প্রকৃতির কোলে পদার্থবিজ্ঞান উৎসব

‘ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত/লুসাই পাহাড়ত্তুন লামিয়ারে/যার গই কর্ণফুলী...।’ উপস্থাপক-উপস্থাপিকার কণ্ঠে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান। শুনেই প্রায় ছয় শ শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর সে কী বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস! নগরের কনকর্ড ফয়েজ লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্কে ১৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই উচ্ছ্বাস অব্যাহত ছিল ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিল এসব শিক্ষার্থী। উপলক্ষ—পদার্থবিজ্ঞানের জাতীয় অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ। উৎসবমুখর পরিবেশে দূর হয়ে যায় পরীক্ষাভীতি।
বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের অষ্টম আসরের জাতীয় পর্ব এবার আয়োজন করা হয় চট্টগ্রামে। সারা দেশ থেকেই এ বছর অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি, তার ওপর প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে সাজানো হলো জাতীয় পর্বের মঞ্চ। তাই এই আসর নিয়ে উৎসাহের কমতি ছিল না। দেশের ১৪টি অঞ্চলে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক পর্বে বিজয়ী ছয় শ শিক্ষার্থী এবারের উৎসবে অংশ নেয়।
শুক্রবার সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে উৎসবের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াড কমিটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক খন্দকার সাদাত হোসেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়াসমিন হক, বাংলাদেশ ফিজিকস অলিম্পিয়াডের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এফ এ জাহাঙ্গীর মাসুদ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুর মফিজ, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম, চট্টগ্রামের প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল হক খান, সদস্যসচিব মো. গোলজার আলম আলমগীর ও অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। তাঁদের বক্তব্য থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীদের পথ দেখাবে।
অতিথিদের বক্তব্যের পরই শুরু হয় লিখিত পরীক্ষা। তবে এই পরীক্ষাকেন্দ্র একেবারেই অন্য রকম। ‘কেন্দ্রের’ এক পাশে হ্রদের স্বচ্ছ পানি, অন্য পাশে পাহাড়। মাঝখানের খোলা প্রাঙ্গণে শামিয়ানার নিচে সারি সারি চেয়ার-টেবিলে ৬০০ জনের বসার ব্যবস্থা। শীতের সকালে প্রকৃতির কোলে বসে যেন পরীক্ষা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। তাই টানা তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শেষেও কারও চোখে-মুখে ক্লান্তির রেশ দেখা গেল না।
পরীক্ষা শেষে শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দের মাত্রা বাড়ল আরও। কত যে জিজ্ঞাসা তাদের! প্রশ্নের শেষ নেই। মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে শিক্ষার্থীদের কৌতূহল মিটিয়েছেন, আনন্দও দিয়েছেন। শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা কেমন হলো? উৎসবে অংশ নিয়ে নিশ্চয়ই তোমরা মজা করেছ।’ পরীক্ষা খারাপ হলেও উৎসবের মজা নিয়ে কারও কোনো দ্বিমত ছিল না। শিক্ষার্থীরা সবাই হাত তুলে সেটাই জানিয়ে দিল।

এবারের অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছে রাজবাড়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মো. তারিক মাহতাব ও মো. সিফাত রহমান। দুজন জানাল, উৎসবে যোগ দিয়ে তারা খুবই আনন্দিত। এ ধরনের অনুষ্ঠানে এসে বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে, অনেক কিছু জানতে পেরেছে।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন আরও আনন্দময় ও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। নাচ, গান, আড্ডা, জাদুসহ ছিল নানা আয়োজন। এ দিন আর পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল না। যদিও ফলাফল ঘোষণার একটি পর্ব ছিল শেষ দিনে। একের পর এক মজার সব আয়োজনে মগ্ন থাকা শিক্ষার্থীদের ফল নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তা ছিল বলে মনে হলো না। তারা বরং মেতেছিল নাচ-গান আর জাদুতেই।
সমাপনী দিনের শুরুতে সকাল ৯টায় মঞ্চে আসেন ফিজিকস অলিম্পিয়াডের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম আরশাদ মোমেন। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাঁশি শুনিয়ে দর্শক-শ্রোতাকে মুগ্ধ করেন শোভন দাশ। এ ছাড়া প্রথম আলোর বন্ধুসভা, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা নাচ, গান পরিবেশন করেন। বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। গান করেন রাজশাহী থেকে আসা রাজীব কানা। জাদু পরিবেশন করেন রাজীব বসাক।
শেষ পর্বে ছিল ফলাফল ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এতে ‘এ’ শাখায় (সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি) বিজয়ী হয়েছে ১৩ জন, ‘বি’ শাখায় (নবম ও দশম শ্রেণি) জয়ী হয়েছে ২৪ জন এবং ‘সি’ শাখায় (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি) বিজয়ী হয়েছে ৩০ শিক্ষার্থী। তাদের গলায় পদক পরিয়ে দেন অতিথিরা।
গাজীপুর থেকে ছেলে হৃদয় অধিকারীকে নিয়ে এসেছিলেন বাবা সুভাষ চন্দ্র অধিকারী। উৎসবের পরিবেশ দেখে রীতিমতো মুগ্ধ তিনি। বললেন, ‘খুব সুন্দর আয়োজন। ছেলেমেয়েরা অনেক বড় বড় মানুষের দেখা পেয়েছে। তাঁদের কথা শুনেছে। এসব তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে।’
জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জীবনের একটি ইচ্ছা পূরণ হয়েছে বলে জানায় চকরিয়া গ্রামার স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র চৌধুরী মো. আদিল নেওয়াজ। তার বক্তব্য, ‘উৎসব প্রাঙ্গণটা খুবই সুন্দর। দারুণ একটা জায়গায় পরীক্ষা হয়েছে। হ্রদ আর পাহাড়ের পাশে কেন্দ্র হওয়ায় কোনো ভীতি কাজ করেনি। বরং উপভোগ করেছি।’
রাজশাহীর গভ. ল্যাবরেটরি উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র রুবায়েত হাসান বলে, ‘উৎসবে এসে বড় বড় স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা পদার্থবিজ্ঞান, রয়াসন ও গণিতে ভালো করার ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। এখন তা অনুসরণ করার চেষ্টা করব।’