস তৈরি করা নয়, বরং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইসি ডিজাইন ও সিস্টেম লেভেল সমাধান তৈরি করা। এ ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশ থেকেও গড়ে তোলা সম্ভব।
২. টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ওএসএটি/এটিপি): চিপ উৎপাদনের পর সেগুলো সরাসরি বাজারে যায় না। প্রতিটি চিপকে নির্ভুলভাবে পরীক্ষা এবং সুরক্ষিতভাবে প্যাকেজিং করতে হয়। এই ধাপটিই ওএসএটি (আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্ট) বা এটিপি (অ্যাসেম্বলি, টেস্ট অ্যান্ড প্যাকেজিং) খাত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রবেশপথ হিসেবে এটিই বাস্তবসম্মত। কারণ, এ ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় না। একই সঙ্গে এটি দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য।
৩. ডিভাইস ও প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং: ডিভাইস ও প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত ফ্যাব (ফেব্রিকেশন প্ল্যান্ট বা অত্যাধুনিক কারখানা) নির্ভর একটি খাত। এখানে সিলিকন ওয়েফার প্রস্তুতকরণ থেকে শুরু করে ফটোলিথোগ্রাফি, ডিপোজিশন, এচিং, আয়ন ইমপ্লান্টেশন, সবকিছু অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পন্ন হয়। এটি অত্যন্ত পুঁজি সাপেক্ষ খাত। একটি আধুনিক ফ্যাব স্থাপনে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।
৪. ইকুইপমেন্ট ও ম্যাটেরিয়াল সাপোর্ট: সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত উন্নত যন্ত্রপাতি ও বিশেষায়িত উপকরণ যেমন লিথোগ্রাফি সিস্টেম, প্লাজমা এচিং মেশিন, ডিপোজিশন টুল, বিশেষায়িত গ্যাস, ফটোরেজিস্ট এবং উচ্চমানের সিলিকন ওয়েফার। বাংলাদেশের বর্তমান শিল্প ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এই পর্যায়ের ভারী প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত নয়।
বাংলাদেশের জন্য সামনে যত সুযোগ
পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ফ্যাব স্থাপন একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল উদ্যোগ। তাইওয়ান যে অবস্থানে আজ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পৌঁছাতে তাদের কয়েক দশকের ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা লেগেছে। বাংলাদেশকে সেই বাস্তবতায় মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করতে হবে। দেশের সেমিকন্ডাক্টর সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার প্রকৌশলীদের দক্ষতার ওপর। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ল্যাব, পাইলট লাইন এবং ছোট আকারের প্রোটোটাইপিং সুবিধা গড়ে তোলা দরকার, শুধু পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে নয়, বরং শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত একটি জীবন্ত চর্চার জায়গা হিসেবে। বর্তমানে দেশে যে কয়েকটি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন–সংক্রান্ত উদ্যোগ গড়ে উঠছে, সেগুলো যদি একাডেমিয়ার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করে, তাহলে ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা এবং ক্যাপস্টোন প্রজেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবে, দক্ষ জনবল তৈরি হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ফাইভ–জি/সিক্স–জি, অটোমোটিভ ইলেকট্রনিকস ও স্মার্ট ডিভাইসের দ্রুত বিস্তারের ফলে ২০৩৪ সালের মধ্যে এই শিল্পের আকার ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন (দেড় লাখ কোটি) ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস মিলছে। সেমিকন্ডাক্টর আর কেবল একটি শিল্প নয়—এটি জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উচ্চমূল্য রপ্তানির কৌশলগত ভিত্তি। যদি আমরা মানসম্মত প্রশিক্ষণ, শিল্প-সংযুক্ত পাঠ্যক্রম, আন্তর্জাতিক মানের কাজের সংস্কৃতি এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে পারি, তবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনে, বিশেষত ডিজাইন ও ডিজাইন-সম্পর্কিত সেবায় দ্রুত একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্র কাজ শুরু করেছে। আমরা যেটাকে বলছি সেন্টার অব রিসার্চ এক্সিলেন্স ইন সেমিকন্ডাক্টর টেকনোলজি (ক্রেস্ট)। এর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, শিল্প-সহযোগিতায় গবেষণা এবং যৌথ মেধাস্বত্ব উন্নয়ন। আমরা প্রথমে ক্রেস্ট ফেলোশিপের মাধ্যমে আটজন স্নাতকোত্তর ও দুজন স্নাতক শিক্ষার্থীকে গবেষণার সুযোগ দিচ্ছি। তাঁরা বছরব্যাপী নয়টি উন্নত সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা বিষয়ে নিজ নিজ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। এখানে শুধু ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যুক্ত আছে।
সারা বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে আগামী ৫ বছরে প্রায় ১০ লাখ প্রকৌশলী দরকার হবে। গত ১৯ বছর ধরে আমরা এ নিয়ে কাজ করছি। উল্কাসেমি ভিএলএসআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউট উল্কাসেমির একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। মূলত যাঁরা সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইনের জগতে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাঁদের জন্যই এই ট্রেনিং সেন্টারটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি কোর্স যাঁরা সাজিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই এই খাতে বহু বছরের অভিজ্ঞতা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পড়াশোনা আর পেশাদার কাজের মধ্যে যে বিশাল তফাত থাকে, তা দূর করাই এই ট্রেনিং সেন্টারের প্রধান লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা সেমিকন্ডাক্টর খাতে ৫ হাজার দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করতে চাই।
প্রকৌশল, পদার্থবিজ্ঞানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যাঁরা স্নাতক করেছেন, তাঁদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের (সিসিপ) অধীন এই প্রশিক্ষণ দেবে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ)। প্রতিটি কোর্সের মেয়াদ হবে তিন মাস বা ২৪০ ঘণ্টা। ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে উচ্চমানের প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অন্তত ৬৫ শতাংশের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।