
প্রতিদিনই বইমেলায় আসে কবি রুদ্র রায়হান। তরুণ কবিদের মধ্যে বেশ নাম করেছে সে। তার আসল নাম রায়হান ইসলাম খান। তবে কবিদের ক্ষেত্রে নামের সঙ্গে রুদ্র, আদিত্য ইত্যাদি উপমা যোগ করা এখনকার ট্রেন্ড। তার বয়স ৩০ বছরের নিচে। এখনো বিয়ে করেনি। ঢাকা শহরের একটি মেসে থাকে। তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার ধানডোবা গ্রামে। বাড়ির পাশেই কুমার নদ, আর অবারিত সবুজের মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে একসময় গুনগুন করে গান গাইত কবি রুদ্র রায়হান। সবাই তখন বলত, রায়হান গায়ক হবে নাকি?
কিন্তু তার গান শেখা হয়নি। কবিতা লিখতে থাকে। স্কুল পার করে কলেজে যায়। একটি কবিতা কোথাও ছাপাতে পারেনি। তাই নামকরা কবিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। একটি কবিতা ছাপার জন্য পত্রিকা অফিসে যায়। কিন্তু কবিতা ছাপা হয় না। মুখের ওপর তারা বলে দেয়—কবিতা তো কিছুই হয়নি।
বড় কবিরা বলে, ‘বেশি বেশি কবিতা পড়ো।’ তাদের উপদেশ মেনে দিনরাত কবিতা পড়ে। ক্লাসের বই কেনার টাকা দিয়ে কবিতার বই কেনে। কিন্তু ভালো কবিতা লেখা হয় না। কেউ কেউ বলে, ‘কবিতা লিখতে হলে কষ্ট পেতে হবে। কিন্তু কষ্ট কী করে পাবে?’
হঠাৎ কলেজের এক প্রভাতফেরিতে দেখা হয় নবনীর সঙ্গে। কালো গভীর চোখ, লম্বা চুল। হাতে কতগুলো গ্লাডিওলাস। শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে ওরা সারি বেঁধে নেমে আসে। দুবার চোখে চোখ পড়ে রায়হানের।
নবনীর কালো চোখে তাকিয়ে যে অনুভূতি হয়, তা নিয়েই কবিতা লেখে রায়হান। কবিতাটি শহরে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় ছাপা হয়। ছাপার অক্ষরে প্রথম নিজের নাম দেখতে পায় কবি রুদ্র রায়হান। তার লেখা কবিতা দেখেছিল নবনীও।
তার চোখ নিয়ে এত সুন্দর কবিতা হতে পারে! খুবই অবাক হলো নবনী। রায়হানের কাছে এসে তাকে ভালোবাসার কথা জানায়। ধীরে ধীরে ওরা দুজন কাছে আসে।
প্রায় প্রতিদিনই কলেজ ফাঁকি দিয়ে ওরা গিয়ে বসত রংচটা একটি দেয়ালের পাশে। দেয়ালের গায়ে নানা রকম রাজনৈতিক স্লোগান লেখা থাকত। আর লাভ চিহ্নের মধ্যে থাকত দুই অক্ষরের বিশেষ সংকেত। কোনো কোনো দিন নবনী না এলে খুব মন খারাপ হতো রায়হানের। তখন খুব কবিতা লিখতে ইচ্ছে হতো।
ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর বাসা থেকে কম বের হতো নবনী। তখন রাতে নবনীর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত রায়হান। নবনীর কণ্ঠ শুনলেও খুব ভালো লাগত। তারপর নবনী কোনো ছুতোয় জানালা খুলে দিলে একনজর দেখেই চলে আসত।
ইন্টারমিডিয়েট শেষ। ঢাকায় ভর্তি হলো কবি রুদ্র রায়হান। ঘুম নেই, খাওয়া নেই—দিনরাত কবিতা আর কবিতা। নবনীকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারে না। কবিতা নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় দৌড়ঝাঁপ। সাহিত্য সম্পাদকেরা পাত্তা দেয় না। এদিকে মনটাও খুব খারাপ। ইউনিভার্সিটিতে মেয়েবন্ধুরা কাছে আসতে চায়। কিন্তু কবি নবনীকে ভুলতে পারে না।
হঠাৎ একদিন জানতে পারে নবনীর বিয়ে হয়ে গেছে। কথাটা প্রথমে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সেদিন যেন কষ্টের রং দেখতে পায় কবি—কালো মেঘের মতো।
মানুষের স্বভাব হচ্ছে—অমূল্য কোনো কিছু হাতের নাগালে পেয়ে গেলেই সেটাকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করে।
বন্ধুরা বলল, পত্রিকায় যেতে হবে না। একটি বই বের করলেই তুই ফেমাস হবি। তোর কবিতা এখন বিশ্বমানের। বই প্রকাশিত হলো। প্রেমের কবিতা নতুনদের মাঝে খুবই জনপ্রিয় হলো। তাতে কবির নাম হলো ঠিকই, টাকাপয়সা কিছু পেল না। প্রকাশক বলে, দূর মিয়া, কবিতার বই কেউ কিনে পড়তে চায় না।
লোকাল বাসে শাহবাগ নেমে হেঁটে মেলার দিকে হাঁটতে থাকে কবি রুদ্র রায়হান। ভিড় ঠেলেঠুলে দু-চারজন এসে তার সঙ্গে সেলফি তুলতে চায়। অনেক মেয়ে হাতে ফুল নিয়ে হাসিমুখে বলে, ‘রুদ্র ভাইয়া, একটি সেলফি হবে? প্লিইইজ।’
তখন নিজেকে দামি কবি মনে হয় রুদ্রর। স্টলে গিয়ে দাঁড়ালেও সেলফি তোলার ভিড় জমে। কিন্তু বই কেনে খুবই কম। চার-পাঁচজন মিলে একটি বই কিনে সেলফি তোলে। কেউ কেউ আবার বই না কিনেই সেলফি তুলে চলে যায়।
রাতে মেলা শেষে মনমরা হয়ে মেসে ফিরে আসে কবি। প্রকাশের ২০০ কপি বই কেনার টাকা কোথায় পাবে। হঠাৎ মনে হয়, মেসের বাজার করা হয়নি। পকেটে একটি টাকাও নেই। সেদিন বুয়া বলেছিল, ‘কবিতা কি পাকাই খাওয়া যায় না!’
ঢাকা