উল্টো পথে গাড়ি চালানো মানে আইন না মানা

উল্টো পথে গাড়ি চালানো আইনের লঙ্ঘন। ছবি: প্রথম আলো
উল্টো পথে গাড়ি চালানো আইনের লঙ্ঘন। ছবি: প্রথম আলো

সময় বাঁচানোর অজুহাতে রাস্তায় উল্টো দিকে গাড়ি চালালেন—আপনি হয়তো ভাবলেন এ আর এমন কী। রথী-মহারথীদের গাড়ি তো হরহামেশাই ঢাকার পথে উল্টো দিকে যায়? এমন দেখে একধরনের উৎসাহ বা সাহসও আপনি পেয়ে গেলেন। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের হাতে ধরা পড়লেই বোঝা যাবে যে উল্টো পথে চলার বিপদ কী রকম হতে পারে।

উল্টো পথে গাড়ি চালানোর জন্য খেসারত যে দিতেই হয় তা তো সম্প্রতি ঢাকার রাস্তাতেই দেখা গেল। রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে নির্দিষ্ট আইনকানুন মেনে চলতেই হবে। এর ব্যত্যয় হলে পেতে হবে শাস্তি। শাস্তির পাশাপাশি আইনের জালে আটকে যাওয়ার ভোগান্তি তো আছেই। অনেকেই বলে, উল্টো চলার শাস্তি আর তেমন কী। কিন্তু শাস্তি কম বা বেশি যা-ই হোক, আইনের চোখে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কিন্তু গণ্য হয়ে যেতে হবে। উল্টো চলার শাস্তি যে খুব কম তাও কিন্তু নয়।

কী বলে আইন?

আমাদের দেশে রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে যে আইনের আওতায় থাকতে হয়, সেটার নাম হচ্ছে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩। যদিও পরে ১৯৯০ সালে এ আইনের কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। এই আইনের আওতায় রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে এর প্রতিটি বিধান মেনে চলতেই হবে। এ আইনে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর সাজা দুই রকমভাবে বলা আছে।

আইনের ১৪০ ধারায় সরাসরি বলা হয়েছে, এক দিকে চলাচলের রাস্তা (ওয়ানওয়ে) অমান্য করলে ২০০ টাকা জরিমানা হবে। এ ছাড়া ১৪৩ ধারা অনুযায়ী বিপজ্জনক বা বেপরোয়া গাড়ি চালালে এর জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল অথবা ৫০০ টাকা জরিমানা হতে পারে। সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্সও স্থগিত থাকবে। যদি পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে আবার একই অপরাধ করা হয়, তবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল কিংবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। মনে রাখতে হবে, উল্টো দিকে গাড়ি চালানো কিন্তু বিপজ্জনক বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর মধ্যেই পড়ে। তাই এ ধারার ফাঁকফোকরের যুক্তি দিয়ে লাভ নেই। এ আইন ছাড়া দণ্ডবিধিতেও শাস্তির কথা উল্লেখ করা আছে। দণ্ডবিধিতে শাস্তির মাত্রা কিন্তু বেশি।

দণ্ডবিধির ২৭৯ ধারায় বলা হয়েছে, জনসাধারণের ব্যবহৃত কোনো সড়কের ওপর দিয়ে বেপরোয়া বা অবহেলামূলক গাড়ি চালালে তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনা শ্রম কারাদণ্ড কিংবা সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকাসহ উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। উল্টো পথে গাড়ি চালাতে গিয়ে ধরা পড়লে পুলিশ কোন ধারায় ব্যবস্থা নেবে তা পুলিশের ব্যাপার। পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারও করতে পারে। তবে যে ধারায় দিক না কেন, আইনের হাত থেকে মুক্তির উপায় কিন্তু সহজ নয়। জামিন জিম্মার বিষয়ও জড়িত রয়েছে এখানে। ভ্রাম্যমাণ আদালতেরও এখতিয়ার রয়েছের তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়ার।

দায় কি শুধু চালকের?

সম্প্রতি ঢাকায় উল্টো পথে গাড়ি ধরতে যে অভিযান হলো এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও কারও মতামত ছিল যে আইনে শুধু চালকের সাজার কথাই বলা আছে। এ কথাটিও পুরোপুরি ঠিক নয়। মোটরযান আইনের ১৪৭ ধারায় বলা হয়েছে, ১৪৩ ধারায়  যদি বিপজ্জনক বা বেপরোয়া গাড়ি চালাতে যে কেউ সহায়তা করেন, তাহলে তিনিও সমভাবে অপরাধী হবেন এবং একই পরিমাণ শাস্তি পাবেন। এর মানে হচ্ছে, চালক যদি বলেন তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কিংবা সহায়তা করা হয়েছে, তাহলে গাড়ির যাত্রী হোক বা মালিক, সমান দোষে দোষী হবেন। এমনকি চালক স্বীকার না করলেও সাধারণভাবেই উল্টো পথে গাড়ি চালাতে যাত্রীর সহায়তা আঁচ করা যায়। এ ছাড়া দণ্ডবিধিতে অপরাধে প্ররোচনা বা সহায়তার শাস্তির বিধান তো আছেই। তবুও বিষয়টি ট্রাফিক পুলিশের বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করে অনেকাংশেই।

তাই উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে কিংবা গাড়ি চালাতে সহায়তা করে দ্রুত পৌঁছাতে গিয়ে আইন অমান্য করে না ফেলেন। রাস্তার চলাচলের সময় আইন মানুন, নিরাপদে থাকুন।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।