উপকূলে নিষিদ্ধ জালে মা-কচ্ছপ নিধন চলছেই
বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলে মা–কচ্ছপ নিধন বন্ধ হচ্ছে না। ডিম দিতে উপকূলের দিকে আসার পথে সমুদ্রে পেতে রাখা মাছ ধরার নিষিদ্ধ জালে আটকে মারা পড়ছে কচ্ছপগুলো। জালে আটকা পড়া কচ্ছপ ছেড়ে না দিয়ে জেলেরা লাঠি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৭ মার্চ দুপুরে কক্সবাজার শহরের সমুদ্র উপকূলের নাজিরারটেক, ফদনারডেইল ও সমিতিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা অন্তত ২১টি মৃত কচ্ছপ বালুচরে পড়ে আছে। কচ্ছপের মুখ ও শরীরে ধারালো অস্ত্র ও লাঠির আঘাত। পড়ে থাকা এসব কচ্ছপের নরম অংশ কুকুরের দল খেয়ে ফেলেছে। পচে এসব কচ্ছপ থেকে বের হচ্ছে দুর্গন্ধ।
নাজিরারটেকের জেলে করিম উল্লাহ (৪৬) জানান, উপকূলের ১০-১২ কিলোমিটার দূরে তাঁরা কারেন্ট জাল (নিষিদ্ধ) ফেলে শুঁটকির জন্য পোপা, লইট্যা, ফাইস্যা, ছুরিসহ বিভিন্ন মাছ ধরেন। এ সময় অসংখ্য কচ্ছপ জালে আটকা পড়ছে। কচ্ছপ আটকা পড়লে জাল ছিঁড়ে যায়—এ জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিটিয়ে হত্যা করে সাগরে নিক্ষেপ করা হয়।
জেলেরা জানান, মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে পেতে রাখা হয়েছে তিন শতাধিক নিষিদ্ধ বিহিঙ্গি জাল। প্রতিদিন এসব জালে কচ্ছপ মারা যাচ্ছে। এসব কচ্ছপ জোয়ারের পানিতে নাজিরারটেক ও ফদনারডেইল সৈকতে ভেসে আসছে। কচ্ছপ রক্ষা করতে হলে নিষিদ্ধ জাল উচ্ছেদ জরুরি।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরতলির কলাতলী, বড়ছড়া, দরিয়ানগর, হিমছড়ি, উখিয়ার ইনানী, মনখালী, টেকনাফের বাহারছড়া, বড়ডেইল, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রতিদিন অসংখ্য মরা কচ্ছপ ভেসে আসছে।
সেন্ট মার্টিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানেও মরা কচ্ছপ ভেসে আসছে। মরা এসব কচ্ছপ পেলে মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। কিছু কচ্ছপ স্থানীয় শিশুরা রশি বেঁধে আবার সাগরে নিক্ষেপ করছে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম জানান, নিষিদ্ধ জাল অতিক্রম করে কিছু কচ্ছপ সৈকতে ডিম দিলেও তা রক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ, সৈকতে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব। কিছু মানুষ সৈকত থেকে কচ্ছপের ডিম চুরি করে মিয়ানমারে পাচার করছে।
কক্সবাজার (দক্ষিণ) বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, ৮ মার্চ দুপুরে তাঁরা টেকনাফ পৌরসভার লামারবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৫০টি কচ্ছপের ডিমসহ নিয়তি বালা নামের এক নারীকে আটক করেন। পরদিন সন্ধ্যায় টেকনাফ সদর ইউনিয়নের রাজারছড়া ও সাবরাং ইউনিয়নের চান্ডলীপাড়ায় পৃথক অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেন আরও ১৯৮টি কচ্ছপের ডিম।
কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আয়াছুর রহমান জানান, গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে গভীর সমুদ্রের মা–কচ্ছপগুলো ডিম দিতে উপকূলের দিকে ছুটে আসছে। গত তিন মাসে নিষিদ্ধ জালে আটকা পড়ে অন্তত তিন হাজার মা–কচ্ছপের মৃত্যু হয়েছে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চতুির্দকে এবং টেকনাফ থেকে মহেশখালীর সোনাদিয়া পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার উপকূলে বসানো থাকে ২০ হাজারের বেশি নিষিদ্ধ জাল। এসব জালে আটকা পড়ে জাটকাসহ মা–কচ্ছপ নিধন হলেও এসব উচ্ছেদে তেমন অভিযান চালানো হচ্ছে না।
কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান জানান, বর্তমানে জেলার ছয় হাজার ট্রলার সাগরে মাছ ধরছে। কিন্তু এর বাইরে আরও কয়েক হাজার নৌকা নিয়ে উপকূলের কাছাকাছি মাছ ধরছেন অনেক জেলে। এসব জালে আটকা পড়েই মা–কচ্ছপের মৃত্যু হচ্ছে। জালে আটকা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে কচ্ছপ ছেড়ে দিতে বলা হলেও বহু জেলে সেই নির্দেশ মানছেন না।
কক্সবাজার সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মঈনউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোস্টগার্ডকে সঙ্গে নিয়ে মৎস্য বিভাগ নাজিরারটেক ও সোনাদিয়া উপকূলে একাধিকবার অভিযান চালিয়ে জাটকাসহ বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধজাল জব্দ করেছে। কিন্তু লোকবল–সংকটের কারণে এই অভিযান চলমান রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া গভীর সাগরে নেমে অভিযান চালানোর মতো জলযান মৎস্য বিভাগের নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, নিষিদ্ধ জালে আটকা পড়েই মা–কচ্ছপের মৃত্যু হচ্ছে। এ ব্যাপারে জেলেদের সচেতন করার পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর সৈকত থেকে ডিম সংগ্রহ করে কচ্ছপের বাচ্চা ফোটানোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।