কালের সাক্ষী টেবিল

প্রচ্ছদ: আরাফাত করিম
প্রচ্ছদ: আরাফাত করিম

খুট করে শব্দ করে দরজাটা খুলতেই রোদ এসে জাপটে ধরল আমার সামনের দুটি পা-কে। আমি নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। ঈদের ছুটি শেষ। তারা ফিরে এসেছেন। তারা মানে এই অফিসের কর্মকর্তারা। ১০টার কাঁটা ১১টার দিকে ঝুঁকতে শুরু করলে তারা হেলতে-দুলতে অফিসে ঢুকবেন। ঢুকেই আমার বুকের ওপর ঘামওয়ালা হাত ফেলে বসতে বসতে আমার বুক ঠুকে বলবেন, ‘চা দে, রফিক্যা।’ আর রফিকও অমনি ছুটতে ছুটতে আসবে চা নিয়ে। সুড়ুত সুড়ুত শব্দ করে চা পান করতে আমার বাঁ পাশে রাখা ফাইলের স্তূপ দেখবেন তারা। এরপর ডান পাশেরগুলো দেখে চা খাওয়া শেষ করবেন।

বললে বিশ্বাস করবেন না, টেবিলের ওপর তাদের এইটুকুই মাত্র কাজ। এরপর থেকে শুরু হয়ে যায় টেবিলের নিচের কাজকারবার! আহারে, কত মানুষ আসে ফাইল পাস করাতে...তাদের মুখ টেবিলের ওপর থাকে ঠিকই, কিন্তু মনটা উসখুস করে টেবিলের নিচের দিকটার অবস্থার জন্য। কত আসছে টেবিলের নিচ দিয়ে...কয়টা নোট? একটা...দুইটা...তিনটা...

আমার কিন্তু এসব দেখতে এখন মজাই লাগে। প্রথম প্রথম রেগে যেতাম, বুঝলেন! কিন্তু আমার পাশেই যে নিমবাবু আছেন, তিনিও তো প্রায় আমার সমবয়সী, তিনি বলেন, ‘মন খারাপ কইরেন না গো, মেহগনি সাহেব! যস্মিন দেশে যদাচার! আপনার-আমার কী, বলেন?’ আমি কাষ্ঠহাসি হাসতে থাকি। তা তো ঠিকই! কিন্তু জানেন তো, এমন অবস্থা আগে ছিল না। আগে মানে, অনেক আগে...ওই যে ব্রিটিশ আমলে। আহা, তখনই তো আমার জন্ম। কী যত্ন করে মিস্ত্রি বানিয়েছিলেন আমাকে...কাঠ চিরে মসৃণ করে, ঠিকঠাক মাপজোক দিয়ে, পেরেক ঠুকে, বার্নিশ করে...একেবারে ফিটফাট! সাহেব দেখে নেড়েচেড়ে বলেছিলেন, ‘ভেরি গুড!’

তখন ছিল ভেরি গুডের সময়। অফিস হতো একেবারে কাঁটা ধরে। কেউ এদিক-ওদিক করত না। আর ঘুষ? ছি ছি ছি! ঘুষকে ভাবা হতো মহাপাপ! তো এ রকম একটা পাপ একজন না একদিন করেই বসল। কী একটা জমির কাগজ ঠিক করে দিয়েছিল বলে এক গৃহস্থ তার পুকুরের রুই মাছ এনে দিয়েছিল এক অফিসারকে। অফিসার সেটা নিয়েও ছিল! ইশ্, তারপরের দিন তার চাকরি যায় যায় অবস্থা! সাহেব বললেন, ‘তুমি চাকরি করো, বেতন পাও। এর বাইরে তুমি যা নিয়েছ, তার হিসাব কোথায় দেবে?’

অফিসারটা সেদিন কেঁদে পর্যন্ত দিয়েছিল!

তারপর বটের কত ঝুরি নেমে এল এই বঙ্গে। দেশ স্বাধীন হলো...আর মানুষগুলো ধীরে ধীরে কেমন যেন বদলে গেল!

নিমবাবু অবশ্য আফসোস করতে নিষেধ করে। বলে, ‘আর কয়দিনই বা আমরা? এখনো যে এ অফিসে আমাদের রেখেছে, লাকড়ি করে চুলায় দেয়নি, সেই তো ঢের! কত বাহারি টেবিল এখন এসেছে, দেখছ না?’

আমি বাহারি টেবিলগুলো দেখেছি। কী চেকনাই আর জেল্লা তাদের! কিন্তু মানুষগুলোর জেল্লা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। কেমন যেন লটরপটর স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। কেউ এসে কিছু একটা বললেই অফিসারদের চোখ চলে যায় আমার তলায়। আর মানুষগুলোও এখন তৈরি থাকে। একটা নোট ফস করে বের করে দেয়। অফিসার বলে, ‘এটা কী দিলেন? ৫০০ টাকা মাত্র? ৫০০ টাকায় আজকাল কী হয়?’

: হয় স্যার, দেখেন না, স্যার...

: না না! এত কমে দেওয়া সম্ভব না!

আমার না হাসিও চলে আসে। মনে হয়, ওরা ওদের বাবার সম্পত্তি দান করছে। হাসতে গিয়ে ভাবি, মানুষগুলো বোধ হয় বাড়ি গিয়ে কাউকে মুখ দেখাতে পারে না। নিমবাবু বলে, ‘ধুররো! কী যে ভাবো তুমি এই সব! বাড়ি গিয়ে মুখ দেখাতে পারবে না মানে! ওই টাকা দিয়েই তো বাড়িতে বাড়তি মাংস কিংবা বউয়ের শাড়ি কি বাচ্চার খেলনা কেনে।’

: ওরা কিছু বলে না?

: কী বলবে? ঘুষ তো এখন সাধারণ জিনিস। সবাই খায়।

কী জানি! আমার কেমন মায়াও লাগে ওদের সবার জন্য। ওরা বোধ হয় আর বুঝতে পারে না যে এই ঘুষ জিনিসটা ওদের প্রাপ্য না। আর যারা দিচ্ছে, তারাও বুঝতে পারছে না এটা ওদের দেওয়া উচিত না। এসব এখন খুবই সাধারণ এক ব্যাপার। প্রতিদিন ভাত যেমন খেতে হয়, ঘুষও তেমন। আর তাই আমার তলাটা সব সময়ই ব্যস্ত থাকে।

কিন্তু মাঝেমধ্যে কাঁদতে ইচ্ছা করে। একদিন এক বৃদ্ধা এসেছিলেন তার স্বামীর পেনশনের টাকার জন্য। বৃদ্ধার কাছে কোনো নোট ছিল না তো...বৃদ্ধা শুধু কাঁদতে পারছিলেন! আর অফিসারটা তবু একটা হাত বাড়িয়ে রেখেছিল টেবিলের নিচ দিয়ে। আমি ভেবেছিলাম, হুড়মুড় করে এবার ভেঙে পড়ি। কিন্তু পারিনি। বৃদ্ধা চোখ মুছতে মুছতে চলে গিয়েছিলেন।

অফিসে নতুন টেবিল এসেছে। টেবিলের তলায় ফাঁকা জায়গা নেই। দেখে মনটা ভরে গেল। ভাবলাম, এবার বোধ হয় টেবিলের তলার এই দেওয়া-নেওয়া শেষ হবে। নিমবাবু হেসে বললেন, ‘তুমি বড় আশাবাদী, মেহগনি! বুঝতে পারছ না, এখন কেন টেবিলের তলায় ফাঁকা নেই?’

: কেন?

: এখন আর টেবিলের তলা দিয়ে ঘুষ নেওয়ার দরকার নেই মানুষের। ওটা তো সেকেলে ব্যাপার। এখন থেকে ঘুষ টেবিলের ওপর দিয়েই হবে, বুঝলে? ঘুষই তো, ও খাওয়া যায়, লুকানোর কিছু নেই, লজ্জার কিছু নেই।

হবে হয়তো। লজ্জাটজ্জা এখন খুবই সেকেলে ব্যাপার।