আট মাসে আট শিশুর বিয়ে!
মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী রুমা আকতার (ছদ্মনাম)। সাত মাস আগে মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় একই এলাকার এক প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া জন্মনিবন্ধন সনদে ওই শিশুর বয়স দেখানো হয়েছে ১৮ বছর।
এভাবে বাড়তি বয়স দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে রুমার মতো পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্তত আটজন শিশু শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ হয়েছে গত আট মাসে। সম্প্রতি পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এভাবে বাল্যবিবাহ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন বাসিন্দারা। তাঁরা মিথ্যা জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে এ ধরনের বিয়েতে প্ররোচনা দেওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দায়ী করেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এত কম বয়সে মেয়েকে কেন বিয়ে দিলেন জানতে চাইলে একজন শিশুর বাবা মনজুর আলম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ। তাই মেয়ের ভবিষ্যৎ ভালো হবে ভেবে পার্শ্ববর্তী গ্রামের প্রবাসী একজন ভালো পাত্র পেয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। তারা এখনো ভালো আছে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত আট মাসে কালারমার ছড়া ইউনিয়নের ইউনুছখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনজন, চিকনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন, নোনাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন, হোয়ানক ইউনিয়নের হরিয়ারছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুইজন এবং কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিশু শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, শিশুদের বিয়ে না দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের বুঝিয়েও কাজ হয়নি। তাঁরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সনদ নিয়ে মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন।
ইউনুছখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের বিয়ে না দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের বোঝালেও তাতে কাজ হয়নি। এ রকম বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে মিথ্যা জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু বন্ধ করা জরুরি।’
ঘটিভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শহিদুল আলম বলেন, ‘মনগড়া জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু বন্ধ করা হলে গ্রামগঞ্জের ৮০ শতাংশ বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়ে যাবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল আলম বলেন, ‘এভাবে বাল্যবিবাহের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানেরাও দায়ী। কারণ, জন্মনিবন্ধন কার্ড ইস্যু করার আগে সংশ্লিষ্ট মেয়ের বয়স যাচাই-বাছাই করার নিয়ম থাকলেও তাঁরা তা না করেই সনদ ইস্যু করছেন।’
কালারমার ছড়া, হোয়ানক ও শাপলাপুর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিয়ে নিবন্ধক (কাজী) আজাদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘আমরা বয়সের দলিল হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিদ্যালয় সনদ দেখি। যাদের এসব সনদ থাকে না তাদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেখে বিয়ে পড়াই। আর এ সনদ ইস্যুর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের।’
জানতে চাইলে কুতুবজোম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিউল আলম বলেন, ‘স্কুল-কলেজে ভর্তি, পাসপোর্ট, চাকরি ও নিকাহনামাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতিদিন অনেক লোক পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ নেন। এরমধ্যে অভিভাবকদের আকুতি-মিনতি কিংবা তাড়াহুড়োর মধ্যে ভুল তারিখের সনদ ইস্যু করা হতে পারে। তবে বিয়ের জন্য সনদ নেওয়ার কথা জানলে এরকম সনদ দিতাম না। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকব।’
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর বিয়ে হওয়ার ঘটনা আমাকে কেউ জানাননি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নোটিশ দেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে শিশুদের বিয়ে হওয়ার ঘটনাটি বেশ উদ্বেগজনক। এ ধরণের ঘটনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে শিগগিরই শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও কাজী সাহেবদের নিয়ে এলাকায় উদ্বুদ্ধকরণ সভা করা হবে। সনদ ইস্যুর ব্যাপরে সতর্ক থাকার জন্য চেয়ারম্যানদের চিঠি দেওয়া হবে।’