
মিলন ও তমার (ছদ্মনাম) পাঁচ বছরের সংসারে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে। দিন দিন দুজনের মধ্যেই ব্যক্তিত্বের সংঘাত বাড়ে। এর মধ্যে অনেকবারই আইন-আদালতেও গিয়েছেন তাঁরা। পরে দুজন মিলে নিজেদের ভুল বোঝাবুঝি মেটালেও কয়েক দিন যেতে না যেতেই আবারও আগের মতো অবস্থা। দৈনন্দিন সামান্য ব্যাপার নিয়েও তাঁরা দুজনে দুজনার বিরুদ্ধে অনেকগুলো জিডিও করে রেখেছেন। আর কথায় কথায় একে অন্যকে আইনের ভয় দেখানো তো আছেই। তমা ও মিলনের মতো অনেক দম্পতিকেই দেখা যায় সামান্য কারণেই আদালতে মামলা ঠুকে দিতে। অনেক সময় কাছের থানায় গিয়ে জিডি রুজু করে কিংবা এজাহার দায়ের করে মামলাও ঠুকে দেয় অনেকে। পরবর্তী সময়ে নিজেদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান হলে মামলার ধরন অনুযায়ী অনেক সময় মামলা প্রত্যাহার করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া আইনি পদ্ধতি মানতে গিয়ে আর মামলার প্যাঁচে পড়ে দুজনের জীবনেই নেমে আসে এক অন্য রকম জটিলতা। এ জটিলতা থেকে রেহাই পাওয়ার পদ্ধতিও অনেক জটিল।
আইনের আশ্রয় নেওয়ার আগে যা ভাবতে হবে
সংসারে খুঁটিনাটি বিষয় কিংবা সামান্য কোনো ব্যাপারে ভুল-বোঝাবুঝি হলে হুট করে আইন-আদালতের আশ্রয় নেওয়ার পরিকল্পনা করা উচিত নয়। যদি সত্যি কোনো অভিযোগ থাকে এবং মারাত্মক কোনো অভিযোগ যেমন নির্যাতন, যৌতুক প্রভৃতি, তাহলে আইনের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন হয়। তখনই কেবল মামলা দায়ের করতে পারেন। অন্যথায় নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত থেকে কিংবা সমান্য কারণে মামলা ঠুকে দেওয়া উচিত নয়। এতে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। আইনি ঝামেলায় পড়ে দাম্পত্য জীবন হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ। যদি কোনো বিষয়ে মতবিরোধ কিংবা ঝগড়াঝাটি হয়, তাহলে প্রথমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বিবাদটি মিটিয়ে নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের উপস্থিতিতে বিষয়টি সুরাহা করে নিতে পারেন। অনেক সময় বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়ার আগে কোনো মানবাধিকার সংস্থা বা আইনি সহায়তা প্রদানকারী কোনো সংস্থার মধ্যস্থতায় নিজেদের মধ্যে বিরোধটি মিটিয়ে ফেলতে পারেন। সন্তান থাকলে নিজেদের মধ্যে বিরোধের মধ্যে বা মামলার মধ্যে সন্তানদের জড়ানো কখনোই ঠিক হবে না। মনে রাখতে হবে, ইচ্ছা করলেই মামলা ঠুকে দেওয়া যায় না, আর মিথ্যা কোনো অভিযোগে মামলা করলে এর জন্যও শাস্তি পেতে হবে।
মামলা করে ফেললে কী করণীয়
সামান্য কারণে যদি কেউ মামলা ঠুকেই দেয় তাহলে প্রথমত আইনজীবীর সঙ্গে মামলার ধরন নিয়ে আলাপ-আলোচনা করুন। যদি আদালতে কোনো ফৌজদারি নালিশি মামলা দায়ের করেন, তাহলে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করতে হবে এবং আদালতে গিয়ে জবানবন্দি দিয়ে মামলাটি প্রত্যাহার করতে হবে। কোনো দেওয়ানি মোকদ্দমা হলে দেওয়ানি আদালতে হলফনামা সহকারে জবানবন্দি দিয়ে মোকদ্দমাটি প্রত্যাহার করে নিতে হবে। দেওয়ানি আদালতে আপসনামা দাখিল করেও মোকদ্দমা নিষ্পত্তির সুযোগ আছে। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিরও বিধান আছে। ফৌজদারি মামলাতেও আপসের বিধান আছে, তবে তা সীমীত আকারে। যদি মামলাটি থানায় দায়ের করা হয়, তাহলে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দুজন মিলে দেখা করে এবং আলাপ-আলোচনা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের ব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি বিরোধটি মীমাংসার আগেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়, তাহলে আদালতে গিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের হলে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ আছে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট