রান্নার উপকরণ আনতে হবে বাজার থেকে। খোলামেলা কাঁচাবাজার কিংবা সুপারশপের একটা ছাদের নিচে পণ্যের সমাহার, অনলাইন কিংবা ফোনে ফরমাশ করে দেওয়া—যে পদ্ধতিতেই হোক, রান্নার আগে প্রস্তুত রাখতে হবে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ।
মহামারির এই সময়ে অনেক মানুষ এখন বিলাসী জীবনযাপন এড়িয়ে চলেন। তবে ঈদের দিনটা অন্তত উৎসবের আমেজেই কাটুক। আপনি নাই–বা হলেন ভোজনরসিক, নাই–বা হলেন রসনাবিলাসী, তবু তো ঈদ আসছে। বাজারজুড়ে আছে ঈদের আয়োজন। সাধ্য অনুযায়ী ক্রেতারা করবেন ঈদের বাজার। ঈদের দিন সেমাই খাওয়ার রীতিটা পুরোনো। আজও অম্লান এই ধারা। আরও থাকে পোলাও-মাংস, ফিরনি কি পায়েস। ‘লকডাউন’ পরিস্থিতিতে বাড়িতে বেকিংয়ের আয়োজন থাকতে পারে। মাছের কোফতা, চিলি চিকেন, মিট বল, কাবাব; আরও নানা পদ করা হতে পারে ঈদে। রান্না যেমন, মসলাও চাই তেমন। আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ তো নিত্যকার প্রয়োজন। আয়োজনের পরিসর ছোট হোক বা বড়, রান্নার উপকরণ আনতে হবে বাজার থেকে। খোলামেলা কাঁচাবাজার কিংবা সুপারশপের একটা ছাদের নিচে পণ্যের সমাহার, অনলাইন কিংবা ফোনে ফরমাশ করে দেওয়া—যে পদ্ধতিতেই হোক, রান্নার আগে প্রস্তুত রাখতে হবে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ।
নানা ‘অফার’ সুপারশপে
সুপারশপ স্বপ্নের হেড অব কাস্টমার অ্যানালিটিকস ও কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজার মেহজাবিন বাঁধন বলেন, ‘সব সময়ের মতোই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রয়েছে নানা ছাড়ের সমাহার। অনেক ক্রেতা তাঁর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে ঈদে নানা সামগ্রী উপহার হিসেবে পাঠাতে চান, তাঁদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা আছে, নির্দেশনা দিয়ে দিলে সে অনুযায়ী প্যাকেট করে, শুভেচ্ছাবার্তা লিখে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ছাড়া অনেক ক্রেতাই তাঁর চারপাশের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সাহায্য করতে চান। তাঁদের কথা মাথায় রেখে “সেবা প্যাক” নামে একটা কম্বো প্যাক করা হয়েছে, যেখানে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।’
করোনাকালে আয়ের উৎস হারিয়ে কষ্টে পড়েছেন অনেক মানুষ। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাইলে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর এই প্যাকেজটি ক্রেতা নিজেও পৌঁছে দিতে পারেন যথাস্থানে, আবার সুপারশপটির মাধ্যমেও ক্রেতা পাঠাতে পারেন। চাইলে এই প্যাকেজে ক্রেতা স্বেচ্ছায় কিছু পণ্য যোগ করেও নিতে পারেন। মেম্বারশিপ কার্ড থাকলে যেকোনো কেনাকাটায় নির্দিষ্ট পয়েন্টের বিপরীতে সাশ্রয় হবে ক্রেতার, আর এই ক্রেতাদের কেনাকাটার পরিসর বুঝে সে অনুযায়ী ‘অফার’ দেওয়ার নিয়মও রয়েছে তাঁদের। ঈদের ‘অফার’ পাবেন মীনাবাজারেও।
সুপারশপে কেনাকাটা আরও
সুপারশপে বিভিন্ন পণ্য কিনতে এদিক-ওদিক ছোটাছুটির হ্যাপা নেই। অনলাইন সেবা (ই-কমার্স) এবং টেলিফোন নম্বরের মাধ্যমে (ফোনকল কিংবা খুদে বার্তা হতে পারে) ফরমাশ দিলে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকে। ইউনিমার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস) দিলরুবা আক্তার জানালেন, বাসা থেকে অনলাইনে ফরমাশ দিতে চাওয়া ক্রেতাটি হয়তো তাঁদের নানা পণ্যের ভিড়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি খুঁজে না-ও পেতে পারেন, আবার অনেকে ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা গ্রহণে স্বচ্ছন্দ নন—এমন ক্ষেত্রে টেলিফোনভিত্তিক সেবাটি বেশ কাজে দেয়। বাড়িতে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সেবাটি কোনো কোনো সুপারশপের সেবা তালিকায় রয়েছে বিনা খরচে, কোথাও কোথাও আবার খরচ হচ্ছে অল্পবিস্তর। ক্রেতা ইচ্ছে করলে নিকটস্থ আউটলেটে গিয়ে পণ্য কিনেও আনতে পারেন।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অবশ্যই জরুরি—সুপারশপগুলোর পক্ষ থেকে জানা গেল এমনটাই। আউটলেটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও মাস্ক, ফেসশিল্ড পরিধানসহ স্বাস্থ্যবিধির অন্যান্য দিক মেনে চলেন বলে জানালেন দিলরুবা আক্তার। আরও জানালেন, খাদ্যসামগ্রীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে কীভাবে আউটলেটের অভ্যন্তরে জীবাণুনাশের কাজ চালিয়ে যেতে হবে, সেই দিকগুলোও যত্নের সঙ্গে দেখেন তাঁরা, ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও করে থাকেন। আর ক্রেতা নিজে মাস্ক পরে, সুপারশপের প্রবেশমুখে নিজের শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয় করিয়ে, জীবাণুনাশক দ্রবণ ব্যবহার করে, তবেই প্রবেশ করতে পারবেন পণ্য রাজ্যে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে আউটলেটের আকার অনুযায়ী নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষকে ভেতরে যেতে দেওয়া এবং বাকিদের আউটলেটের বাইরে অপেক্ষায় রাখার বিষয়টিও থাকছে বলে জানালেন মীনাবাজারের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন্স) শামীম আহমেদ জায়গীরদার। ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নীতিমালা মেনে চলছেন তাঁরা। সুপারশপগুলোতে মূল্য পরিশোধে নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।
ঘরে থেকে কেনাকাটার সুবিধা
ঘরে থেকে কেনাকাটার সবচেয়ে ভালো দিক হলো সংক্রমণ প্রতিরোধ। ঘর থেকে দোকান পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসার মাঝের সময়টাতে নানা ব্যক্তির সংস্পর্শে আসতে হয়। অনেকেই হয়তো সামাজিক দূরত্ব মানায় অভ্যস্ত নন, অন্যের কেনাকাটার সময়ই হুমড়ি খেয়ে পড়েন। তাই নিজে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও অন্যের অসাবধানতায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। এটি মাথায় রেখে ঘর থেকে যত কম বের হওয়া যায়, ততই ভালো।
ক্রেতার অভিজ্ঞতা
ঘুরে আসা যাক একজন ক্রেতার কাছ থেকে। তাসমি জ্যোতি পরিবারের জন্য মাঝেমধ্যে টুকটাক কেনাকাটা করেন। কাঁচাবাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে একেবারেই স্বচ্ছন্দ নন। পেশায় চিকিৎসক, মিরপুরের বাসিন্দা তাসমি সুপারশপ থেকে কেনাকাটা করতেই পছন্দ করেন। বাসার বেশ কাছেই রয়েছে সুপারশপ স্বপ্নের আউটলেট। কখনো তাঁর মা-বাবা যাচ্ছেন সেখানে, কখনো মায়ের কাছ থেকে বাজারের তালিকা জেনে নিয়ে তিনিই যাচ্ছেন, কখনো অনলাইন সেবায় নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি পৌঁছে যাচ্ছেন তাঁর আবাসস্থলে। তাসমি একদিন সকাল সকাল স্বপ্নের আউটলেটে হাজির হয়েছিলেন। পছন্দমতো মাংস নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। সেখান থেকে নেওয়া মাছের ব্যাপারেও করলেন ইতিবাচক মন্তব্য। স্বপ্ন থেকে যতবারই ফল নিয়েছেন, সব সময়ই হয়েছেন সন্তুষ্ট। এই যেমন গরমের সুস্বাদু ফল তরমুজ কিনতে হলে স্বপ্নই তাঁর ভরসা। জানালেন, বাছাই করা ভালো তরমুজ নেওয়ার সুযোগ থাকে সেখানে। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা কেনাকাটার জন্য তিনি ও তাঁর পরিবার আস্থা রাখেন সুপারশপ স্বপ্নে। স্বপ্ন থেকে সম্প্রতি অনলাইন কেনাকাটায় ছাড় পেয়েছেন বলেও জানালেন। আসছে ঈদের সময়টা কর্মস্থল মাদারীপুরেই কাটবে বাংলাদেশ সরকারের সহকারী সার্জন তাসমির। হয়তো ঈদের দিনটিতেও ব্যস্ত থাকবেন করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায়। তবে পরিবারের সদস্যদের ঈদের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়ে গেছে বলেই জানালেন রাজধানী থেকে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আগের দিনটাতে। সেই প্রস্তুতির শুরুটা হয়েছে সুপারশপ স্বপ্নের অনলাইন সেবার মাধ্যমেই। এমনকি তিনি কর্মস্থলে চলে যাওয়ার পরেও অনলাইন সেবার কল্যাণে তাঁর পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা সশরীরে বাজারে যাওয়ার ঝুঁকি এড়িয়েই প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনিয়ে নিতে পারবেন বলে নিশ্চিন্ত থাকেন এই চিকিৎসক।
কাঁচাবাজারে সদাই করা
কাঁচাবাজারে কেনাকাটা চলতে পারে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে অবশ্যই। মাস্ক পরে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, হাত জীবাণুমুক্তকরণের নিয়ম মেনে তবেই না কেনাকাটা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার, নিউমার্কেট কাঁচাবাজার, হাতিরপুল বাজার, বনানী কাঁচাবাজারই হোক, কিংবা হোক রাজধানীর বাইরের ছোট–বড় যেকোনো কাঁচাবাজার—ঈদের আয়োজন থাকছে কমবেশি। সুগন্ধী চাল, মাংসের কিমা, ডাবলি, নুডলস কিংবা ফলমূল—ঈদের আয়োজনে প্রয়োজনের তালিকায় থাকতে পারে এমন নানা পণ্য। দোকানের পণ্যের জন্য টেলিফোনে ফরমাশ করার সুযোগও থাকতে পারে।
দেখেশুনে কেনাকাটা
সুপারশপের নিজস্ব ব্যবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও চালডাল ডট কমের মতো অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেয় বাসায়। তবে অনেক পণ্যের মধ্যে দেখেশুনে বাছাই করে কেনাকাটা করতে চাইলে অবশ্য দোকানে যেতেই হয়। আবার দেশজুড়ে অনেক জায়গাতেই সুপারশপের সুবিধা নেই। তাই চিরাচরিত বাজার করার দৃশ্যটা মোছে না দৃশ্যপট থেকে। আবার কাঁচাবাজারে নানা পণ্যের গুণগত মানের তুলনামূলক বিচার করার সুযোগ থাকে। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় ঘটাতে এই সুযোগটিও কাজে লাগাতে পারেন অনায়াসে। শৈশবে বাবার হাত ধরে কাঁচাবাজারে যাওয়ার স্মৃতি হয়তো অনেকেরই চোখে ভাসে। হারিয়ে যাওয়া সেসব দিনের মতো কবে আবার সব স্বাভাবিক হবে, আমরা কেউ তা জানি না। পরিবর্তিত জীবনধারায় আরেকটি ঈদ আসছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই হোক এই ঈদের কেনাকাটা।