
গ্রিসের রাজা হিয়েরো এক স্বর্ণকারের কাছে একটা সোনার মুকুট বানাতে দিয়েছিলেন। স্বর্ণকার মুকুটটি বানিয়েছিলেন ভালোই। কিন্তু রাজার মনে সন্দেহ হলো যে স্বর্ণকার সোনা চুরি করেছেন এবং সেই চুরি ঢাকার জন্য মুকুটের মধ্যে খাদ মিশিয়েছেন। কোনো সহজ উপায়ে এই চুরি ধরা যায় কি না, জানার জন্য বিজ্ঞানী বন্ধু আর্কিমিডিসকে ডেকে পাঠালেন রাজা। আর্কিমিডিস সব শুনে বললেন, ‘একটু ভেবে বলব।’ ভাবতে ভাবতে বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল। একদিন গোসলের সময় কাপড় ছেড়ে সবে তিনি বাথটাবে পা দিয়েছেন, এমন সময় খানিকটা পানি উপচে পড়ল। হঠাৎ সেই প্রশ্নের এক চমৎকার মীমাংসা খেলা করে গেল আর্কিমিডিসের মাথায়! কোথায় গেল গোসল! আর্কিমিডিস নগ্ন শরীরে ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’ বলে রাস্তায় ছুটে বের হয়ে গেলেন।
অনেকেই আর্কিমিডিসের এই বস্ত্রশূন্য দৌড়ের গল্পটি নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন। তাঁদের সংশয় নিরসনে তাঁর ওই কীর্তির সম্ভাব্য কারণগুলো তুলে ধরা হলো—
বৈজ্ঞানিক কারণ: আমরা জানি, কাপড় পানি শোষণ করে। আর্কিমিডিস জামাকাপড় পরে পানিতে নামলে কাপড় শুষে নেওয়ায় পানি কিছুটা কম উপচে পড়ত। ফলে হিসাব-নিকাশে ভুল করে স্বর্ণকারের ভণ্ডামি না ধরতে পারলে ‘ভুয়া বিজ্ঞানী’ টাইপের উপাধি পেতেন।
জনস্বার্থে: প্রচারমাধ্যমে ‘পাবলিক খাবে’ বলে একটা কনসেপ্ট আছে। চিত্তাকর্ষক কিছু থাকলে জনগণ সে খবর খাবে অর্থাৎ জানতে আগ্রহী হবে। বিজ্ঞানের মতো ‘কঠিন’ বিষয়কে আমজনতার সামনে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতেই তিনি হয়তো এই পথ বেছে নিয়েছিলেন।
উদ্যাপনের উদ্দেশ্যে: মানুষ খুব বেশি আনন্দিত হলে আদিম সভ্যতার সঙ্গে নিজের যোগসূত্র খুঁজে পায়। আনন্দিত মানুষমাত্রই গিঁট্টু ঢিলা লুঙ্গির মতো, কখন কী করে বসে, সেটা অনিশ্চিত। বিষয়গুলো মাথায় রাখলে আর্কিমিডিসের এই কীর্তির যৌক্তিকতা অনুধাবন করা যায়।
পরিচিতির জন্য: অন্যান্য বিজ্ঞানীর সঙ্গে আর্কিমিডিসের পার্থক্য কী বলুন তো? ধান ও চালের মতো। অন্য বিজ্ঞানীর কথা বললে সেকেলে পোশাক পরা ভদ্রলোকের ছবি মনে ভেসে ওঠে, কিন্তু আর্কিমিডিসের নাম বললে মনে পড়ে আদিম যুগের মানুষের কথা। এখানেই বিশেষত্ব। সবাই চায় নিজের নামটা বিশ্ববাসী বিশেষভাবে জানুক। এ কাজটিই সম্ভবত করতে চেয়েছিলেন তিনি।
প্রতিবাদ হিসেবে: নানান মুসিবতে জনগণের যখন মাথায় হাত, রাজার মাথায় তখন স্বর্ণের মুকুট। আবার সেটা খাঁটি কি না তা-ও জনগণেরই পরীক্ষা করে দিতে হবে। পুঁজিবাদী বুর্জোয়া অপশক্তির এই শোষণ প্রলেতারিয়েত সমাজ এত দিন সহ্য করে এসেছে। ঠেলায় পড়ে আর্কিমিডিস হুকুম তামিল করেছেন, কিন্তু প্রতীকী প্রতিবাদে বুঝিয়েছেন—সত্যিকারের বাপের ব্যাটা হতে দামি পোশাক লাগে না।
কপিরাইট রক্ষার্থে: এত বড় বিজ্ঞানী, রাজার কাছের লোক আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? বিরোধী গ্রুপের কেউ এই আবিষ্কারের খবর আগে জেনে গেলে আর্কিমিডিস নামটি যদু-মধুর তালিকাতেই থেকে যেত। এ জন্য তিনি রিস্ক নেননি। কালজয়ী এক দৌড়ের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানান দিয়েছিলেন—অসম্ভবকে সম্ভব করাই আর্কিমিডিসের কাজ।