কেউ কি আপনার বিশ্বাস ভাঙলেন? বিশ্বাস ভেঙে আপনার কাছে দেওয়া কোনো অঙ্গীকার পালন না করে দিয়েছেন চম্পট। হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা? ভাবছেন, কীই-বা করার আছে? আছে কি আসলেই কিছু করার? আইনে বিশ্বাসভঙ্গকে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে। তবে এই বিশ্বাসভঙ্গ অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে গেলে কিছু উপাদান থাকতে হবে। আগেই স্পষ্ট করে রাখা ভালো, এই বিশ্বাসভঙ্গ বলতে কিন্তু কোনো মানবিক সম্পর্কের বিশ্বাসভঙ্গ বোঝায় না।
কিসে হবে বিশ্বাসভঙ্গ
বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধের প্রতিকার চাইতে হলে বিশ্বাসভঙ্গকারী ব্যক্তির সঙ্গে কোনো সম্পত্তি পরিচালনার দায়িত্বের সম্পর্ক থাকতে হবে। দুজন ব্যক্তির মধ্যে কোনো প্রকার ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো বিশ্বাস অর্পণের সম্পর্ক থাকতে হবে। ধরা যাক, সুমনের কাছ থেকে সোহেল (ছদ্মনাম) ব্যবসায়িক কাজে বিনিয়োগ করার জন্য কিছু টাকা নিলেন এবং তাঁদের মধ্যে চুক্তি হলো যে সোহেল এই টাকা কীভাবে কোন কাজে ব্যবহার করবেন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও সোহেল তা করেননি এবং সুমনের টাকাও ফেরত দেননি। তখন সোহেল বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধে দোষী হবেন। এই বিশ্বাসভঙ্গ দুজন ব্যক্তি ছাড়াও কোনো অফিসের কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মধ্যে হতে পারে। আবার কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহকের মাধ্যমেও হতে পারে।
কীভাবে নেবেন আইনের আশ্রয়
বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হলে প্রথমে যথাযথ প্রমাণ জোগাড় রাখতে হবে। বিশেষ করে দুজনের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিপত্র অবশ্যই লাগবে। যদি কোনো কারণে চুক্তিপত্র না থাকে, তা হলে লেনদেনসংক্রান্ত যেকোনো দলিল থাকতে হবে। তাই কোনো লেনদেন এবং দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি করে নেওয়া উচিত। এতে প্রতিকার পাওয়া সহজ হয়। বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারায় প্রতিকার চাইতে হয়। এই ধারার সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও আনা যায়। দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারায় বলা আছে, অপরাধজনিত বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে দোষী হলে দায়ী ব্যক্তিকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। যদি কোনো অফিসের কর্মচারী বিশ্বাসভঙ্গ করেন, তা হলে দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারা অনুযায়ী সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সরকারি কর্মচারী কিংবা ব্যাংকার, ব্যবসায়ী বা এজেন্টের এই অপরাধের সাজা যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড (ধারা ৪০৯)। আর বাহক দ্বারা বিশ্বাসভঙ্গ হলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড হবে (ধারা ৪০৭)।
বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ করতে হলে থানায় এজাহার হিসেবে কিংবা সরাসরি আদালতে গিয়েও মামলা করা যায়। সাধারণত এ ধরনের মামলা আদালতেই বেশি দায়ের করা হয়। কোনো এখতিয়ারাধীন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বা মেট্রোপলিটন এলাকা হলে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। আদালত বাদীর জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে মামলার গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে সরাসরি আমলে নিতে পারেন অথবা কোনো প্রাথমিক তদন্তের জন্য ব্যক্তি বা সংস্থাকে আদেশ দিতে পারেন। আবার সরাসরি এজাহার হিসেবে গ্রহণের জন্য থানাকেও নির্দেশ দিতে পারেন। এ ধরনের মামলায় কোনো প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিন না-ও হতে পারে। তবে অফিসের কর্মচারী বা সরকারি অফিসের কর্মচারী, ব্যবসায়ী বা এজেন্টের বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ দায়ের করবে দুর্নীতি দমন কমিশন।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট