চিকিৎসক নূরুল বসে থাকেননি

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তরুণ চিকিৎসক নূরুল ইসলাম। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কোনাগাঁও। আকস্মিক বন্যায় তাঁদের গ্রামের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সঙ্গী-শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন নূরুল ইসলাম। ছুটে গেছেন প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলে। সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষকে পৌঁছে দিয়েছেন ত্রাণসামগ্রী। নূরুল ইসলামের ত্রাণতৎপরতার খবর শোনালেন খলিল রহমান

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ব্যক্তিগত চেম্বার আছে নূরুল ইসলামের। সেখানে নিয়মিত রোগী দেখেন তিনি। ১৬ জুন বিকেলেও সে পথ ধরেছিলেন। ব্যক্তিগত গাড়িতে সিলেট শহর থেকে যখন সুনামগঞ্জ জেলার সীমানায় প্রবেশ করেছেন, তখনই শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। ঝুম বৃষ্টিতে গাড়ি চালানোই দায় হয়ে উঠল। আরেকটু সামনে জাউয়াবাজার এলাকায় পৌঁছে দেখেন, সড়কে পানি উঠেছে। মহাসড়কে পানি দেখেই মনটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তবে কি পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ছে?

চালককে গাড়ি ঘুরিয়ে সিলেটে ফিরে যেতে বলেন। ফেরার পথে বৃষ্টি আরও বাড়ে। বিরামহীন বৃষ্টি। ধীরে ধীরে চালাতে থাকেন চালক। শহরে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। গাড়িতে বসেই সুনামগঞ্জ থেকে পরিচিত অনেকের ফোন পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা জানিয়ে অনেকের পোস্ট দেখেন। নিজের গ্রামের খোঁজ নেন নূরুল। জানলেন, পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। পরিচিত অনেকেই আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। কেউ আছেন না খেয়ে।

নূরুল ইসলাম ছুটে গেছেন প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলে
ছবি: সংগৃহীত

অসহায় মানুষের মুখ

এলাকার খবর জেনে নূরুল ইসলামের মনটা ভার হয়ে যায়। কিছুই ভালো লাগে না। হাওরের ছোট ছোট গ্রাম, গ্রামের অসহায় মানুষের মুখগুলো তাঁর মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। এই মানুষগুলো পানিবন্দী হয়ে কী করছে, কীভাবে আছে, আশ্রয় নিচ্ছে কোথায়, থইথই পানির মধ্যে খাবার পাবে কীভাবে—এসব তাঁকে বিচলিত করে। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, কিছু একটা করতেই হবে। ফেসবুক মেসেঞ্জারে এলাকার সামাজিক সংগঠন নারায়ণতলা মিশন উচ্চবিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও উত্তর সুরমা চাকরিজীবী পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর ভাবনার কথা জানান। এরপরই আলাপ করেন সহকর্মী চিকিৎসকদের নিয়ে খোলা ‘মিড লেভেল ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন’ নামে ফেসবুকে গ্রুপে। এই গ্রুপে যুক্ত আছেন দেশের সাড়ে চার শ চিকিৎসক। নূরুল ইসলাম তিনটি গ্রুপেই সুনামগঞ্জবাসীর বিপদের কথা জানাতে থাকেন।

পানিবন্দী মানুষদের হাতে ত্রাণ তুলে দিচ্ছেন নূরুল
ছবি: সংগৃহীত

উদ্যোগের শুরু

নূরুল ইসলামের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা গ্রুপ তিনটিকেও স্পর্শ করে। দ্রুত উদ্যোগী হয় তারা। সিদ্ধান্ত হয় তাঁর প্রকৌশলী বন্ধু সৈয়দ আবদুল মতিনের বিকাশ নম্বরে অনুদান সংগ্রহ হবে। বিপুল সাড়া পড়ে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ফরহাদ উদ্দিন হাসান চৌধুরী ১৮ জুন দুপুরে ফেসবুকে পেজে নূরুলের স্ট্যাটাস শেয়ার করেন। সেটিতেও বিপুল সাড়া পাওয়া যায়। প্রায় ১২ লাখ টাকা সংগ্রহ হয় ফরহাদ উদ্দিনের কাছে। সে অর্থে তাঁর তত্ত্বাবধানেই ঢাকায় ত্রাণসামগ্রী কেনা হয়।

নূরুল ইসলামের কাছেও অনুদানের অর্থ জমা হয়। কিন্তু সুনামগঞ্জ ততক্ষণে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। সিলেট শহরেও দেখা দিয়েছে বন্যা। তাহলে কীভাবে উদ্যোগের বাস্তবায়ন হবে, সহায়তা পৌঁছানো হবে?

পানিবন্দী দুদিন কাটান নূরুল ইসলাম। নিজের কাছে থাকা অর্থ নিয়ে রোববার সকালে সিলেট শহরে বের হন। এ দোকান ও দোকান থেকে কিনতে থাকেন ত্রাণসামগ্রী। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে তাঁদের মেসেঞ্জার গ্রুপের সদস্যরাও প্রস্তুতি নিতে থাকেন। সারা দিন কেনাকাটার পর রাতভর ২০ জন তরুণকে নিয়ে সেগুলো প্যাকেট করেন তিনি।

ত্রাণ প্রস্তুত। কিন্তু বিতরণ করবেন কী করে? সুনামগঞ্জের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ যে তখনো বিচ্ছিন্ন। নৌপথেও যাওয়া কঠিন। নিজেকে তখন বড় অসহায় মনে হয় নূরুলের। বলেন, ‘কখন সড়কে গাড়ির চাকা ঘুরবে, এই আশায় অপেক্ষা করতে থাকি।’

স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিজেই ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলে
ছবি: সংগৃহীত

সোমবার সকাল নাগাদ সড়ক জেগে ওঠে। ট্রাকে করে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জে পাঠানো হয় প্রথম দফা ত্রাণসামগ্রী। শহর থেকে ২০ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী এসব ত্রাণ নৌকায় নিয়ে ছুটে যান গ্রামে গ্রামে। পৌঁছে দেন বন্যার্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে। রাতেই ঢাকা থেকে যায় দুই ট্রাকভর্তি ত্রাণ। নূরুল মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগেই শহর থেকে পাঁচটি বড় নৌকায় ত্রাণ তুলে নেন। তারপর ছুটে যান দুর্গম গ্রামে। দিনভর সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর, সুরমা, রঙ্গারচর, কুরবানগর ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে মানুষের হাতে ত্রাণ তুলে দেন।

নূরুল ইসলাম জানালেন, শুধু সুনামগঞ্জ সদরেই নয়, তাঁদের কর্মীরা জেলার বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলাতেও ত্রাণ বিতরণ করেছেন। চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ, লবণ, চিড়া, মসলা, স্যানিটারি ন্যাপকিন, কাপড়চোপড়, খাবার স্যালাইন, সাবান, ওষুধ, শিশুখাদ্য সব মিলিয়ে প্রতিটি প্যাকেটে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার পণ্য ছিল। স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে বুধবার রাতে সিলেট থেকে পাঠানো রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন নূরুল ইসলাম।

সদর উপজেলার কানলার হাওরপাড়ের কিছু মানুষ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে সামান্য চিড়া–মুড়ি পেয়েছিলেন। এর বাইরে তেমন আর কিছুই পৌঁছায়নি। বহু মানুষ তখনো পানিবন্দী, আশ্রয়কেন্দ্রে। নূরুল ইসলামেরাই প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে ওই এলাকার আশ্রয়কেন্দ্র ও মানুষের হাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেন। হাওরপাড়ের সমেদনগর গ্রামের আফিয়া খাতুন (৫৩) বলেন, ‘তিন দিন ঘরের ভিতর খাটের ওপর সবাইরে নিয়া আছলাম। দুই দিন আছলাম না খাইয়া। পরে তারার (নূরুলদের) পানি পাইয়া জানটা বাঁচছে।’

বনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবুল কাশেম জানান, এলাকায় চিকিৎসক নূরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল তরুণ-যুবক সব সময় সামাজিক ও শিক্ষামূলক কাজ করেন। মানুষের বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এবারের দুর্যোগেও তাঁরা একইভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের উদ্যোগে এলাকার মানুষ এই চরম দুর্দিনে উপকৃত হয়েছে।

পুনর্বাসনের পরিকল্পনা

ত্রাণসামগ্রী বিতরণের পাশাপাশি নূরুল ইসলামরা এখন ভাবছেন পুনর্বাসন নিয়ে। মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আসবাব ভেসে গেছে। বইপত্র নষ্ট হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে শিক্ষার্থী। নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গ্রামের অতি সাধারণ পরিবারের ছেলে। বারবার মনে হচ্ছিল, একটা কিছু করতেই হবে। আমি বা আমরা যা করছি, সেটা চেষ্টা মাত্র। অনেকেই আরও অনেক বেশি করছেন। এখন আমরা পুনর্বাসনের কাজ করব। কাজটি করব প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে। সে জন্য পরিকল্পনা চলছে।’