আমাদের গ্রামখানি প্রায় ছবির মতন। মাঝ দিয়ে প্রশস্ত রাস্তা এঁকেবেঁকে চলেছে বহু দূর। দুই পাশে অবারিত ফসলের খেত। রাস্তার পাশে একপায়ে দাঁড়ানো তালগাছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা। লাঠি মেরে আমরা বাবুই মারতাম। রাস্তার বুকে গর্ত করে মার্বেল আর ডাংগুলি খেলতাম প্রতিদিন। কচুরি পুকুর থেকে ডাহুক পাখি ধরে চলত আমাদের বনভোজন আয়োজন। কিন্তু সবই গোপনে। কারণ, বাবা আমার অগ্নিপুরুষ যার পুলিশসুলভ কঠোর ধমক শুনলেই বুক কেঁপে উঠত।সেদিন শলার মাথায় মাকড়সার জাল লাগিয়ে ঘাসফড়িং ধরতে গেলাম চুপিসারে। শালিকছানাটি আমার কতদিন ভালো খেতে পায়নি। শাওনের রোদে আদুল গায়ে শালিকের আহার খুঁজছি আমি। বাজারের ব্যাগটা রেখে বাবা আমাকে খুঁজতে বের হলেন। তাঁকে দেখে আমি যেন কাষ্ঠমূর্তি হয়ে গেলাম। নড়াচড়া করতে পারিনি। বাবা ডাকলেন, ‘খোকা, রোদের মধ্যে কী করিস, বাসায় আয়।’ বাবার আদরমাখা ডাক আমি আগেও শুনেছি, কিন্তু সেদিনের মতো নয়। প্রতিদিনের মতো আজও হয়তো বাদাম-চিপস পাব ভেবে বাবার কাছে এলাম। কিন্তু বাদাম-চিপস নয়—স্কুল পালানোর দায়ে বাবা কচা দিয়ে আমার শরীরে রামধনু আঁকতে লাগলেন। দাদু এসে জমের হাত থেকে আমাকে বাঁচালেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে ছুটে গেলাম। মায়ের আঁচল জড়িয়ে চোখ দুটি কচলাতে লাগলাম। মা বাবাকে কিছু বললেন না, শুধু চেয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ।মা স্নান করিয়ে ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে আমার শরীরে অঙ্কিত রামধনুগুলো মুছতে লাগলেন। মায়ের পটলচেরা চোখ থেকে গুলবদন বেয়ে অশ্রুধারা নামতে লাগল। মাকে দেখে আমি আর ঠিক থাকতে পারলাম না। জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। আমার অশ্রুর সঙ্গে মায়ের অশ্রু মিশে সেদিন যেন দিঘি সরোবর রচিত হলো। শাড়ির নীল আঁচল দিয়ে মুখ মুছে দিয়ে মা বললেন, ‘বাবা, আর স্কুল পালাইস না। তোর কিছু হলে আমি বড় কষ্ট পাই।’ সেদিন থেকে আর স্কুল পালাইনি আমি।মাকে ছেড়ে আমি আজ অনেক দূরে। দাদুও নেই। চলে গেছেন অক্ষয়লোকে। কিন্তু গৃহলক্ষ্মী মায়ের প্রেরণাগুলো যেন আজও আমাকে জড়িয়ে রেখেছে তার নীল আঁচলে মা আমার ধনি নন; তবু আমার জন্য টাকা জমিয়ে রাখেন। গ্রামে গেলে সেগুলো আমাকে গ্রহণ করতে হয়। মাগো, তোমার ঋণ শোধ করতে পারব না মহাকাব্য কিংবা কসিদা রচনা করে। ভালো থাকো তুমি। সালাম মাগো, তোমায় সালাম।মো. নাভিদুল হাসান