আনোয়ারার প্রত্যন্ত গ্রামে আলো ছড়ানো এক পাঠাগার

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম শিলাইগড়া। তিন যুগ আগে বইপ্রেমিক কিছু মানুষের প্রচেষ্টায় এখানে গড়ে উঠেছে একটি পাঠাগার। ১৭ জন সদস্য নিয়ে শুরু হয়েছিল এর কার্যক্রম। এখন সদস্য সংখ্যা আড়াই শ ছাড়িয়েছে। ছয় শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে পাঠাগারের দ্বিতল ভবন। গ্রামের লোকজনের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি সেবামূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং গাছ লাগানোর মতো সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করছে পাঠাগারটি।
গত ১২ এপ্রিল দুপুরে শিলাইগড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালঘেরা একটি দোতলা ভবনে চলছে শিলাইগড়া গণপাঠাগারের কার্যক্রম। দোতলা ভবনের মোট কক্ষের সংখ্যা তিনটি। নিচের তলার একটি কক্ষ পাঠকক্ষ ও অপরটি বারখাইন ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ওপরের তলার পুরোটাই বড় একটি কক্ষ, যা মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাঠকক্ষে ঢুকে দেখা গেল দুটি টেবিলে বসে বই ও পত্রিকা পড়ছেন পাঠকেরা। কাচে ঢাকা সাতটি আলমারিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মশাররফ হোসেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, হুমায়ুন আজাদসহ বিভিন্ন লেখকের দুই হাজারেরও বেশি বই রয়েছে। আছে শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা বইয়ের সংগ্রহ। পাঠাগারের গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেন কার্যকরী কমিটির সম্পাদক সিরাজ উদ্দীন। তিনি জানান, সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলে পাঠাগারের কার্যক্রম। দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি উপস্থিত থাকেন সেখানে। যখন কোনো কাজে বাইরে যান, তখনো পাঠাগার বন্ধ হয় না। গড়ে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন পাঠক পড়তে আসেন। বর্তমানে তিনটি দৈনিক, দুটি মাসিক ও একটি বিদেশি সাময়িকী রাখা হয় এখানে। সদস্যদের মাসিক চাঁদা ১০ টাকা। পাঠাগারে এসে পড়া ছাড়াও সদস্যরা সাত থেকে দশ দিনের জন্য বই বাড়িতে নিয়ে পড়তেও পারেন। পাঠকদের জন্য পাঠাগারে নিচতলায় একটি ও দোতলায় দুটি শৌচাগার এবং একটি নলকূপ রয়েছে।
পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানতে চাইলে সিরাজ উদ্দীন জানান, কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং এলাকার বইপ্রেমিক কিছু ব্যক্তির চেষ্টায় ১৯৭৮ সালে এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই সময় চট্টগ্রাম পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান রফিক আহমদ এই পাঠাগারের জন্য তিন শতক জমি দান করেন। পরে বিভিন্ন জনের দান করা টাকায় আরও তিন শতক জায়গা কিনে ছয় শতক জায়গায় গড়ে তোলা হয় পাঠাগার ভবন। বর্তমানে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের ভবনে পুরোদমে চলছে পাঠাগারের কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮০ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন লাভ করে এটি। পরে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও ইরানি সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়েরও স্বীকৃতি পায়। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠাগারে বিভিন্ন সময়ে বই ও বিভিন্ন সামগ্রী অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পাঠাগারের পথ চলার শুরুতে যে ১৭ জন সদস্য হয়েছিলেন, তাঁদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে এর কার্যকরী পরিষদ। এর বাইরে চার সদস্যের নির্বাহী পরিষদ ও আট সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ আছে পাঠাগার পরিচালনায়। দুই বছর পর পর কমিটি গঠন ছাড়াও, প্রতিবছর পাঠাগারের হিসাব নিরীক্ষা করা হয়।
বই পড়ার কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান, সাহিত্য আসর, বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম, চিকিৎসাশিবির ও প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করে পাঠাগারটি। এ ছাড়া পাঠাগারের প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কে দুই হাজার নারকেল ও ফলদ গাছ লাগানো হয়েছে পাঠাগারের পক্ষ থেকে। প্রতিবছর নারিকেল বিক্রি করে ৩০-৩৫ হাজার টাকা আয় হয় পাঠাগারের। পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এলাকায় পাঠক সৃষ্টি ও স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টি করতে আমরা এ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমানে এটি এলাকার সংস্কৃতিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।’
এ ব্যাপারে পাঠাগারের সভাপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পাঠাগারের উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ থেকে দুই ধাপে তিন লাখ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে। এই টাকা দিয়ে পাঠাগার ভবনের উন্নয়নকাজ করা হচ্ছে।