তারকাদের গোল উদ্যাপন

বিশ্বকাপের মঞ্চে সবকিছুই দর্শনীয়। প্রতিটি দলের খেলা, গোল তো বটেই, গোল করার পর খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপনও ফুটবলপ্রেমীরা উপভোগ করেন প্রাণ খুলেই।বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেক উদ্‌যাপনই আছে, যেগুলো উপভোগে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে উদ্‌যাপনের সেই মুহূর্তগুলো জায়গা করে আছে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। মুখরোচক গল্প হয়ে ঘুরে ফিরছে প্রজন্মান্তরে। 

প্রতিটি বিশ্বকাপই জন্ম দেয় এমন কিছু উদ্‌যাপনের। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ এমন অনেক উদ্‌যাপন চলছে এখনো। তারকা ফুটবলারদের নিজস্ব কিছু স্টাইল আছে গোল উদ্‌যাপনের। বিশ্বকাপ ফুটবলের সে রকম কিছু উদ্‌যাপন-মুহূর্তের কথা থাকছে এই প্রতিবেদনে।

রজার মিলা
বিপক্ষ কলম্বিয়া, ১৯৯০
‘অদম্য সিংহ’ পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিল সেবার আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন। ইতালি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ওমাম বিয়িকের গোলে ‘চ্যাম্পিয়ন’ আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শুভ সূচনা করা ক্যামেরুন গ্রুপ পর্বে রোমানিয়ার বিপক্ষে আরেকটি জয় তুলে নিয়ে চলে যায় নক আউট পর্বে। সে পর্বেই কলম্বিয়ার মুখোমুখি হয় তারা। রজার মিলার দুই গোলে সে ম্যাচে কলম্বিয়াকে ২-১ গোল হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় ক্যামেরুন। দুটি গোল করেই কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে ছুটে গিয়ে কোমর দুলিয়ে যা নাচটা দিয়েছিলেন, সেটি কোনো দিন ভুলতে পারবেন না ফুটবলপ্রেমীরা।

বেবেতো
বিপক্ষ হল্যান্ড, ১৯৯৪
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচ ছিল সেটি। ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হল্যান্ড, মোটেও সহজ নয়। সে ম্যাচের ঠিক আগে ব্রাজিলীয় তারকা বেবেতোর স্ত্রী জন্ম দিলেন এক ছেলের। সুখবরটা পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। হল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সেটি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু সন্তানকে উৎসর্গ করতে। কিন্তু সেটি যে এমন হবে, তা কি আর ভেবেছিল কেউ। বল জালে ঠেলে দৌড়াতে দৌড়াতে দুই হাত দোলাতে লাগলেন, ঠিক যেমনটি করে মা তাঁর কোলের শিশুকে দোল খাওয়ায়, ঠিক সেভাবেই। তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন সতীর্থ রোমারিও ও মাজিনহো। উদ্‌যাপনের ইতিহাসে ‘আইকন’ হয়েই আছে এটি।

ডিয়েগো ম্যারাডোনা
বিপক্ষ গ্রিস, ১৯৯৪
১৯৯৪ বিশ্বকাপের শুরুটা দুর্দান্ত করেছিল আর্জেন্টিনা। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই গ্রিসকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল। হ্যাটট্রিক করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। সে ম্যাচেই প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ে দুর্দান্ত এক গোল করেছিলেন অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা। গোলটি করেই কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে ছুটে গিয়ে এক কাণ্ড করেন ফুটবল কিংবদন্তি। সেখানে থাকা এক টেলিভিশন ক্যামেরার লেন্সের খুব কাছে মুখ নিয়ে বিকট মুখভঙ্গি করে সবাইকে চমকে দেন। যদিও পরের ম্যাচের পরপরই নিষিদ্ধ ড্রাগ এফিড্রিন সেবনের জন্য বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। গ্রিসের বিপক্ষে সেটাই ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলেই ম্যারাডোনার শেষ গোলের উদ্‌যাপন।

ব্রায়ান লাউড্রপ
বিপক্ষ ব্রাজিল, ১৯৯৮
ডেনমার্কের ব্রায়ান লাউড্রপের সেই উদ্‌যাপনটি চমকে দিয়েছিল সবাইকে। সবাই তো হেসেই খুন। এমন উদ্‌যাপনও হয় নাকি। ফ্রান্স বিশ্বকাপে ব্রাজিল ছিল শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। তাদের বিপক্ষেই গোল করে ডেনিস তারকা হঠাৎ শুয়ে পড়লেন মাঠে। এমন ভঙ্গিতে শুয়ে পড়লেন যেন সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটাচ্ছেন। কাঁধে ভর করে ভাবখানা এমন দেখালেন যেন ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করা আবার কোনো ব্যাপার নাকি!

লিওনেল মেসি
বিপক্ষ বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, ২০১৪
২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে প্রায় একক প্রচেষ্টায় বসনিয়ার বক্সে ঢুকে একটি গোল করেছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি। এটি বিশ্বকাপে মেসির প্রথম গোল না হলেও এর গুরুত্ব ছিল অন্য রকমই। তত দিনে আর্জেন্টিনার জার্সি পরে কিছু না পাওয়ার ব্যাপারটি চাপ হয়ে দেখা দিয়েছে তাঁর জন্য। সেদিন বসনিয়ার বিপক্ষে সেই গোল করার পর মেসি নিজের জার্সিটাকে এমনভাবে নাড়িয়েছিলেন, তাতে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, দেশের জার্সিটা তাঁর কাছে কতটা আবেগের!


রোনালদো
বিপক্ষ স্পেন, ২০১৮
গোল উদ্‌যাপনের নবতম সংস্করণ। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ‘গোট (Goat) উদ্‌যাপন। স্পেনের বিপক্ষে এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করলেন রোনালদো। দুর্দান্ত এক ফ্রি–কিকে হ্যাটট্রিক করে দলকে বাঁচালেন হারের হাত থেকে। দ্বিতীয় গোলটি করেই অদ্ভুত উদ্‌যাপনে মেতেছিলেন। থুতনির কাছে ডান হাতটি নিয়ে দাঁড়িতে হাত বোলানোর একটা ভঙ্গি করলেন। অনেকেই বলছেন, বিশ্বকাপ শুরুর আগে লিওনেল মেসি ছাগলের বাচ্চা কোলে নিয়ে মজার একটা ছবি তুলেছিলেন। ছবির নিচে ক্যাপশন ছিল—গোট, গ্রেটেস্ট অব অল টাইম। রোনালদো কি গোল উদ্‌যাপনে মেসিকে ব্যঙ্গ করলেন!