আলতাই পর্বতের স্বর্ণ-ইগল স্বর্ণকিশোরী

মঙ্গোলিয়ার আলতাই পার্বত্য অঞ্চলের কাজাখ কিশোরী শিকারি আশল-পান। ছবি: বিবিসি
মঙ্গোলিয়ার আলতাই পার্বত্য অঞ্চলের কাজাখ কিশোরী শিকারি আশল-পান। ছবি: বিবিসি

স্বর্ণ-ইগলকে খানিকটা ভয় করে বেশির ভাগ শিশুই। অবশ্য পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার কাজাখ ছেলেরা ১৩ বছর বয়স থেকেই এই বিরাট পাখিকে নিয়ে শেয়াল আর খরগোশ শিকার শিখতে শুরু করে। মেয়েরা এমন শিকারের চর্চায় আসে না খুব একটা। কিন্তু মঙ্গোলিয়ার ১৩ বছর বয়সী কিশোরী আশল-পান মনে হয় একেবারেই ভিন ধাতুতে গড়া। ভয়ডর তো নেইই, বরং এই ঝানু শিকারি পাখির সঙ্গে তার বোঝাপড়াটা এতই ভালো যে, সে যেন স্বর্ণ-ইগলের সখী শিকারি। আলতাই পর্বতের স্বর্ণ-ইগল আর এক স্বর্ণকিশোরী শিকারির গল্প বিবিসিকে জানিয়েছেন আলোকচিত্রী ও ভ্রমণকাহিনি লেখক আশের ভিদেনস্কি। 


পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার রুক্ষ আলতাই পর্বতমালায় জীবন বড়ই কঠিন। প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের নানা জনবিরল গিরিকন্দরে শিকার খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। শীতকালে প্রচণ্ড তুষারপাতের মধ্যে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ৪০ ডিগ্রিতে। শিকার শুরু হয় ঘোড়ার পিঠে চড়ে, কখনো কখনো পায়ে হেঁটেও। এ মসয় সাধারণত দল বেঁধে শিকারে নামেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পর্বতের চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে উঁচুতে উঠে সুবিধামতো জায়গা থেকে আশপাশটা দেখে নেন শিকারিরা। তাঁদের সঙ্গে থাকে যার যার স্বর্ণ-ইগল। কোথাও একটা শেয়াল বা খরগোশের দেখা মিললে কজন মিলে তাড়া করে সেটাকে খোলা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন শিকারিরা। তারপর ছেড়ে দেওয়া হয় একটা স্বর্ণ-ইগলকে। ঝানু শিকারি এই পাখি প্রাণীটাকে কয়েক ঠোকরেই কাবু করতে না পারলে ছেড়ে দেওয়া হয় আরেকটি ইগল। এভাবেই ঘায়েল শেয়াল বা খরগোশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন শিকারিরা।

শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে ১৩ বছরের কিশোরী আশল-পান। ছবি: বিবিসি
শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে ১৩ বছরের কিশোরী আশল-পান। ছবি: বিবিসি

কিশোরী আশল-পানের জন্ম এমনই একটা শিকারি পরিবারে। তার বাবা ওই অঞ্চলের বিখ্যাত শিকারি। ফলে ছোটবেলা থেকেই শিকার আর শিকারি পাখি স্বর্ণ-ইগলের সঙ্গে পরিচিত আশল-পান। পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার আলতাই পর্বতের কাজাখ জাতিসত্তার মানুষেরাই কেবল এই স্বর্ণ-ইগল নিয়ে শিকার করে থাকেন। অঞ্চলটিতে এখন এমন শিকারির সংখ্যা প্রায় ৪০০ জনের মতো হতে পারে। তবে নবিশ শিকারি কিশোরী একজনই, আশল-পান।

আলতাইয়ের দুর্গম অঞ্চলে আশল-পানকে খুঁজে পাওয়ার স্মৃতিচারণ করে আলোকচিত্রী ভিদেনস্কি বলেন, ‘স্বর্ণ-ইগলের সঙ্গে আশল-পানকে দেখার অভিজ্ঞতাটা দারুণ। সে পাখিটার সঙ্গে দারুণ সহজভাবে মানিয়ে নিয়েছিল। সে খুবই সাবলীল আর অনেক শক্তিশালী।’

ইগল নিয়ে শিকার করাটা সহজ নয় মোটেই। প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির মধ্যে নিহিত এর সাফল্য। আলতাই পর্বতমালায় কাজাখদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে শিকারের ছবি তোলা এই আলোকচিত্রী বলেন, ‘আপনি ইগলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। একটা প্রাণীকে শিকারের জন্য আপনি ওকে প্রলুব্ধ করতে পারেন, বাকিটা প্রকৃতির ব্যাপার। ইগলটা কি করবে? শিকার বধ করতে পারবে? আর তারপর সে কীভাবে ফিরে আসবে আপনার কাছে?’

স্কুলের শ্রেণীকক্ষে এবং উত্সবের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে কিশোরী আশল-পান। ছবি: বিবিসি
স্কুলের শ্রেণীকক্ষে এবং উত্সবের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে কিশোরী আশল-পান। ছবি: বিবিসি

শিকারি এই পাখিকে খুব ছোটবেলায় ধরে নিয়ে আসা হয় ইগলের বাসা থেকে। একটু বড় হয়ে ওঠার পর মাদি ইগলকে বেছে নেওয়া হয় শিকারের কাজে লাগানোর জন্য। সাধারণত একটা প্রাপ্তবয়স্ক স্বর্ণ-ইগলের ওজন হয় প্রায় ৭ কিলোগ্রামের মতো। দুই ডানার বিস্তার প্রায় ২৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। বহু বছর ধরে শিকারের কাজে ব্যবহার করে একসময় ছেড়ে দেওয়া হয় ঝানু এই শিকারিকে।

কাজাখদের মধ্যে এই শিকারের প্রথা এতই প্রাচীন আর এ তোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, বুড়ো স্বর্ণ-ইগলকে বিদায় জানানোটাও তাঁরা পালন করে নির্দিষ্ট আচারের মধ্য দিয়েই। কোনো এক বসন্তের সকালে কোনো এক উপত্যকার ঢালে গিয়ে শেষবারের মতো নিজের শিকারি পাখিটাকে উড়াল দিতে বলেন শিকারি। আর বিদায়ি উপহার হিসেবে ইগলটার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় একটা ভেড়া। পাখিটা উড়ে গিয়ে ভেড়াটাকে বধ করে। দীর্ঘদিনের শিকারের সহচর যোদ্ধাকে বিদায় দিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন কাজাখ শিকারি।

ভিদেনস্কি জানান, কাজাখরা স্বর্ণ-ইগলকে এভাবে বিদায় দেয়, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করে প্রকৃতির মধ্যে মুক্ত অবস্থাতেই এই পাখি তার নিজের জুটিকে খুঁজে পাবে এবং বংশবিস্তারের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী এই শিকারি জাতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।

অন্তত দুই হাজার বছর ধরে কাজাখরা শিকারি জাতি হিসেবে আলতাই পর্বতের দুর্গম এলাকায় টিকে থাকলেও তাঁদের নারীরা এমন শিকারে অভ্যস্ত নন। কিন্তু আধুনিক জীবনের প্রভাব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে এই শিকারিদের জীবনেও আর নানা অভিঘাতে ভেঙে পড়ছে অনেক ঐতিহ্যও। মঙ্গোলিয়ার বর্তমান তরুণ প্রজন্মই হয়তো আগামী দশকগুলোতে নির্ধারণ করবে তাঁরা কি কি ঐতিহ্য লালন করবেন আর কোনটা ফেলে দেবেন। এমন এক সময়ে এক নামী শিকারি পরিবারে জন্ম নেওয়া আশল-পান কি একুশ শতকে কাজাখ নারীদের সামনে নতুন দিনের কোনো বার্তা বহন করছে?