পারিবারিক সুরক্ষা পেতে চাইলে

অনেক শিশু ও নারী নিজের ঘরে নির্যাতিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বঞ্চিত হচ্ছেন পারিবারিক অধিকার থেকে? কী করতে হবে, কার কাছে যেতে হবে, কিছুই জানেন না তাঁরা। এ জন্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০-এর আশ্রয় নিতে পারেন। এ আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, পারিবারিক সহিংসতা বলতে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনো ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোনো নারী বা শিশুর ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন অথবা আর্থিক ক্ষতিকে বোঝায়। শারীরিক নির্যাতন বলতে বোঝায় এমন কোনো কাজ বা আচরণ, যার ফলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শরীরের কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য করা অথবা প্ররোচনা দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া মৌখিক নির্যাতন, ভয় দেখানো, অবজ্ঞা, হয়রানি, ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রভৃতি মানসিক নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে। যৌন প্রকৃতির এমন আচরণ, যাতে সম্ভ্রম, সম্মান বা সুনামের ক্ষতি হলে তা যৌন নির্যাতন বলে চিহ্নিত হবে। নির্যাতিত ব্যক্তির নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র ব্যবহার করতে না দেওয়া, বিয়ের সময় কিংবা অন্য সময় পাওয়া বিভিন্ন উপহারসামগ্রী পেতে বাধা দেওয়া, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বাধাদান প্রভৃতি আর্থিক ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত।
যেভাবে আদালতে আবেদন করতে হবে
আপনি যদি পারিবারিক সহিংসতার কারণে সংক্ষুব্ধ হন, তাহলে এই আইনের অধীনে প্রতিকার পাওয়ার জন্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করতে পারেন। আইনজীবীর মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত যদি উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে পারিবারিক সহিংসতা ঘটতে পারে এমন অথবা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়, এমন যেকোনো প্রকার কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য সুরক্ষার আদেশ দিতে পারেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হলে কিংবা পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে হলে বা প্রমাণ পেলে আদালত একতরফাভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষার আদেশ দিতে পারেন এবং প্রতিপক্ষকে সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য নোটিশ দেবেন। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত তারিখে দুই পক্ষের শুনানি শেষে আদালত সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তির পক্ষে সুরক্ষা আদেশ দেবেন। এ সুরক্ষা আদেশে প্রতিপক্ষকে পারিবারিক কোনো সহিংসতামূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে, পারিবারিক সহিংসতা করতে প্ররোচনা না দিতে, মোবাইল বা টেলিফোনে যোগাযোগ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকার জন্য এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যাতায়াতের জায়গায় প্রবেশ না করতে প্রতিপক্ষকে আদেশ দেবেন। আদালতের সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘন করলে সংক্ষুব্ধ শিশু বা নারী আদালতে এ আইনের ৩০ ধারায় পৃথক আবেদন করতে পারেন এবং আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘনকারীদের ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দিতে পারেন। এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে দুই বছরের কারাদণ্ডসহ এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছে। এ আইনের অধীনে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিজে সরাসরি আদালতে আবেদন দাখিল করতে পারেন কিংবা তাঁর পক্ষে আইনে নির্ধারিত প্রয়োগকারী কর্মকর্তা কিংবা যেকোনো ব্যক্তি আবেদন করতে পারবেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার কোনো শিশু বা নারী যে স্থানে অস্থায়ী বসবাস করছেন কিংবা আবেদনকারী যেখানে বসবাস করছেন কিংবা প্রতিপক্ষ যেখানে বসবাস করছেন অথবা সহিংসতার ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে, এর যেকোনো এলাকার অধিক্ষেত্রসম্পন্ন আদালতে আবেদন করা যাবে। এ আইনের অধীনে প্রয়োগকারী কর্মকর্তা হবেন সরকারের মহিলা অধিদপ্তর কর্তৃক নিযুক্ত একজন থানা পর্যায়ের কর্মকর্তা। এ আইনের আওতায় শুধু সুরক্ষা আদেশ নয়, অংশীদারি বাসগৃহে বসবাসের জন্য এবং ক্ষতিপূরণ চেয়েও আদালতে আবেদন করা যাবে। তবে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলে আবেদনকারীকেই উল্টো এক বছরের জেল কিংবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট