তখনো গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। রাত পোহালেই ঈদুল ফিতর। তাই জ্যোৎস্নার আশা করা বৃথা, কারণ ততক্ষণে ঈদের এক চিলতে চাঁদও ডুবে গেছে। নতুন বউ হিসেবে শ্বশুরবড়িতে সেটাই ছিল আমার প্রথম ঈদ।
আমাদের দেশে ঈদের দিনে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের রান্নার প্রচলন আছে। তেমনি আমার শ্বশুরবাড়ির অঞ্চলে ঈদের দিনে সেমাই আর পায়েসের সঙ্গে পাকান পিঠা খাওয়ার প্রচলন ছিল। তাই অনেক বাড়িতে রাতেই তৈরি করে রাখা হতো সেই মজাদার পাকান পিঠা।
বাড়ির বউ হয়ে গেলেও ছেলেমানুষি বুদ্ধি তখনো মাথা থেকে যায়নি, আর আমি তো তখন ছেলেমানুষই ছিলাম, বয়স ছিল পনেরো। গ্রামের লোক অনেক কুসংস্কারে বিশ্বাস করে, সে রকমই একটি বিশ্বাস হচ্ছে, রাতে তেলে ভাজা পিঠা বানালে বা খেলে ভূতের আছর হয়। আমার শ্বশুরবাড়ির পাশের বাড়িতে সন্ধ্যার পরপরই পিঠা বানানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। নতুন বউ, তাই সংসারের দায়িত্ব তখনো কাঁধে পড়েনি। আর আমার কর্তাও ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসেননি, তাই আমার দায়দায়িত্ব আরও কম ছিল।
সন্ধ্যার পরপরই একটা দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় ভর করে বসল। নতুন বউ তাই কাচের চুড়ির কমতি ছিল না। অনেকগুলো কাচের চুড়ি হাতে পড়ে নিলাম। চলে গেলাম পাশের বাড়ির পাটকাঠির তৈরি রান্না ঘরের ছোট্ট জানালাটার পাশে। বাড়ির গিন্নি তখন সবেমাত্র আট-নয়টা পাকান ভেজে তুলেছে, চারপাশটা ভাজা পিঠার মিষ্টি সুবাসে ম–ম করছে। আর ঠিক তখনই আমি সেই ছোট জানালাটার সামনে আমার কাচের চুড়ি ভর্তি হাতটা বড়িয়ে দিয়ে প্রথমে আস্তে করে বললাম, ‘এঁই এঁকঁটাঁ পিঁঠা দেঁ’। মহিলা শুনতে পায়নি। একটু পরে আর একটু জোরে আবার বললাম, ‘এঁই এঁকঁটাঁ পিঁঠা দেঁ’। আর ওই গৃহিণী এক চিৎকার দিয়ে পিঠার সরঞ্জাম সব ফেলে রেখে দৌড় দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। আমিও হতভম্ব হয়ে এক দৌড়ে বাড়ি চলে এলাম।
পরে জানলাম, ওই মহিলা উঠানে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েছেন। পরের দিনও মহিলা খুব অসুস্থ ছিলেন। পরে খুব খারাপ লেগেছে কিন্তু মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে পারিনি। ঘটনা যে এত বড় হয়ে যাবে, তা আগে বুঝতে পারিনি। তবে এটা ভেবে অবাক লেগেছে যে মানুষ এত ভিতু হয়! আর সেই সময়ে মজা যে পাইনি তা কিন্তু নয়! আর এভাবেই শ্বশুরবাড়িতে আমার প্রথম ঈদের দিনটি ভয় এবং অস্থিরতায় কেটে গেল আর স্মরণীয় হয়ে থাকল।