কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়
তরুণীকে ধর্ষণের পর ইন্টারনেটে ভিডিও ভাইরাল করা এবং চলন্ত বাসে নারীকে গণধর্ষণ। টিকটকে তারকা বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করার চেষ্টা, পরে উদ্ধার এবং অপরাধীরা গ্রেপ্তার—সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ঘটনা। এসব ঘটনা সমাজে নতুন নয়। প্রতিরোধ, কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ নেই বলে বারবার ঘটে চলছে ঘটনাগুলো। কীভাবে ভয়াবহ এই পরিস্থিতি থেকে রাষ্ট্র-সমাজকে বাঁচানো যায়, তা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইনের আশ্রয় নিতে হবে দ্রুততম সময়ে
অ্যাডভোকেট সালমা আলী
সভাপতি, জাতীয় মানবাধিকার সমিতি
ধর্ষণের যে ভিডিওটি ভাইরাল হলো, সেই মেয়েটির আইনি প্রক্রিয়া এখন আমাদের হাতে। আমি নিজ তত্ত্বাবধানে বিচারপ্রক্রিয়াটির মধ্যে আছি। ভুক্তভোগীর বাবা এই মামলার বাদী। বাবা আইনের আশ্রয়ে এসেছেন। কারণ, মেয়ের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও ভাইরাল না হলে, লোক জানাজানি না হলে তিনি কিন্তু আইনের আশ্রয় নিতেন না। বাংলাদেশে সব সময় এমনই হয়ে আসছে। নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কিন্তু ভুক্তভোগীর পরিবার আইনের আশ্রয় নেয় না। যদিও ঘটনার জের ধরে আসতে হয় তাঁরা অনেক সময় পার হওয়ার পর আসেন। এই চর্চা থেকে বের হয়ে আসার অনুরোধ রইল রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের কাছে।
কিশোরী-নারী পাচারের ক্ষেত্রে বলব বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত ভারতসহ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে প্রচুর নারী-শিশু পাচারের ঘটনা আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। এ বিষয়টাতে আমরা ধরতে পারি শুধু মধ্যস্থতাকারীদের। যাঁরা এর শীর্ষে আছেন তাঁরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই অপরাধটির ধারাবাহিকতা প্রতিরোধ করা যায় না। এরই ধারাবাহিকতায় যেসব দেশে নারী-শিশুরা পাচার হচ্ছে সেই সব দেশের সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করলে পাচার এবং নারী নির্যাতনের হার অনেকটা কমে যাবে।
এমন ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে, ঘটেই যাচ্ছে
মালেকা বানু
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
চলন্ত বাসে গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর ভিডিও ভাইরাল। এটা কিন্তু নতুন না। এমন ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে, ঘটেই যাচ্ছে। এতে করে কী হচ্ছে? আমাদের নারীরা আরও কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছেন। ঘরবন্দী থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু নারীকে তো একা চলাফেরা করতে হবে।
যে নারী নিত্য একা চলাফেরার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন তাঁকে এখন নতুন করে রাস্তাঘাটের এমন দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘর থেকে, কর্মস্থল থেকে বের হতে হবে। এই দুশ্চিন্তা শুধু তাঁর একার নয়। তাঁর পরিবারেরও। তো প্রতিনিয়ত একজন নারী নিরাপত্তার এমন বোঝা মাথায় নিয়ে কেন ঘুরবে? রাষ্ট্র কী ব্যবস্থা নিচ্ছে নারীর জন্য?
আমরা প্রতিটি ঘটনায় আন্দোলন করছি, প্রতিবাদ করছি। কিন্তু কোনো সুফল তো পাচ্ছি না। ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। চলন্ত বাসের এই গণধর্ষণ, তার জন্য দায়ী সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তারা কেন গণপরিবহনের জনবলকে একটা নিয়মের মধ্যে আনছে না। এটা তাদের দায়বদ্ধতা। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে কঠোর হতেই হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় কোনো উদ্যোগ না নিলে, শাস্তি এবং বিচারের ব্যবস্থা না রাখলে এ ঘটনা দুদিন পরপরই ঘটতে থাকবে। তাদের বুঝতে হবে এখনই সময় কঠোর হাতে এই সমস্যা মোকাবিলা করার।
এখন কঠোর হওয়ার সময়
ফারাহ কবীর
কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ
এই যে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে গণধর্ষণ করা হলো, তিন-চারজনে মিলে একজনকে ধর্ষণ করে তাঁর ভিডিও ভাইরাল করে দিল—এটা কি একটা স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামোর পরিচয়? মোটেই না। স্বাভাবিক তো নয়-ই, আমি বলব চরম বিকৃত রুচির প্রতিফলন। আর এটা যে হুট করে একজন মানুষ করে ফেলছে, তা কিন্তু নয়। যে বা যারা করছে, তারা আশৈশব দেখে আসছে নারীকে হেয় করা যায়, তার ওপর যেমন-তেমন নির্যাতন করা যায়। এতে কোনো পারিবারিক-সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নেই। ইচ্ছে করলেই নারীর ওপর চড়াও হওয়া যায়। তারা তাদের মাসহ আশপাশের নারীদের প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হতে দেখে এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এ ঘটনাগুলো ঘটছে।
আমরা যদি এখনই এটাকে প্রতিরোধ না করি, তবে বারবার ঘটা ঘটনাগুলো বেড়েই চলবে। তাই আইন-সমাজ-রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরের মানুষকে এখন কঠোর হওয়ার সময়। প্রতিটি স্তরে এই ঘটনাগুলোয় কঠোর না হলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে।
আমি এও বলব, সামাজিকভাবে আমাদের একজোট হতে হবে। এটা সামাজিক আন্দোলন ছাড়া হবে না। পরিবারগুলোয় পিতৃতান্ত্রিকতার চর্চা কমাতে হবে। নারী যে হেয়প্রতিপন্ন বা নির্যাতিত হওয়ার যোগ্য, এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
নির্যাতিতের পাশে দাঁড়িয়ে আইনের সুবিধা নিতে হবে
ফারহানা এ রহমান
জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে ইতিবাচক পথে অগ্রসর হচ্ছিল বাংলাদেশ, মাঝেমধ্যে তার এত নেতিবাচক ও ভয়াল রূপ আমরা দেখতে পাই, যা দেখে শিউরে উঠি। আতঙ্কে চোখের ঘুম চলে যায়।
সম্প্রতি ধর্ষণের যে ভিডিওটি ভাইরাল হলো, এটা এমনই একটি আতঙ্কের বিষয়। যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই শিউরে উঠেছেন। মানুষ এখন প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে ডিজিটাল মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে। মানুষ খুব আক্রমণাত্মক হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
অনেক প্রতিযোগিতা সবার মধ্যে। সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে বুঝতে পারছে না কী করা উচিত, কী উচিত নয়? প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমরা যা খুশি তা করি। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ডিজিটালি ভালো জিনিসগুলো প্রচার করতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে আরও প্রচার ও প্রসার দরকার। মানুষের মধ্যে এই আইনের কথা এখনো ছড়িয়ে পড়েনি। কেউ হেনস্তার শিকার হলে নিজেকে গুটিয়ে না নিয়ে তিনি যেন আইনের আশ্রয় পান, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যাঁরা সচেতন নাগরিক তাঁদের নির্যাতিতদের পাশে থেকে এই আইনের সুবিধা গ্রহণে সাহায্য করতে হবে।