জিম্মি

হিজলিজগাছের নিচে বসে আছে মুহিত। পায়ের নিচে তপ্ত বালু, মাথার ওপর গনগনে আকাশ। চতুর্দিকে খাঁ খাঁ মরু। যত দূর চোখ যায়, লোকালয়ের কোনো আভাস নেই। জংধরা একটি পুরোনো হাতকড়া ওকে পিছমোড়া করে আটকে রেখেছে হিজলিজগাছের সঙ্গে। সূর্য ডোবে, সন্ধ্যা হয়, রাত নামে, আবারও ভোরের আলো ফোটে। ৩১ দিন কেটে গেছে।আজ ৩২ দিন। আবারও ধূসর মরু ফুড়ে সূর্য উঠছে, অন্তহীন অপেক্ষার আরও একটি দিন। এ যাবৎ ছয়বার জায়গা বদল করেছে কিডন্যাপাররা। সারা দিনে একবার খেতে দেয়, সেদ্ধ করা উটের মাংস আর দুটি খবুজ, সারা দিনে এক বোতল পানি। ঘুম এলে কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো বালুর ওপর বসে ঘুমায়। হাতকড়ার শেকল গাছের ছালের সঙ্গে ঘষে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে মুহিত। আর তখনি সচকিত হয় আবদাল্লাহ, ওর প্রহরী। নিকষ কালো গোলগাল মুখের ওপর লাল টকটকে দুটি চোখ ধ্বক করে জ্বলে ওঠে। প্রথম কদিন আবদাল্লাহর মুখে কুলুপ আঁটা ছিল। এরপর কথা বলতে শুরু করে। ওরা কেউ কারও কথা বোঝে না। তবু কথা বলে। সন্ধ্যার প্রান্ত ছুঁয়ে মরুভূমিতে ধুলা উড়িয়ে দুটি নিশান পেট্রোল আসে। প্রথম প্রথম ওরা এলে ভয় পেত। এখন ভয় পায় না, বরং ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে ওরা মুহিতের গায়ে হাত তোলে। ‘এখনো তোর জাতিসংঘ টাকা দিচ্ছে না কেন?’ খুব রেগে যায়। আজ একজন নতুন লোক আসে। ওর নাম আবু ওবেদা। আবু ওবেদা নিরস্ত্র, অন্য ছয়জনের হাতে একে-৪৭। আবু ওবেদা মুহিতের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে, পানি নিয়ে এসেছে। মুহিতের হাতকড়া খোলা হয়। ও হুমড়ি খেয়ে পড়ে খাবার ও পানির ওপর। মুহিত বুঝতে পারে, আবু ওবেদাকে জাতিসংঘ নিয়োগ করেছে, নেগোশিয়েটর। ওরা কথা বলছে। হঠাৎ দলনেতা উমার ক্ষেপে যায়। ক্ষেপে গিয়ে মুহিতের হাত থেকে বোতল কেড়ে নেয়, লাথি দিয়ে বালুর ওপর ছড়িয়ে দেয় খাবারের প্যাকেট। মুহিত ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো ছুটে গিয়ে ছোট ছোট মাংসের টুকরো বালুর ওপর থেকে তুলে খেতে শুরু করে, হাড়গুলো চুষতে শুরু করে। সর্দারকে খুশি করার জন্য হোক, আর দায়িত্ব পালনের জন্য হোক, আবদাল্লাহ ছুটে গিয়ে মুহিতকে কয়েকটি লাথি মারে। মুহিতের ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, অবসন্ন দেহটি বালুর ওপর লুটিয়ে পড়ে। ওরা চলে গেলে আবদাল্লাহ মুহিতকে আর হাতকড়া পরায় না। মুহিতের গায়ে এমন কোনো জোর নেই যে সে আবদাল্লাহকে কুপোকাত করে পালিয়ে যাবে। এটা আবদাল্লাহ বেশ বুঝে গেছে। রাত গভীর হয়। মুহিতের নিস্তেজ শরীর নেতিয়ে পড়ে। হঠাৎ ও জেগে ওঠে। আবদাল্লাহ চিৎকার করে কাঁদছে। ‘কী হয়েছে, আবদাল্লাহ?’ আবদাল্লাহ কোনো কথা বলে না। এগিয়ে এসে ওর হাতকড়া খুলে দেয়। ‘চলে যাও। পালিয়ে যাও।’ মুহিত যেন হঠাৎ করে তার ক্ষয়ে যাওয়া শক্তি ফিরে পায়। সে মরুভূমির বুক চিরে, রাতের অন্ধকার ফুড়ে দৌড়াতে থাকে। কোন দিকে লোকালয়, কোন দিকে মুক্তি, সে কিছুই জানে না। শুধু জানে, ওকে পালাতে হবে।ছুটতে ছুটতে মুহিত ক্লান্ত হয়ে যায়। হাঁপাতে থাকে। পা আর নড়তে চাইছে না। সামনে একটি গাছ দেখে এগিয়ে যায়। বিশ্রামের জন্য গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে বসে পড়ে। ওমা, এ-তো সেই হিজলিজগাছ, ওই তো আবদাল্লাহ, ওর সামনেই মরুর বালুতে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। মরীচিকা!কাজী জহিরুল ইসলামআল ফেশার, সুদান