আশার স্বদেশ স্বপ্নের স্বদেশ

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একটি দেশ, সমাজ, সময়, সভ্যতা কতটুকু উন্নত, তা বোঝা যায় সেই সমাজের মানুষের জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন দেখে। পশ্চিমা দেশগুলোকে আমরা তাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির জন্য উন্নত ধরে নেই। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে। আমি গর্বিত এমন একটি দেশের মানুষ হয়ে।
আমি পারিবারিকভাবে ব্যবসায়ী এক পরিবারের সদস্য। বাবা-দাদাদের ব্যবসায় মনোযোগ দেখে আমি ব্যবসার প্রতি ছোটবেলা থেকেই আগ্রহী। বাবা কাজী সালাউদ্দিন ফুটবলার হলেও ব্যবসা নিয়ে ছিলেন ভীষণ আগ্রহী। একসময় ফুটবল, ট্রেনিং, খেলা নিয়ে যেমন সময় দিতেন, তেমনি পরবর্তীকালে ব্যবসার দিকে বাবার একাগ্রতা আমার ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমেরিকা থেকে দেশে এসে বাবার স্টিল ফ্যাক্টরিতে ইন্টার্নশিপ শুরু করি। আমি সব কাজ করার চেষ্টা করতাম। বাবার পরামর্শ ছিল, পুরুষদের মতো কাজ করার দরকার নেই। আমি সেটা পারব না। পুরুষদের কাজ অনুকরণের প্রয়োজন নেই। নারী হিসেবেই ফ্যাক্টরির সব কাজ বুঝতে-শিখতে পরামর্শ দেন। টঙ্গীর ফ্যাক্টরিতে দিনের পর দিন, ধুলোবালির মধ্যে কাজ শেখার চেষ্টা করেছি। কাজ শিখতে শিখতে একসময় নিজের কিছু করার ইচ্ছে জাগে। পদার্থ ও গণিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও ব্যবসার প্রতি ছিল আমার ভীষণ আগ্রহ।
স্টিলের ব্যবসা থেকে নানান মাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি এখন নিজের একটি স্টার্টআপ কোম্পানি নিয়ে কাজ করছি। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোর মতো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাসংশ্লিষ্ট সেবার দিকে ঝুঁকছে। আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রযুক্তিসেবা দিচ্ছে জার্মান প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এসএপি। বিজনেস অপারেশন ও কাস্টমার রিলেশনের জন্য সারা বিশ্বে ১৯০টি দেশে ২৬ লাখের বেশি এসএপির গ্রাহক আছে। বিশ্বের ৭৪ শতাংশ আর্থিক লেনদেন এসএপি সফটওয়্যারগুলোর মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। জার্মান প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এসএপি সারা বিশ্বের ব্যবসায়িক লেনদেন, গ্রাহকসেবা, কর্মী ব্যবস্থাপনার জন্য এসএপির এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার সেবা দেয়।
এসএপি হচ্ছে সিস্টেমস, অ্যাপলিকেশন অ্যান্ড প্রোডাক্টস ইন ডাটা প্রসেসিং সফটওয়্যার সেবা। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও ব্যবসা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সিস্টেম নিভর্রতার দিকে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে ইন্টারনেটনির্ভর এন্টারপ্রাইজ সলিউশন বেছে নিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এসএপিনির্ভর ব্যবসা ও আর্থিক লেনদেন গত কয়েক বছরে বেড়েছে কয়েক গুণ। বহুজাতিক কোম্পানিসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে সুনিশ্চিত গ্রাহকসেবা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য এসএপির এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার সেবার ওপর নিভর্রশীল।
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর সফটওয়্যার সেবার বিস্তৃতি নিয়ে আমার স্টার্টআপ কোম্পানি এসএস সলিউশনসের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছি। মবিলিটি, ক্লাউড, ইন-মেমোরি, অ্যানালিটিকস এবং ডেটাবেইস টেকনোলজির সাহায্যে এসএপির সফটওয়্যারগুলো বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দক্ষ ও কার্যকর পরিচালনায় সাহায্য করতে পারে, তার জন্য কাজ করছি আমি। এরই মধ্যে দেশের বেশ কটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এসএপিনির্ভর গ্রাহকসেবা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশের বেশ কিছু অগ্রণী ও উঠতি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এসএপির সফটওয়্যার ব্যবহার করে বেশ সফলতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসএপি সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকিউরমেন্ট, ম্যানুফ্যাকচারিং, ডিস্ট্রিবিউশন, সেলস, ফাইন্যান্স প্রভৃতি বিভাগের সব কাজ সুষ্ঠুভাবে দ্রুত ও ডিজিটাল উপায়ে পরিচালনা করা সম্ভব। বাংলাদেশের ব্যাংক, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রিটেইল, ফার্মাসিউটিক্যাল, টেক্সটাইল ও কেমিকেল খাতে সেবা প্রদানের মাধ্যমে এসএপি এরই মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, তৈরি পোশাকশিল্পগুলোও এই এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যারের মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হবে, সেদিকেই গুরুত্ব দিচ্ছি। স্বয়ংক্রিয়তা, উন্নত গ্রাহক ব্যবস্থাপনা ও বিশ্বমানের সেবার জন্য ব্যবসায়িক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসএপি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। আমি চেষ্টা করছি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসএপিনির্ভর দক্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও এসএপি বিষয়ে তরুণ পেশাদার জনবল তৈরির জন্য। এসএপি ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রযুক্তি ও ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ পায়।
এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে বৈশ্বিক ব্যবসা ও বাণিজ্যে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশি তরুণদের অনেক সম্ভাবনা আছে। সেই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ এরই মধ্যে তৈরি পোশাক দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সময় এখন তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক উদ্ভাবনের। ব্যবসা-বাণিজ্য তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশি তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যবহারিক শিক্ষা। তথ্যপ্রযুক্তির ওপর ব্যবহারিক শিক্ষা ও সনদ বাংলাদেশি তরুণদের আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের অংশগ্রহণে বেশ সহায়তা করবে। যে কারণে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবহারিক শিক্ষার মান উন্নয়ন ও বিস্তৃতি বাড়ানো প্রয়োজন।
তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ হলেও বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা উন্নত বিশ্বের মতোই। সমাজ ও অর্থনীতির নানা সেক্টরে সময়োপযোগী ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ উন্নয়নই পারে এ দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
বাংলাদেশের বড় একটি সুবিধা হচ্ছে তারুণ্য। পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় এই দেশের জনশক্তির বিশাল অংশ তরুণ। পরিপূর্ণ সুযোগ ও শিক্ষার বিস্তৃতি এই তারুণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অনেক সামনে নিয়ে যেতে পারে। এ দেশের তরুণদেরও দেশের প্রতি দায় ও কর্তব্যবোধের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। তরুণদের সবকিছুতেই প্রশ্ন করতে হবে। সবকিছুর পেছনে কারণ খোঁজার আগ্রহ থাকলেই সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়। শিশুদের মধ্যে প্রশ্ন করার আগ্রহ জন্মাতে পারলে আগামীর বাংলাদেশ অন্য রকম হবে। আর যেকোনো কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকতেই হবে। তরুণদের যে কাজটা করতে ইচ্ছে করবে, সেটাই করা উচিত। প্রচলিত ক্যারিয়ার কিংবা পড়াশোনার মধ্যে আটকে না রেখে নতুন কিছু করার আগ্রহ নিয়ে কিছু শুরু করতে হবে।
নারীরাও ধীরে ধীরে এ দেশের কর্মশক্তিতে বড় আকারে অবদান রাখা শুরু করেছে। নারী উদ্যোক্তাদের কাজ শুরুর ক্ষেত্রে অনেক বাধাবিপত্তি আসে। সামাজিক-পারিবারিক বাধা, আর্থিক বাধা আসবেই। সব বাধা এক পাশে রেখে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি নিজের মধ্য থেকেই আনতে হবে। ব্যর্থতা আসবেই। সাফল্য নাও আসতে পারে। কিন্তু নিজের আগ্রহ নিয়ে কাজ করে যেতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে অনেকাংশে। এটা আমাদের জন্য আশাবাদী একটা দিক।
সারাজিন কাজী: উদ্যোক্তা ও নির্বাহী পরিচালক, এসএস সলিউশনস।