থাকি কাছাকাছি

একান্নবর্তী পরিবারের সেই সুখময় স্মৃতি এখনো আমরা হাতড়ে ফিরি। আমাদের বাড়িতে আমরা ২৪ জন ভাইবোন ছিলাম। তাতে দুটি ফুটবল দল হয়ে যেত। এখন এমন কথা কাউকে বুক ফুলিয়ে বলতে শুনি না। বর্তমান সমাজে প্রতি পরিবারের সদস্যসংখ্যা তিন-চারজনে নেমে এসেছে। আগে প্রতিটি পরিবারে কমপক্ষে সাত-আটজন সদস্য থাকত। আর সঙ্গে থাকত গোষ্ঠীভুক্ত পরিবার। সব মিলিয়ে সেই বড় পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৩০-৪০ এবং আরও বেশি। মাঝখানে বড় একটা উঠান। তার চারপাশ ঘিরে রয়েছে সবার বসবাস। ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বারোয়ারি উঠানে বেরোলেই দেখা হয়, কুশল বিনিময় হয়। বিকেলে মা-চাচিদের চুল পরিচর্যা, পান খাওয়া, সামনে বাচ্চাদের খেলাধুলা, দুরন্তপনা। কোনো অনুষ্ঠান হলে তো কথাই নেই। সবার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি উতরে যেত ভালোভাবেই। কারও ওপর বেশি চাপ পড়ত না। সবাই জানত, তাদের প্রত্যেকেরই এই পর্বগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আজ সে যদি কারও পাশে দাঁড়ায়, সে-ও কাল তার পাশে দাঁড়াবে।
ইদানীং অনেকের মধ্যে সেই বিস্তৃত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফেসবুকে গ্রুপ খুলেই হোক বা বাস্তবে যোগাযোগ করেই হোক, এমন যোগাযোগ একাকিত্ব ঘোচাচ্ছে। নিজের বা পরিবারের যেকোনো বিপদে পাশে থাকছেন তাঁরা।
ভেঙে পড়া সোনালি সুখ
৫ বছর বয়সী এক শিশুকন্যা। স্কুলে কারও সঙ্গে মিশতে চায় না। কথা বলে না। যৌথ পরিবারে বসবাস। দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, মা-বাবা—সবাই একত্রে থাকে। শিশুটির মা একহাতে সংসার সামলান। রান্নাবান্না, বাচ্চার পড়াশোনা দেখা, চিকিৎসাসেবা—সবকিছুই দেখে রাখেন। পরিবারের অন্যরা না দেখার ভান করে। পারলে আরও কিছু চাপাতে চায়। অথচ শিশুটির মায়ের আক্ষেপ, ওরা যদি তাঁকে একটুও সাহায্য করত, তাহলে সংসারে নির্জীব ভাবটা থাকত না। তাঁর মেয়েটার আজ এই দুর্দশা হতো না। তিনি সবার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু অন্যদের নিস্পৃহ আচরণ পরিবারে তিক্ততার জন্ম দেয়। তিনি আরও বলছিলেন, আজ তাঁর সমস্যা কিন্তু কাল যে তারা দুর্দশায় পড়বে না, কে জানে? উল্টো চিত্রও রয়েছে। দাদি বা নানি নাতিকে নিয়ে যাচ্ছেন স্কুলে। তবে নাগরিক জীবনে সংখ্যাটা কম।
কোনো সমস্যা হলে; কেউ অসুস্থ হলে পরামর্শ নেওয়ার; সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানুষের এখন বড়ই অভাব। সবাই কাছের মানুষদের হাতের ছোঁয়া, আদর-ভালোবাসার অমূল্য পরশ—যা আমরা মনে মনে সবাই চাই, তা পাচ্ছি না।

সম্পর্কে যেন মরচে না ধরে
পরিবারে সম্পর্কগুলোর তারে যেন মরচে না ধরে, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার—কাছে-দূরে যেখানেই থাকি না কেন। অনেক সময় আমরা চাইলেও পরস্পরকে সময় দিতে পারি না। তাই সময়-সুযোগ পেলেই আনন্দময় পরিবেশের সুযোগ তৈরি করা উচিত। আর তা সবার সাধ্যমতো হওয়া উচিত। কারও কারও অভিযোগ, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কাছাকাছি হলে ভেতরের চাপা রাগ তিক্ততা, পরচর্চা—এসব বিষয় বেরিয়ে আসে। তাই অনেকে আত্মীয়স্বজনদের এড়িয়ে চলে। একজন আইনজীবী সেদিন হাসতে হাসতেই বলছিলেন, ‘আপনের চেয়ে পর ভালো, পরের চেয়ে জঙ্গল ভালো।’
একটা সময়ের পর নারী-পুরুষকে একাকিত্ব পেয়ে বসে। ছেলেমেয়ের দায়িত্ব কমে আসে, নিজেদের মধ্যকার জটিলতাগুলো তখন স্থায়ী মাত্রা পায়। সবাই তখন মনের অজান্তে নিজেকে নিয়ে ভাবে। হিসাব করে, কী পেলাম, কী পেলাম না, আর কী হারালাম। এই ব্যালান্সশিট তৈরি করতে গিয়ে আরও একাকিত্ব পেয়ে বসে। আর তখনই প্রয়োজন হয় সঙ্গীর, আড্ডার গল্প-গুজবের।
সুখে-দুঃখে মিলেমিশে
সময় বদলাচ্ছে। এই ঢাকায় কিংবা অন্য শহরে নজির তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন। অনেকে এখন এক পাতে খাচ্ছেন না ঠিক; কিন্তু একই অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে থাকছেন আত্মীয়-পরিজন মিলে।
একই প্লটে বাড়ি করছেন কখনো ভাইবোন মিলে; কাজিনস গ্রুপ; বন্ধুরা মিলে। অফিসের সহকর্মীরা মিলেও যৌথভাবে বাড়ি করছেন। কোনো জেলা বা এলাকার মানুষ মিলেও অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে নেওয়ার চলও আছে।
রক্তের সম্পর্কই কেবল আত্মীয়তার একমাত্র বন্ধন নয়, পরিবারের মতো আনন্দময় বন্ধন গড়ে উঠতে পারে সমমনাদের মধ্যেও। সেটাও কাঙ্ক্ষিত নিশ্চয়ই।
আত্মীয়রা মিলে একই এলাকায় ভাড়া করা আলাদা বাসায় থাকেন—এমনটাও শুনি। এই বন্ধন দেয় শক্তি, সৌহার্দ্য, ভরসা, সুখে-দুঃখে পাশে থাকার নৈতিক সাহস। এ কথা আমার নয়। ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা বলছেন, মিলেমিশে থাকার অনেক সুবিধা। নাগরিক জীবনের সমস্যাগুলো মিলিতভাবে মোকাবিলা করা যায়। বিপদের দিনে সহায়তাও মেলে। একসঙ্গে অনেক পরিবার মিলে ছুটি কাটাতে বেরিয়ে পড়া যায়। অসুখের দিনে খাবার আসে নিকটজনের হেঁশেল থেকে। নগরীর দুই প্রান্তে থাকলে এই সুবিধা মেলে না।
সচেতন মানুষ তাঁর প্রয়োজনেই এখন গড়ে তুলছেন এই বিস্তৃত পরিবার বা এক্সটেন্ডেট ফ্যামিলি। যে টিভি সিরিয়ালগুলোয় একান্নবর্তী পরিবার, মহল্লাভিত্তিক আত্মীয়তার বন্ধন প্রাধান্য পায়, সেসবের জনপ্রিয়তা হয় তুঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানা লেখা ও ছবিতে হাপিত্যেশের মধ্যেও মহীয়ান হয়ে ওঠে মিলেমিশে থাকার তাগিদ। ফেলে আসা সোনালি দিন কেমন করে আবার নতুন বিশ্বের আঙ্গিকে তাল মিলিয়ে ফিরিয়ে আনা যায়—সে জন্য পরামর্শ-পরিকল্পনার অন্ত নেই। প্রত্যাশার রেশও ফুরিয়ে যায় না।
কীভাবে সবাই কাছে আসতে পারে
নিজেকে সুখী রাখার চেষ্টা থাকতে হবে। অল্পতে খুশি হওয়ার মন্ত্রটা রপ্ত করতে পারলে সুখী হওয়া কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। অনেকের মতে, যৌথ পরিবারের এক পাতিলে রান্নার বাধ্যবাধকতায় না থেকে আলাদা থাকাই ভালো। কিন্তু বিচ্ছিন্নতাও তো সমাধান নয়। সে ক্ষেত্রে আমরা একান্নবর্তী না থেকেও কাছাকাছি থাকতে পারি। একটেবিলে না খেলেও সবাই তখন চাইলে ভালোমন্দ রান্নাবান্না শেয়ার করতে পারবে। এতে আন্তরিকতাও বাড়বে। আর মনে আনন্দস্বস্তিও থাকবে।
মনে রাখতে হবে, বৈরিতা-বিদ্বেষ-সাংসারিক কূটকচালিই শেষ কথা নয়। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। মিলেমিশে থাকতে চাওয়ায়ও সে কম ব্যাকুল নয়।
কিটি পার্টি বা ওয়ান ডিশ পার্টির আয়োজন পালাক্রমে বিভিন্ন আত্মীয়ের বাসায় হতে পারে। এতে একজনের ওপর চাপ কমে। নতুন নতুন পদ খাওয়া যায়। তবে সবার সামর্থ্যের দিকটাও নজরে রাখতে হবে। নতুবা অনর্থের সৃষ্টি হবে।
বড় পরিবারে বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিজেরাই আয়োজন করতে পারেন। জন্মদিন বিয়েবার্ষিকী, বাচ্চাদের ভালো ফল, চাকরিতে প্রমোশন বা যেকোনো সুখবরে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারেন। সবাই মিলে ছুটির দিনে যেতেই পারেন আশপাশে কোথাও ঘুরতে।
এখন মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ভাইবার ও স্কাইপের যুগ। কেউ বাইরে আছে। তাকে সহজেই শুভেচ্ছা জানানো যেতে পারে। দরকার শুধু আন্তরিকতার।
জীবনকে উপভোগ করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনভোমরা। তবে তা যেন অবশ্যই আনন্দময় ও স্বাস্থ্যকর হয়।
সহযোগী অধ্যাপক
মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।