গল্প: দহন
মাত্র মাস্টার্স শেষ করেছি। কোনো রকম উৎকণ্ঠা আমাকে গিলে খাবার আগেই ভালো একটা ওষুধ কোম্পানিতে আমার চাকরি জুটে গেল। কাজটা বিপণনের। আমাকে কাজ করতে হবে খাগড়াছড়িতে। এটা নিয়ে শুরু হলো বিরাট ঝক্কি। মা বেশ উৎকণ্ঠার সঙ্গে বললেন, ‘বলিস কী তুই, খাগড়াছড়ি যাবি! সেখানে না জানি কত উটকো ঝক্কি পোহাতে হয় । আমি তোকে যেতে দেব না। অমন চাকরি তুই হাজারটা পাবি।’ হাউমাউ কান্না জুড়ে দিলেন মা। তাঁকে অনেক বলে কয়ে রওনা হলাম খাগড়াছড়ি। বললাম, কোনো রকম সমস্যা হলেই চলে আসব।
দুই-তিন দিন হোটেলে থাকার পর নিউজিল্যান্ডপাড়ায় থাকার জন্য ছোট্ট একটি বাসা পেলাম। সেখানে বসত গড়ে নিতে সময় লাগল না। তা ছাড়া প্রকৃতির নিবিড় পরিশীলিত রূপ দেখেও একেবারে মুগ্ধ হয়েছিলাম। প্রকৃতির সেই রূপ দেখার জন্য গোটা দিন ধরেই ঘুরতে ইচ্ছে হতো। কিন্তু কাজের তো সীমা থাকে না। তবুও সময় পেলেই চলে যেতাম আলু টিলা, রিসাং ঝরনা, দেবতার পুকুর বিভিন্ন স্থানে। পাহাড়ের গায়ে অবিরাম সুবজের সখ্য। তার ফাঁকে ফাঁকে ঝরনা। আর উঁচু-নিচু পাহাড়ের ফাঁকে সমতল বীজতলা ও শস্যখেত।
প্রিয়াশ্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে পুরোপুরি নাগরিকজীবন ছিল আমার। পাহাড়ে এসেই নিগূঢ় কাব্যিক জীবন শুরু হতে সময় লাগেনি। পাহাড়ি প্রকৃতির ছন্দের ঘোরে আমি যেন জবুথবু হয়ে ডুবে রইলাম বহু দিন। নক্ষত্রের সঙ্গে নিগূঢ় সখ্য হলো আমার। রুষ্ট ভাবনাগুলো সব উবে গেল বুক থেকে। শহুরে ব্যস্ততা আর চঙেচঙে রুক্ষ বিলাসিব্যাসন থেকে তখন আমি অনেক দূরে।
ওর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা আলুটিলায়। পর্যটন মোটেলের ঠিক পাশেই ছিল ওর চায়ের স্টল। দারুণ চা বানাতে পারত প্রিয়াশ্রী চাকমা। থ্যাবড়া নাক হলেও মুখজুড়ে অদ্ভুত সৌন্দর্য লেগে থাকত। প্রশস্ত চোখ, সরল চিকুব।
ভালোবেসে আমি ওকে ডাকতাম প্রিয়া বলে। আর ও আমাকে ডাকত বাঁশি। কেন ডাকত, তা আজও জানা হয়নি আমার। বুকের ভিতর কেবলই নড়েচড়ে ওঠে। প্রিয়াশ্রীর অবয়ব আমাকে ডাকে, সেই চেঙ্গী নদী আর আলুটিলার প্রকাণ্ড বটগাছটিও।
একদিন সন্ধ্যার রং চোখেমুখে মেখে আমার হাত ধরে সংবেদনা ভরা কণ্ঠে প্রিয়াশ্রী বলেছিল, ‘আমাকে নিয়ে চল হাসান। সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে আমি তোমার সঙ্গে যাব। কোনো ঈশ্বরের জন্য নয়, শুধু তোমার জন্যই আমি ধর্ম ত্যাগ করব।’
সকল পার্থিবতার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলাম সেদিন। জগতের সব রং থিতিয়ে গিয়েছিল বুকের ভেতর। বিন্দুবিসর্গ কিছু না জেনেই আমার কাছে প্রিয়াশ্রীর এই নিবেদন ছিল মহাপবিত্র কোনো বাণীর মতো। বুকের ভেতরটা শক্ত করে নিয়েছিলাম। বাঁচতে হলে ওকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচব।
কিন্তু হয়নি কিছুই। আলুটিলার প্রকাণ্ড সেই বটতলায় দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলাম। অনভ্যস্ত অভিমানে ভেবেছিলাম, জগতের সব মানুষকে একই ধর্মে বাঁধলে কী এমন ক্ষতি হয় বিধাতার!
শূন্য বুকের ভেতর এঁকে রেখেছিলাম আমারই প্রেমের প্রচ্ছদ। সামনে দেখি, বীভৎস সমাজ। শেষের দিনগুলো ছিল ভয়ানক অনুশোচনার। প্রিয়াশ্রী বুঝে নিয়েছিল আমাদের সামাজিক সমস্যা। তবুও দেখা হতো আমাদের। মনের অজান্তেই দুজন ছুটে যেতাম। একটি কথাও বলত না প্রিয়া। আমার পাশেই হাঁটু মুড়ে বসে থেকে শুধু কাঁদত। কান্নাও যে এতটা করুণ হয়, তা-ও জেনেছিলাম প্রিয়াশ্রীর কাছ থেকেই। শেষে ওর কান্না আর সহ্য হলো না। কাউকে কিছু না বলেই সব ছেড়েছুড়ে একদিন চলে এলাম আবার সেই ঢাকায়।
কিন্তু এখনো জানতে ইচ্ছে করে, পোষা বিড়ালটা এখনো কি ওভাবেই বসে থাকে প্রিয়াশ্রীর পাশে। তার চায়ের স্টলটা কি এখনো তেমনই আছে। রং করা বাঁশের বেঞ্চ আর ফ্যাকাশে দুটি চেয়ার। প্রিয়াশ্রী তুমি এখন কোথায় আছ, কেমন আছ? কতটা কেঁদেছিলে তুমি আমার জন্য। কাজল ধুয়ে কি এখন ফ্যাকাশে তোমার চোখ। এই জীবনে হয়তো আর জানা হবে না কিছুই। তবুও তোমাকে ভুলিনি এতটুকু। জানি, পাহাড়ি মেয়েরা একবার যাকে মন দেয়, তাকে পিঠ দেখাতে জানে না কখনোই।
কাজী সাইফুল ইসলাম
রিয়াদ, সৌদি আরব