আলোকচিত্র
শুভ পরিণয়ের নান্দনিক গল্প
করোনার দুঃসময়েও বাংলাদেশের তরুণেরা মেলে ধরছেন নিজেদের। নতুন বাস্তবতায়, নতুন উদ্যমে এগিয়েৃ চলছেন। জানান দিচ্ছেন তারুণ্যের অমিত শক্তি। বাংলা নববর্ষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় তরুণ, যাঁরা এরই মধ্যে দেখিয়েছেন প্রতিভার স্বাক্ষর, তাঁদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে ‘ছুটির দিনে’। ১৪২৮ বঙ্গাব্দেও উজ্জ্বল এমন তরুণদের হাজির করেছে ‘ছুটির দিনে’। যার মধ্যে আলোকচিত্রে আছেন অভিজিৎ নন্দী
ছোটবেলায় একটি ক্যামেরা হাতে চলে আসে তার। ইয়াশিকা। সেই ক্যামেরায় পরিবারের ছবি তুলত সে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা কিনে দেন প্যানটেক্স অটোফোকাস ক্যামেরা।
বোঝাই যাচ্ছে, ছেলেটি ছবি তোলার উৎসাহ পেয়েছিল পরিবার থেকেই। তত দিনে আলোকচিত্রী হওয়ার ইচ্ছাটা মনের গভীরে জাল বুনতে শুরু করেছে। তাই তো ধীরপায়ে এগিয়ে আসে আলো-আঁধারির জগৎটাকে আরও জানতে, বুঝতে। তখন একজন ভালো আলোকচিত্রী হওয়াই যেন ব্রত। আর সে জন্য দীর্ঘ আট বছর শুধু পরিচিত গণ্ডিতেই ছবি তুলে গেছে। অবশেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত মেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সম্পন্ন করে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে একদিন মাঠে নেমে যাওয়া।
মূলত ম্যাক্রো ফটোগ্রাফি ছিল অভিজিতের শখ। কিন্তু কিছুদিনেই বুঝে ফেলেন এ দেশে ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির ‘ভাত নাই’। তাই তির ঘুরিয়ে লক্ষ্য স্থির করলেন বাণিজ্যিক আলোকচিত্রের দিকে। কারণ, ছবি তুলে যেমন দুই পয়সা পকেটে তুলতে হবে, তেমনি ছবি তোলার সরঞ্জাম কেনার খরচটাও মেটাতে হবে। তার ওপর পরিবার-পরিজনের পর্যবেক্ষণ তো তো আছেই—‘ক্যামেরা তো কাঁধে, শেষ পর্যন্ত কী করে ছেলেটা দেখা যাক’! যাহোক, বিয়ের ছবি তুেল তিনি পরিচিতি পেলেন আলোকচিত্রজগতে।
অভিজিৎ নন্দীর ঘোরাঘুরির বাতিক আছে। নেপালে মাউন্ট এভারেস্টের বেসক্যাম্পেও গেছেন। ইচ্ছা ছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে ট্রাভেল ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করার। সারা পৃথিবী চষে বেড়ানোর। এর মধ্যে অভিজিৎ সুইডেনে মাস্টার্স প্রোগ্রামে গেলেন। পড়াশোনার ফাঁকে বিয়ের ছবি তুলে বেড়াতেন। সেখানে তাঁর ট্রাভেল ফটোগ্রাফির অভিজ্ঞতা কাজে লাগল। বিয়ের বর-কনেকে অভিজিৎ ধরে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যপটের সামনে। ছবি তুলতেন। কিছুদিনের মধ্যে সেখানে ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে তাঁর বেশ নামডাক হয়ে গেল।
অভিজিৎ দেশে ফিরে এলেন ২০১৮ সালে। বিয়ের ছবি তোলার প্রতিষ্ঠান ‘চিত্রগল্প’ চালু করলেন। তখনো বাংলা নামে বিয়ের ছবি তোলার প্রতিষ্ঠান বিরল। সবাই ইংরেজি নামই ব্যবহার করতেন, যাতে গুগলে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু অভিজিতের চিত্রগল্প অল্প দিনেই পরিচিতি পেল। বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিয়ের অনুষ্ঠানের ভিডিওগুলোতে হিন্দি বা ইংরেজি গান না দিয়ে বাংলা গান বা সুর ব্যবহার করতে শুরু করলেন।
চিত্রগল্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল গন্তব্যে গিয়ে বিয়ে বা ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের ছবি তোলা। বাংলাদেশে বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, কুয়াকাটা—অনেক জায়গায় ছবি তুলেছেন তাঁরা। দেশের বাইরে সুইডেন, নেপাল, ভারত ও শ্রীলঙ্কার প্রাকৃতিক পরিবেশেও বর-কনের ছবি তুলেছেন।
গত বছর বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির শুরু থেকেই অভিজিতের চিত্রগল্প একটা উদ্যোগ নিল। ‘নিজেদের তোলা ছবি বিক্রি করে দেশের ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রীদের সহায়তা করার চেষ্টা করলাম আমরা। প্রায় এক লাখ টাকার ছবি বিক্রি হলো। দেশে যেসব আলোকচিত্রীর স্থায়ী কোনো চাকরি নেই, শুধু ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর জীবিকা নির্বাহ করেন, এমন কয়েকজন আলোকচিত্রীকে আমরা এই তহবিল থেকে সহায়তা করেছি।’
এটা সত্য যে এখনো বাংলাদেশে আলোকচিত্রী পেশাটি তেমনভাবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। অনেকই বলেন এই পেশার ভবিষ্যৎ কী!’
আসলে ভবিষ্যৎ অভিজিৎ নন্দী নিজেও জানেন না। শুধু জানেন ছবি তোলা তাঁর যতটা না পেশা, তার চেয়েও বেশি হচ্ছে ‘নেশা’। এতে বুঁদ হয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন একদিন সারা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে ছবি তুলবেন। পুরো বিশ্ব হবে তাঁর ছবি তোলার মঞ্চ।
লেখক: প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক