আগামীকাল বাবা দিবস। এবারের ছুটির দিনে সাজানো হয়েছে বাবাকে নিয়ে সন্তানের লেখায়। তাঁদের কেউ স্মৃতিচারণা করেছেন ছোটবেলায় হারানো বাবার, কেউবা লিখেছেন বাবার সাহসে এগিয়ে চলার কথা

আমার যে সময় থেকে স্মৃতির শুরু, তখন বছর ঘুরে রমজানের ঈদ হতো শীতকালে। আমাদের জন্য আম্মার নিজের হাতে তৈরি নতুন জামা ছিল এককথায় অনন্য ভালো লাগা। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ঈদের জন্য প্রতীক্ষার অবসান। আমাদের ছোট বোন তখন খুব ছোট। তাই আমি আর রিপি ঈদের আনন্দ মেখে ঘুরে বেড়াতাম সম-অসম বয়সী বন্ধুদের নিয়ে আমাদের ধানমন্ডির বাড়ির আশপাশের বাড়িগুলোতে। সবাই আমাদের খুব আদর করতেন।
প্রায় সবার বাড়িতে বাবা নামের একজন মানুষের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু আমাদের তেমনটি হওয়ার সুযোগ ছিল না। দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা আমাদের বাবা তখন কারাগারে বন্দী।
ময়মনসিংহ কারাগার ঢাকার বাইরে আমার প্রথম ‘বিশ্বভ্রমণ’। বাবার সঙ্গে ময়মনসিংহ কারাগারে দেখা করতে যাওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে ঈদের মতো এক অনুভূতি কাজ করত আমার ভেতরে। ঈদ-ঈদ একটা ভাব থাকত মনে। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। ট্রেন ধরতে হবে। আগের রাতে সেমাই-জর্দার বদলে আম্মা রান্না করতেন বাবার জন্য কোনো খাবার। এভাবেই আমার বাবাকে ঘিরে ঈদের মতো আনন্দের কয়েকটি বছর কেটে যায়।
একবার ময়মনসিংহ কারাগারে আমরা বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। বসে আছি নির্দিষ্ট ঘরে, বাবার অপেক্ষায়। হাসিমাখা মুখে বাবা আমাদের সামনে এলেন। তাঁর হাতে ছিল ছোট্ট টিনের কৌটায় সবুজ-সতেজ একটি ডালিমগাছের চারা। বাবার কাছ থেকে সেই ডালিমগাছটি পাওয়া ছিল আমার প্রথম উপহার। আমি সেই ডালিমগাছটিকে যত্ন করে মাটিতে লাগিয়েছিলাম। প্রতিদিন পানি দিতাম। আগাছা পরিষ্কার করতাম নিজের হাতে। ডালিমগাছ বাড়তে থাকে। সময় এগিয়ে যেতে থাকে সামনের দিকে। ডালিমগাছে ফুল আসে। শাখায় শাখায় কচি ডালিমের উঁকিঝুঁকি। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ ১৯৭১। আমাদের বাড়িটা পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দখল করে নেয়। ইটের দালান শুধু থাকে। দরজা-জানালা ভেঙেচুরে ভেতরের সব জিনিসপত্র নিলাম করে দেয় একসময়। আম্মার হাতের সাজানো বাগান, লতানো বেলি, ঝাউসহ আরও কত বাহারি পাতা, সুগন্ধি লেবুগাছ। বাবার লাগানো দোলনচাঁপা-গন্ধরাজ। আমার সেই ডালিমগাছ— সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
আরেকবার আমাকে আর রিপিকে (শারমিন আহমদ) অবাক করে দিয়ে ময়মনসিংহ জেল কর্তৃপক্ষ ভেতরে নিয়ে গেল। বিশাল সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে নতুন এক জগৎ। আমরা যেমন অবাক, বিস্মিত তেমনি—ভেতরের বন্দিজীবনে আমাদের দুজনের উপস্থিতি ছিল যেন কিছু সময়ের জন্য বয়ে যাওয়া স্নিগ্ধ বাতাস। আমাদের ঘিরে সবার আনন্দ-জটলা। বাবা যেখানে থাকতেন, সেই সেল বা ঘরটি ছিল হাসপাতালের ওয়ার্ডের মতো বড়। যার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে লোহার তৈরি বিছানা পাতা। এর বাইরে দুই পাশে ফুলের বাগান। জেনেছিলাম, বাবার হাতে গড়া এই বাগান। ধবধবে সাদা একটি কাকাতুয়া পাখিও পেয়েছি সেখানে। নিজেই সে একদিন উড়ে এসে স্থান করে নিয়েছে এই বন্দীদের মাঝে।
’৭০ সালের কোনো এক সন্ধ্যায় বাবা আমাদের দুই বোনকে ডেকে হাতে তুলে দিয়েছিলেন দুটি কলম আর কালির দোয়াত। বাবা তখন ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। তিনি জনগণের। আমরা সেভাবেই বুঝতে শিখেছি। এরই মধ্যে হঠাৎ কোনো দিন হয়তো রিপি আর আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলে যেতেন নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে। কিংবা বাংলাবাজারের বিশাল বইয়ের রাজ্যে। কয়েকবার গিয়েছি স্টেডিয়ামের প্রভিনশিয়াল বুক ডিপোতে। আমরা দুই বোন অসংখ্য বইয়ের মধ্যে খুঁজতে থাকতাম আমাদের পছন্দের বই। বাবাকে দেখতাম নানা রকম মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন হয়তো ভেতরে বা বাইরে দাঁড়িয়ে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শুরুতে বাবা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যুদ্ধ চলাকালে তিনি পারিবারিক জীবন যাপন করবেন না। তিনি অক্ষরে অক্ষরে তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেছিলেন। তাঁর ভাবনায় ছিল বাংলাদেশের সেই সব মানুষের কথা, যাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম বর্বরতায় সহায়-সম্বলহীন, আতঙ্কিত-দিশেহারা, কেউবা আত্মীয়স্বজন ফেলে ভাসমান। মৃত্যু যাঁদের মাথার ওপর প্রতিমুহূর্তে দণ্ডায়মান। যাঁরা দেশের জন্য লড়াই করছেন জীবন বাজি রেখে। সেই যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রী তিনি, কী করে তিনি পারিবারিক জীবন যাপন করেন?
মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই রোজার ঈদে বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বিভিন্ন ক্যাম্পে ছিলেন শুনেছিলাম। বাবার মৃত্যুর ২৫ বছর পর ২০০০ সালে জানতে পারি, বাবা সেই ঈদে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একই পাতে খেয়েছেন, বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে সাহস জুগিয়েছেন। তিনি দেখতে গিয়েছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের। যাঁদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এম এ তাহের (পরে কর্নেল তাহের) এবং মুক্তিযোদ্ধা সেই সময় ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান (পরে সেনাপ্রধান)। সেই ক্যাম্প হাসপাতালের বিছানায় বসা ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজ এবং পাশে দাঁড়ানো আমার বাবা প্রধানমন্ত্রীর একটি ছবি মিসেস মুস্তাফিজের সৌজন্যে আমি পেয়ে যাই।
আরেকটি রোজার ঈদের কথা খুব মনে আছে। আমার তখন মাত্র ১২ বছর বয়স। গুরুতর অসুস্থ আমার মেজ কাকুকে নিয়ে আম্মা দেশের বাইরে। বাসার সব দায়িত্ব পালন করেছি আমি নিশ্চিন্ত-নির্দ্বিধায়। এখনো ভাবলে আনন্দে চোখ ভেসে যায়—বাবার কত বেশি ভরসা ছিল ওইটুকু আমার ওপর। দৈনন্দিন সব খরচের দায়িত্ব ছিল আমার। এখনো মনে আছে, ঈদের দুই দিন আগে দাম বেড়ে যাওয়ায় কারওয়ান বাজার থেকে একেকটা মুরগি কেনা হয়েছিল পাঁচ টাকা করে। ঈদের আগে বাবা বললেন, ‘দেখিস, সেমাইটা যেন তোর মায়ের মতো হয়।’ আম্মা অসাধারণ রান্না করতেন। তাঁর হাতে ছিল যেন জাদুকরি স্পর্শ। বাবার ওই একটি কথায় যেমন ছিল ভরসা, তেমনি ছিল দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার মতো একটি বিষয়। আমি পেরে ফেললাম এবং খুব সুন্দরভাবে।
আমার বড় বোন রিপি, আমার দেড় বছরের বড়। ’৭৪-এ একদিন শাড়ি পরে হাঁটছিল বারান্দায়। বাবা পেছন থেকে দেখে আম্মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, মেয়েটি কে? রিপিকে দেখে বলেছিলেন, ‘মেয়েটি কবে বড় হলো, বুঝতেও পারলাম না।’
বাবাকে আমরা কাছে পেয়েছি খুব কম সময়ের জন্য। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, নির্ভরশীল বন্ধু। বাবার সঙ্গে আমাদের চার ভাইবোনের নানা সময়ের স্মৃতি, যা পথনির্দেশক, আলোকিত সঞ্চয়। আমার ছোট বোন মিমির (মাহজাবিন আহমদ) হাতের লেখা তার শিশু বয়স থেকেই পরিপক্ব সুন্দর, এই নিয়ে বাবার অনুভূতি ছিল আনন্দের। এমনকি আমাদের সবচেয়ে ছোট ভাই সোহেল (সোহেল তাজ) ’৭৫-এ যার বয়স মাত্র পাঁচ-সাড়ে পাঁচ বছর, তার কাছেও সঞ্চিত আছে বাবার দিকনির্দেশনা। এক দুপুরে মাছ দিয়ে ভাত খেতে চাইছিল না সোহেল। সেই ছোট সোহেলকে বাবা আদর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই দেশের কোটি কোটি দুঃখী মানুষের কথা, যাদের অনেকেই মাছ তো দূরে থাক, ভাতও পায় না তখন তিন বেলা।

বাবার জীবনের সব শেষ ঈদ যখন এল, বাবা তখন জেলখানায়। জীবনের প্রথম স্মৃতির ঈদগুলো যেমন ছিল ময়মনসিংহ কারাগার ঘিরে, এবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। অমাবস্যার নিকষ কালো আঁধারে ঘেরা পুরো সময়টা। সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে। অনিশ্চিত, অনিঃশেষ যাত্রা। বুলেটের আঘাতে বাবার শরীর বিদীর্ণ হয়। শরীরের মৃত্যু হয়। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ আলোকিত হন তাঁর রেখে যাওয়া কর্মদ্যুতিতে আরও উজ্জ্বল প্রকাশে।
আমি প্রায়ই ভাবি, মানুষভেদে জীবনের উপলব্ধি, বাস্তবতা কত ভিন্ন আর বিচিত্র। ’৭১-এর যুদ্ধদিনে তৃষ্ণায় কাতর যে দশ বছরের শিশু নদীর জলে তৃষ্ণা মেটায়, পরক্ষণেই জলে ভেসে যায় মানুষের রক্তাক্ত লাশ। জীবনজিজ্ঞাসায় সে আর শিশু থাকে না। ন্যায্যতা, মানবতার আদর্শ তখন ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে ভেতরে। আবার এর মাত্র চার বছর পরই ’৭৫-এর প্রচণ্ড ওলটপালট। ছোটবেলা আবারও বিলীন হয়ে যায় অনন্ত প্রশ্নে। ভেতরের যে উপলব্ধির মশাল, তাকে বহন করা জীবন এবং সময়ের বাস্তবতায় প্রতিনিয়ত বেমানান মনে হয়। সে গল্প আজ নয়, অন্য কোনো দিন।
লেখক: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ও সমাজকর্মী