পরিবার পরিকল্পনা না করার একটি বড় কারণ শিক্ষার অভাব

এ কে এম নূরুন নবী
এ কে এম নূরুন নবী
বাংলাদেশ সরকারের যে কয়টি কর্মসূচি সাফল্যের মুখ দেখেছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি। এই কর্মসূচির ফলে গত তিন দশকে দেশে জন্মহার অ​েনক কমেছে। কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি। এ নিয়ে প্রথম আলো কথা বলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এ কে এম নূরুন নবীর সঙ্গে। তিনি বর্তমানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রথম আলো: দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গত তিন দশকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে বেশ সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যা​​টিসটিকস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, দেশে জন্মহার আবার বাড়তে শুরু করেছে। কেন এমন হচ্ছে?

ড. এ কে এম নূরুন নবী: বাংলাদেশে জনসংখ্যার  প্রবৃদ্ধির গতি-প্রকৃতি গভীরভাবে দেখলে কতকগুলো প্রসঙ্গ চলে আসে, যা একই সঙ্গে সুখের ও দুঃখের। মোটা দাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বলা যায়, নিঃসন্দেহে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। আবার একই সঙ্গে জন্মহার বাড়ছে। দেশে মাতৃমৃত্যুর হার এবং শিশুমৃত্যুর হার কমছে। মানুষের গড় আয়ুও বাড়ছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু বাল্যবিবাহ হচ্ছেই, কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। এতে একজন নারী কম বয়সে বৈবাহিক জীবন শুরু করে। ফলে নারীর সন্তান প্রজননের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। সে বেশি সন্তান উৎপাদনের সুযোগ পাচ্ছে। জনসংখ্যা-কাঠামো বিশ্লেষণ করলে আমরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এ সফলতা ধরে রাখতে পারব কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগ এসেই যায়।

প্রথম আলো: পরিবার পরিকল্পনা কর্মর্সূচির প্রধান বাধা কোনটি? কেন এখনো শতভাগ দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে না?

ড. এ কে এম নূরুন নবী: শতভাগ দম্পতিকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে—বিষয়টি এমন নয়। প্রজননব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সমাজ চলবে, না হলে দেশ কয়েক বছরের মধ্যেই বয়স্ক মানুষের দেশে পরিণত হবে। তবে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধ​তি গ্রহণ না করার একটি বড় কারণ শিক্ষার অভাব। শিক্ষার অভাবে পরিবারগুলো এর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে পারছে না, ফলে বেড়ে যাচ্ছে জন্মহার। আবার কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে অনেক পরিবার বংশ রক্ষা, সম্পত্তি রক্ষাসহ সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণে ছেলেসন্তানের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে থাকে। তাই মেয়েসন্তানের জন্ম দিলে তারা আরও সন্তান গ্রহণে আগ্রহী হয়ে পড়ে। তারা কোনোভাবেই বুঝতে পারে না, একটি মেয়েও পরিবারে আলো ছড়াতে পারে, পরিবারের কান্ডারি হতে পারে।

প্রথম আলো: পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে বেগবান করতে সরকারের কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত?

ড. এ কে এম নূরুন নবী: পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে বেগবান করতে প্রথমেই  নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। চাকরির ক্ষেত্রে নারীকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে একটি সন্তান বা দুইয়ের অধিক সন্তান না নিলে সরকার থেকে সেই পরিবারের জন্য অ্যালাউন্স রাখা উচিত, এটি মা-বাবাকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধ​িত গ্রহণে উৎসাহী করে তুলবে।

প্রথম আলো: জন্ম​িনয়ন্ত্রণের সামগ্রী অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে না পৌঁছানোয় সেসব অঞ্চলে জন্মহার বেশি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী পৌঁছানো সহজতর করতে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে?

ড. এ কে এম নূরুন নবী: দেশে এখন শতকরা ৬১ দশমিক ২ শতাংশ দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করছে। যদিও সরকার  লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে শতকরা ৮০ শতাংশ। একটি বড় সংখ্যায় প্রায় ১২ শতাংশ দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে চাইলেও পারছে না। এসব দম্পতি আগ্রহী থাকা সত্ত্বেও কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এটি একটি বড় বাধা। এসব অঞ্চলে  কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এ কার্যক্রম চললেও লোকবলের অভাবে অনেক জায়গাতেই ঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। একই সঙ্গে মোবাইল ​ ফোনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া যায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।