ফিবুনাচি না বিরহাঙ্ক?

উইলিয়াম স্নেল
উইলিয়াম স্নেল

ভদ্রপাড়ার কুম্ভিলকেরা: ইংরেজিতে প্লেজিয়েরিজম (plagiarism) বলে একটা কথা আছে, যার বাংলা তরজমা ভদ্রভাষায় কুম্ভিলকবৃত্তি, অনতিভদ্রতে চৌর্যবৃত্তি। তবে এটা সাধারণ পকেটমারা বা সিঁদকাটা চৌর্যবৃত্তি নয়, বুদ্ধিজগতের শিক্ষিত চৌর্য। জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতে এর মানে দাঁড়ায়, একজনের গবেষণালব্ধ মৌলিক কাজ আরেকজনের নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে রীতিমতো নাম করে ফেলা। এ রকম ঘটনা অহরহই ঘটত আগেকার দিনে। ছাত্রের লেখা অভিসন্ধর্ভের পুরো কৃতিত্বটাই হয়তো অবেক্ষক সাহেব আতসাৎ করে ছাপিয়ে দিলেন নামকরা জার্নালে। আর ছাত্র বেচারা ঘরে বসে রাগে দুঃখে নিজের চুল ছেঁড়া ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পেলেন না। এ ধরনের অবিশ্বাস্য ঘটনাও যে ঘটেনি, তা নয়।
তবে বর্তমান যুগের চৌর্যবৃত্তি একটু ভিন্ন রকম। ইন্টারনেটের কল্যাণে যেহেতু কেউ কারও কাছ থেকে সহজে কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে না, সেহেতু চুরিটা হয় প্রধানত সেই ইন্টারনেটেরই কাছ থেকে। যেমন, গুগলের মারফতে ইন্টারনেট থেকে একটা তথ্য ধার করার পর গবেষণাপত্রে সেই তথ্যসূত্রটি বেমালুম চেপে গিয়ে নিজের বলে দাবি করার চেষ্টা। মানব চরিত্রের এই ছোটখাটো হীনতাগুলো চিরকালই ছিল, চিরকাল থাকবেও। তবে উঁচুমানের গবেষক-সাধকদের মধ্যে এই দুর্বলতাগুলো খুব কমই দেখা গেছে। যা অনেক ক্ষেত্রেই ঘটেছে তা হলো, একই কাজ সম্পর্কে আর কেউ কিছু করেছেন কি না, তা না জেনে তাঁর নিজের কাজটি কোনো পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। সেই একই কাজ নিয়ে হয়তো অন্য লোকটি অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো পত্রিকায় তার আগেই প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। এটা চৌর্যবৃত্তি নয়, এমনকি অনিচ্ছাকৃত ভুলও নয়, এটা স্বাধীন ও যুগপৎ গবেষণা। দুজনেরই সমান অধিকার গবেষণার কৃতিত্ব দাবি করার।
পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতশাস্ত্রে এর ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। আলোকরশ্মির প্রতিসরণ বিষয়টিতে Snell’s Law বলে একটা বিখ্যাত সূত্র আছে, যা পদার্থবিজ্ঞানের প্রাবেশিক ছাত্রছাত্রীদের সবাইকেই মুখস্থ করতে হয়। স্নেল সাহেব, যার পুরো নাম William Snellius (১৫৮০-১৬২৬) নিশ্চয়ই নিজের মেধার গুণ আর সাধনা দিয়েই আবিষ্কার করেছিলেন এই মূল্যবান সূত্রটি। তিনি হয়তো জানতেনই না যে প্রায় একই সময় ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত দার্শনিক-বিজ্ঞানী-গাণিতিক রেনে দেকার্ট (১৫৯৬-১৬৫০) ঠিক একই সূত্র প্রমাণ করে গেছেন। অবশ্য তাঁর প্রমাণটিতে বিস্তর ফাঁকফোকড় ছিল। সে কারণে আধুনিক পাঠ্যপুস্তকপ্রণেতাদের অনেকেই সূত্রটিকে কেবল স্নেলসূত্র আখ্যায়িত না করে বলে, Snell-Descartes Law.
মজার ব্যাপার হলো, তাতেও ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের প্রয়াসটি পুরোপুরি সফল হয়নি। দেকার্ট বা স্নেল, দুজনের কারোরই হয়তো জানা ছিল না যে প্রায় ৬০০ বছর আগে মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে সা’ল (৯৪০-১০০০) প্রতিসরণ সমস্যা নিয়ে গবেষণা করে হুবহু একই সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। তার প্রমাণের যুক্তিতে দেকার্টের মেতো কোন ভুলত্রুটি ছিল না। শুধু তা-ই নয়। ওই সময়কার বেশ কিছু আরব ও ইরানি পদার্থবিদ আলোকরশ্মির প্রতিফলন আর প্রতিসরণ বিষয় নিয়ে অত্যন্ত মূল্যবান কাজ করে গেছেন, যা দীর্ঘকাল অজ্ঞাত ছিল বিজ্ঞানজগতে। সেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে আল-কিন্ডি (৮০১-৮৭৩), ইবনে আল-হাইথাম ( ৯৬৫-১০৪০), আল-বিরুনি (৯৭৩-১০৪৬) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিসরণ সূত্রের নামটি স্নেল আর দেকার্টের যুগ্ম আবিষ্কার না বলে আমার মতে হওয়া উচিত Sahl-Snell Law। দেকার্টের নামটি থাকলে থাকতেও পারে, তবে সাল সাহেবেরই অগ্রাধিকার তার চেয়ে বেশি, বিশেষ করে যখন ধরা হয় যে সালের প্রমাণে কোনো ভুল ছিল না, যা দেকার্ট সাহেবের বেলায় দাবি করা যাবে না।

লোপিতাল
লোপিতাল

আরেকটি বিখ্যাত উদাহরণ হলো, গণিতের অন্তর্কলন শাখাটির ‘লোপিতাল’ সূত্রের মালিকানা ব্যাপারটি। সূত্রটি এতই বিখ্যাত যে, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের যেকোনো ছাত্রছাত্রী গড়গড় করে বলে দিতে পারবে লোপিতাল সূত্র বলতে কী বোঝায়। কথা হলো, লোপিতাল সূত্রের আবিষ্কারক কি সত্যি সত্যি ফ্রান্সের বড়লোক সামন্তসন্তান Guillaume-Fracois-Antoine de L’Hopital (১৬৬১-১৭০৪), না অন্য কেউ? আমরা যতটুকু জানি, ঘটনাটি এ রকম। বাপ চেয়েছিলেন ছেলে সৈন্যবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নিয়ে একসময় সেনাপতি হবে। কিন্তু ছেলের মন বুট আর বন্দুকে নয়, গণিতের রঙিন রহস্যের জগতে। যদিও সৈন্যবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু মাঝখানে সব ছেড়েছুড়ে একেবারে গলা ডুবিয়ে ঢুকে গেলেন গণিতচর্চায়। তাঁর শিক্ষক নির্বাচিত হলেন সে সময়কার অন্যতম বিখ্যাত গাণিতিক ইউহান বার্নুলি (১৬৬৭-১৭৪৮)। বার্নুলি তাঁর বড়ভাই জ্যাকব বার্নুলি (১৬৫৪-১৭০৫) ও ছেলে ড্যানিয়েল বার্নুলি (১৭০০-১৭৮২), এঁরা সবাই ইউরোপের সর্বোচ্চ মানের গাণিতিক ছিলেন। বার্নুলি পরিবারের নাম গণিতের নানা শাখাপ্রশাখায় রীতিমতো কিংবদ​ন্তীয়।
যা-ই হোক, লোপিতাল সাহেবের শিক্ষক সে সময়কার অত্যাধুনিক গণিত, অর্থাৎ নিউটন ও লাইবনিৎসের কলনশাস্ত্র খুব ভালো করেই আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। এমনকি ওসব বিষয় নিয়ে তিনি নিজেই অনেক চিন্তাভাবনা করে কিছু মৌলিক কাজ করেও ফেলেছিলেন, যার মধ্যে এই লোপিতাল সূত্রটি ছিল অন্যতম। প্রশ্ন হলো, সেটা বার্নুলি সূত্র না হয়ে লোপিতাল সূত্র হয়ে গেল কেমন করে? উত্তর—দারিদ্র্য। ইউহান বার্নুলি লোপিতালের মতো বড়লোকের ছেলে ছিলেন না। বড় কষ্ট করে তার জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। বর্তমান যুগের গৃহশিক্ষকদের মতো সেকালের গৃহশিক্ষকদেরও বলতে গেলে একই রকম সংগ্রামের জীবন ছিল। ইউহান বার্নুলি ছিলেন সে রকমই একজন সংগ্রামী শিক্ষক। তাঁর একটা খাতা ছিল যাতে অনেক মৌলিক গবেষণালব্ধ ফলাফল তিনি লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। টাকার অভাবে বা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় ভেবেও হয়তো সেগুলোর অধিকাংশই অপ্রকাশিত থেকে গিয়েছিল। ধনী ছাত্র লোপিতাল তখন এক অদ্ভুত প্রস্তাব করেন তাঁকে, ‘আপনার তো টাকার টানাটানি, স্যার, এক কাজ করুন, আপনার এই অঙ্কের খাতাটি আমার কাছে বিক্রি করে দিন, যা চান তা-ই দেব। শুধু আপনার আবিষ্কৃত ফলাফলগুলো আমার নিজের নামে প্রকাশ করার অধিকার দিতে হবে।’ বার্নুলি ভাবলেন, এমন আর কী? ভীষণ দামি কোনো কাজ তো আর নয়, ছাত্রের নামে বেরুলেই কী, আর আমার নিজের নামে বেরুলেই কি? তিনি সানন্দে বিক্রি করে ফেললেন তাঁর সেই আপাতমূল্যহীন (অথচ আসলে দারুণ মূল্যবান) সূত্রটির প্রণয়নস্বত্ব। কালে কালে যখন তাঁর খাতার সেই বিক্রীত সূত্র স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে প্রবেশ করতে শুরু করল, তখন বেচারি মাথায় হাত দিয়ে আফসোস করতে থাকলেন, হায় হায়, এ কী করলাম আমি! নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলাম! বিলম্বিত হলেও এর সংশোধন যে তিনি করার চেষ্টা করেননি, তা নয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। ততদিনে লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে লোপিতাল সূত্রের জাদুকরি শক্তির খবর। তবুও হয়তো জোর প্রচার চালাতে পারলে লোকে তাঁর কথা শুনতে চাইত, কিন্তু ভদ্রলোক নিজেই তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করে ফেলেছিলেন একবার তাঁর বড়ভাই জেকবের কাজ নিজের নামে চালাবার চেষ্টা করে।
গণিতের মতো এক গুরুগম্ভীর বিষয়ের জগতেও চাঞ্চল্যকর ঘটনা যে একেবারে ঘটে না, তা নয়। কারণ গণিতের লোকেরাও সাধারণ রক্তমাংস-অস্থিমজ্জার উপাদানেই তৈরি, অতএব সাধারণ মানুষের সাধারণ দুর্বলতাগুলো তাদের মাঝেও মাঝে মাঝে উঁকি দিতে পারে বইকি।

খরগোশ জাতির পরিবার পরিকল্পনা
দ্বাদশ শতাব্দীতে ইতালির পিসা শহরে গুগলিমা বোনাচি নামক এক প্রতিপত্তিশীল ব্যবসায়ী ছিলেন। ১১৭০ সালে তাঁর এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে, যার নামকরণ করা হয় লেনার্ডো প্যাসানো বিগলো। পরবর্তী সময় শিশুটির নাম পরিবর্তন হতে হতে শেষে লেনার্ডো ফিবুনাচিতে পরিণত হয়। ফিবুনাচির ‘বুনাচি’ অংশটুকু হয়তো বাবার নামের সঙ্গে খাপ খায় বলেই ইতিহাস এ-নামটিকে বাছাই করে নিয়েছে।
গুগলিমা বোনাচির ব্যবসা কেবল ইতালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলেও তাঁর বিস্তর ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও কর্মকাণ্ড ছিল। বিশেষ করে আলজিরিয়ার নিকটবর্তী শহর বুগিয়াতে। বালক ফিবুনাচি সুযোগ পেলেই বাবার সঙ্গে উত্তর আফ্রিকাতে বেড়াতে যেতেন। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটার অঙ্কের মাথা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সে সময় গণিতের জগতে সবচেয়ে উন্নত ও বিশ্বমাপের জ্ঞানসমৃদ্ধ সভ্যতা ছিল মুসলমানদের। বাগদাদ থেকে শুরু করে মিসর, মরক্কো, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া এলাকাটি জুড়ে। আরব পণ্ডিতেরা ভারতীয় সংখ্যালিখন পদ্ধতি পুরোপুরি আয়ত্ত করে তাঁদের গাণিতিক গবেষণাতে নতুন উত্তেজনা ও প্রাবল্য সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন। বোনাচি তার মেধাবী ছেলেকে উন্নত মানের গণিত শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার খাতিরে ফিবুনাচিকে উত্তর আফ্রিকায় রেখে ফিরে গেলেন পিসাতে। ফিবুনাচির কৌতূহলী মন সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে আরব গণিতের নতুনত্ব ও গভীরতার প্রতি। লেনার্ডো ফিবুনাচির গণিত শিক্ষার পুরোটাই বলতে গেলে আরব শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া। অধ্যয়ন পর্ব সমাপ্ত হলে ফিবুনাচি তাঁর জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজন সুপ্রতিষ্ঠ গাণিতিক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১২০২ খ্রিষ্টাব্দে, মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি Liber Abaci (গণনাগ্রন্থ) নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল আরবি-ভারতীয় সংখ্যা লিখন পদ্ধতিকে ইউরোপের গণিতামোদীদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। সেকালে ইউরোপে রোমান লিপি ব্যবহার করা হত (যেমন I, II, III, IV, V,) যা গণিত সাধনার পথে রীতিমতো বিরক্তিকর। সে তুলনায় আরবি-ভারতীয় লিখনপদ্ধতি (সেটা ইউরোপিয়ান গাণিতিকিদের কল্যাণে আরবি পদ্ধতি বলে পরিচিত হলেও আসলে যে এটি হিন্দু-আরবি পদ্ধতি নামেই পরিচিত হওয়া উচিত ছিল, সেদিকে কিছু কিছু সমসাময়িক ইউরোপিয়ান গণিতজ্ঞ মানুষের দৃষ্টি করবার চেষ্টা করছেন) যে কতখানি অগ্রসর ও উন্নত এবং তার সাহায্যে যে কত শক্ত শক্ত গাণিতিক সমস্যার সমাধান বের করা সম্ভব কত সহজে, সেটা দেখাতে গিয়ে তিনি বেশ কটি উদাহরণ দাঁড় করিয়েছিলেন। তার একটি উদাহরণ আমাদের আজকের আলোচনার জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তার আগে আমার অগাণিতিক পাঠকদের কিঞ্চিৎ​ মানসিক প্রস্তুতি দরকার। ধরুন নিচের সংখ্যামালাটি:
১, ২, ৩, ৪, ৫
এতে একটা সহজ প্যাটার্ন বা ধারাবাহিকতা আছে, তা-ই না? আপনি অনায়সে বলে দিতে পারবেন পরের সংখ্যাটি কী?—৬, তার পরেরটি ৭ ইত্যাদি। এগুলোকে গণিতের ভাষায় বলা হয় ন্যাচারাল নাম্বার বা প্রাকৃতিক সংখ্যা। মানবসভ্যতার প্রাচীনতম আবিষ্কারগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম, যদিও ঠিক এ রকম নিখুঁত সাংকেতিক ভাষায় ব্যক্ত করার পদ্ধতি আমরা শিখেছিলাম মূলত ভারত উপমহাদেশের আর্য শিক্ষকদের কাছে। সেটা অপেক্ষেকৃত আধুনিক।
এবার ধরুন আরেকটি সংখ্যামালা:
০, ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪
অনুমান করতে পারেন ৩৪-এর পরের সংখ্যাটি কী হবে? না, এত সহজ নয়। অন্তত আগেরটির মতো সহজ তো নয়ই। তবে এটা অসাধ্যও কিছু নয়। একটু ভাবতে হবে, এই যা। খেয়াল করে দেখুন, বাম থেকে ডানে যেতে সংখ্যাগুলোর মধ্যে কোনো সম্পর্ক খুঁজে পান কি না। প্রথমে হয়তো চোখে পড়বে না। তারপর একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে হয়তো হঠাৎ করেই চোখে পড়বে, ওমা! তাই তো, তৃতীয় সংখ্যাটি প্রথম দুটির যোগফল, চতুর্থটি দ্বিতীয় ও তৃতীয়টির যোগফল, পঞ্চমটি তৃতীয় ও চতুর্থটির যোগফল। এভাবে এগুতে থাকলে আপনি ঠিকই ধরে ফেলতে পারবেন ব্যাপারটা। তখন আপনি নিজেই গড়গড় করে বলে দিতে পারবেন পরের সংখ্যাগুলি একের পর এক।
কৌতূহলী মন তখন জিজ্ঞেস করবে, বেশ তো, ধাঁধা ভাঙা হলো, কিন্তু দুনিয়ার আর সব সংখ্যামালা ছেড়ে ফিবুনাচি একেই বাছাই করলেন কেন?
কারণ আছে। খরগোশজাতির বংশবৃদ্ধি হয় কীভাবে? ফিবুনাচি খরগোশদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ আলোচনা না করে নিজে থেকেই একটা মডেল তৈরি করে নিলেন। সেটা যে কত অবাস্তব, নিচের বর্ণনা থেকেই পাঠক তা টের পেয়ে যাবেন। ধরুন এক কৃষকের শখ হলো

ফিবুনাচি
ফিবুনাচি

তিনি খরগোশের ব্যবসা করবেন। বাজারে গেলেন এক জোড়া খরগোশ কিনে আনার জন্য। অর্থাৎ বাজারে যাওয়ার সময় তার হাতে ছিল ০-সংখ্যক খরগোশ। বাজার থেকে ফেরার পর হলো ১ জোড়া খরগোশ। গোনার সুবিধার জন্যে ধরা যাক সেটা ঘটে মাসের ঠিক প্রথম দিনটিতে এবং খরগোশ জাতির প্রজননরীতি অনুযায়ী ওদের প্রসবক্ষম হতে পাকা দুমাস লেগে যায়। তাহলে দ্বিতীয় মাসের এক তারিখে সেই খরগোশ জোড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি না হয়ে ১-ই রয়ে গেল। এতে করে আমরা মোট তিনটে সংখ্যা পেলাম: ০, ১,১ । দ্বিতীয় মাসের প্রথমে একজোড়া নবজাত খরগোশ এল কৃষকের বাড়িতে। এবার সংখ্যাটি দাঁড়ালো ২-তে। তৃতীয় মাসের প্রথমে দ্বিতীয় জোড়াটি প্রসবক্ষম হয়ে ওঠেনি, কিন্তু প্রথম জোড়াটি আবারো এক জোড়া সন্তান প্রসব করল। তাহলে তৃতীয় মাসের গোড়াতে মোট কয় জোড়া খরগোশ পাওয়া গেল? ৩। ঠিক একই নিয়মে গুণতে থাকলে আপনি পাবেন, প্রথমে ৫, তারপর ৮, তারপর ১৩, ...। আগের পৃষ্ঠাতে যে দুটি রাশি দেওয়া হলো তার দ্বিতীয়টির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। হুবহু এক। এই সংখ্যামালাকেই বলা হয় ফিবুনাচি রাশি (Fibonacci Sequence, or, Fibonacci Numbers)। রাশিটি এত বিখ্যাত যে ৮০০ বছর পর লোকে এখনো এটা নিয়ে আলোচনা করে, প্রয়োজনে ব্যবহারও করে অনেক জায়গায়। ফিবুনাচি সাহেব যে এ ছাড়া আর কোনো কাজ করেননি, তা নয়। কিন্তু লোকে ওসব কিছুই মনে রাখেনি, কেবল এটিকে নিয়েই বোধ হয় চিরকালই বলাবলি করবে। কিন্তু কেন? সবাই জানে, খরগোশ জাতি কখনোই এভাবে বংশবৃদ্ধি করে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন এটা টিকে থাকল এতকাল?
তার কারণ, খরগোশদের কথা বলতে গিয়ে ফিবুনাচি সাহেব, সম্ভবত নিজের অজান্তে, প্রকৃতিরই একটা গূঢ় প্রজননরহস্য আবিষ্কার করে ফেলেছেন। সে প্রসংগ নিয়ে আলাপ করার আগে আমার আজকের নিবন্ধের মূল বিষয়টির একটু আভাস দেওয়া যাক।
বড় প্রশ্ন!
‘ফিবুনাচি সংখ্যামালা’ কী সত্যি সত্যি ফিবুনাচিরই আবিষ্কার? না, তিনিই প্রথম সূচনা করেছিলেন একে গুণীজনদের কাছে?
আমি তা-ই জানতাম। আমরা সবাই তা জানতাম। গণিতশাস্ত্রের সঙ্গে জড়িত এমন কাউকে হয়তো পাওয়া যাবে না পৃথিবীতে, যিনি দ্বিমত পোষণ করবেন এর সঙ্গে। একদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় অফিসের কফিরুমে বসে এক সহকর্মী বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছিলাম কফি খেতে খেতে। কথা উঠল ফিবুনাচি সংখ্যা নিয়ে। বন্ধুটি গণিতের বীজগণিত শাখার একজন বিশ্বমাপের পণ্ডিত। হেসে বললেন, ‘আরে কিসের ফিবুনাচি। তার বহু আগেই ভারতীয় গাণিতিকরা করে গেছেন সেটা।’ বন্ধুটি চেকোস্লোভাকিয়ার অভিবাসী, আমারই মতো দীর্ঘকাল কানাডায়। তিনি একজন ইউরোপিয়ানকে ইতিহাসের পাতা থেকে সরিয়ে ভারতের এক হিন্দু গাণিতিককে বসিয়ে দেবেন, সেটা একটু আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে আমাদের কাছে, কিন্তু আসলে জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতে এই সততাটুকু কাম্যই কেবল নয়, সচরাচর তা-ই দেখা যায়। ওর কাছ থেকে এর সূত্র কোথায়, তার খবর নিয়ে আমি ইন্টারনেট থেকে পেলাম পরমানন্দ সিংহ নামক এক গাণিতিকের লেখা নিবন্ধ, যার শিরোনাম The so-called Fibonacci Numbers in Ancient and Medieval India. প্রকাশকাল ও অন্যান্য তথ্য: ১৯৮৫, Historia Mathematica, 12, pp ২২৯-২৪৪.
লেখাটির ভূমিকাতে তিনি তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়টি মোট পাঁচটি ভাষায় ব্যক্ত করেছেন—ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, হিন্দি ও বাংলা। তাঁর বাংলা অনুবাদটি আমি এখানে হুবহু তুলে দিচ্ছ:
‘এল ফিবুনাচির (১২০২ খৃষ্টাব্দ) পূর্বে বিরহাঙ্ক (খৃঃ ৫০০-খৃঃ ৬০০ এর মধ্যে), গোপাল (১১৩৫ খৃষ্টাব্দের আগে), এবং হেমচন্দ্রের (১১৫০ খৃষ্টাব্দের নিকট) সকলেই তথাকথিত ফিবুনাচি সংখ্যা এবং তার নির্মাণবিধির বর্ণনা করে গেছেন। নারায়ণ পণ্ডিত (১৩৫৬ খৃষ্টাব্দ) সামাসিক পংক্তি, যার এক বিশেষ রূপ হচ্ছে ফিবুনাচি সংখ্যা এবং বহুপদী গুণকের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন।
‘বিরহাঙ্ক বাবু ছিলেন সংস্কৃত কাব্যের ছন্দজ্ঞান বিশেষজ্ঞ, যা আমি নই। বরং খোলাশা করে বলা যায়, সংস্কৃত বা যে-কোনো ভাষার কাব্যরচনা বিধি বিষয়টিতে আমি রীতিমতো গণ্ডমূর্খ। অতএব নিচে যে আলোচনাটুকু নিবেদন করছি পাঠকের সুবিধা হবে ভেবে, তাতে যদি সুবিধার পরিবর্তে আরও ধাঁধার ভেতরে পড়ে যান পাঠক তাহলে আমাকে ক্ষমা করতে হবে।
‘পরমানন্দ মহাশয়ের ভূমিকা অনুযায়ী সংস্কৃত কাব্যে ছন্দের একমাত্রিক ধ্বনি বা স্বরকে (Szllable) বলা হয় ‘লঘু’, আর দ্বিমাত্রিক ধ্বনিকে বলা হয় ‘গুরু’ । ধরা হোক যে প্রথমটির ওজন ১, আর দ্বিতীয়টির ২। লেখক বলছেন যে সংস্কৃত আর প্রাকৃত কাব্যে তিন প্রকারের ছন্দরীতি: এক. বর্ণবৃত্ত, যাতে অক্ষরসংখ্যা বদলাবে না, তবে ধ্বনিসংখ্যা বাড়বে। দুই. মাত্রাবৃত্ত, যেখানে ধ্বনিসংখ্যা অপরিবর্তিত, তবে অক্ষরসংখ্যা বদলাতে পারবে। তিন. গণ বা গুচ্ছবৃত্ত, যেখানে একই গুচ্ছের ভেতর প্রথম বা দ্বিতীয়টির বৈশিষ্ট্য বজায় থাকবে, তবে গুচ্ছে গুচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ থাকা সম্ভব। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্যে দ্বিতীয়টিরই গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এখানে তৃতীয়টি একেবারেই নিষ্প্রয়োজন বলে এর আলোচনা স্থগিত রাখব। এটা গণিতের বিষয় তত না, যতটা ছন্দবিন্যাসের।
প্রথমটির উদাহরণ:
এক অক্ষর: ল (লঘু) বা গ (গুরু)। মোট সংখ্যা ২ =২
দুই অক্ষর: লল, লঘ, ঘঘ, ঘল। মোট সংখ্যা ৪ =২ +২
তিন অক্ষর: ললল, লগল, ললগ, লগগ, গগগ, গগল, গলগ, গগগ। মোট সংখ্যা ৮=২+২+২
সজাগ পাঠকের কাছে ধারাটি বেশ পরিষ্কারভাবেই ফুটে উঠেছে, তাই না? এখন যে কেউ বলে দিতে পারবে হ অক্ষরবিশিষ্ট লাইনের মোট কটি সংখ্যা দাঁড়াবে: ২ কে হ বার ২ দিয়েই গুণ করলে যা পাওয়া যায়। অর্থাৎ ৪ অক্ষর হলে ১৬ বার, ৫ হলে ৩২ বার, ... এভাবে চলবে।
২, ৪, ৮, ১৬, ...এই সংখ্যামালাটি যে ফিবুনাচি রাশির সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কহীন, সেটা স্পষ্ট। তবে এটা যে গণিতে অন্য কোনো শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন, তা কিন্তু মোটেও নয়। যেমন, একটা মুদ্রা একবার ছুড়লে হয় মাথা আসবে, নয় লেজ আসবে, অর্থাৎ ২টি সম্ভাব্য ফলাফল। দুই বার ছুড়লে ২+২ =৪টি, তিন বার ছুড়লে ২+২+২=৮টি, ...অবিকল ওপরের উদাহরণটির মতো। এই মুদ্রা নিক্ষেপের উদাহরণটি কিন্তু কোনো ছেলেখেলা নয়, পরিসংখ্যান-শাস্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মডেল একটি। অতএব ছন্দব্যাকরণের সঙ্গে গণিতের একাধিক শাখার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যা-ই হোক, বর্তমান নিবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বর্ণবৃত্তের আলোচনাতে এখানেই যতি টানব।
দ্বিতীয়টির উদাহরণ
এক অক্ষর: ল (গ সম্ভব নয়, কারণ গ-তে দুই মাত্রা)-মোট সংখ্যা ১
দুই অক্ষর: লল, গ-মোট সংখ্যা ২
তিন অক্ষর: ললল, লগ, গল-মোট সংখ্যা ৩
চার অক্ষর: লললল, লগল, ললগ, গলল, গগ-মোট সংখ্যা ৫
পাঁচ অক্ষর: ললললল, লললগ, ললগল, লগলল, গললল, গলগ, গগল, লগগ-মোট সংখ্যা ৮
নিয়মটা নিশ্চয়ই বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠছে? এবং এটাও নিশ্চয়ই প্রতীয়মান হয়ে উঠছে যে ডানদিকের সংখ্যাগুলোকে পাশাপাশি দাঁড় করালে দেখা যাবে এরা সেই ফিবুনাচি রাশি: ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ...
‘তার অর্থ কবিতার মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সঙ্গে গণিতের ফিবুনাচি রাশি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু এই সম্পর্কটি অত্যন্ত সরাসরি এবং বিরহাঙ্ক বাবু ফিবুনাচি থেকে অন্তত ৬০০ বছর আগে এটি আবিষ্কার করেছিলেন, সেহেতু আমার মনে হয় ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের কথা ভেবে এই গুরুত্বপূর্ণ রাশিটিকে এখন থেকে বিরহাঙ্ক-ফিবুনাচি রাশি বলে অভিহিত করা উচিত।’
আশা করি আমার পাঠকদের কেউই ভাববেন না যে ফিবুনাচি সাহেব জেনেশুনেই বিরহাঙ্কের নামটি চেপে গিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন। না, আমার মনে হয় না যে লোকটা ও রকম অসাধু ছিলেন। যদি হতেন তাহলে তিনি কেন গায়ে পড়ে ভারতীয় গণিত প্রচার করার উদ্দেশ্য নিয়ে রীতমতো একটা বই লিখে ফেলবেন? শুধু তা-ই নয়, রাশিটি যে ফিবুনাচির নামে ভূষিত হয়ে গেছে সেটা কিন্তু তিনি নিজে করেননি, নামকরণটি করেছিলেন এডওয়ার্ড লুকাস (১৮৪২-১৮৯১) নামের এক অনতিবিখ্যাত গাণিতিক ফিবুনাচির মৃত্যুর প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর পর। না, এটা চোর্যবৃত্তির ব্যাপার নিশ্চয়ই নয়, নেহাৎ না জানার বিষয়। (আগামী পর্বে সমাপ্য)
মীজান রহমান
অটোয়া, কানাডা