বেঁচে ফিরেছি!

পদ্মা নদীতে এখন যেন কান্নার ঢেউ। পদ্মাপাড়ে স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি। ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাটের কাছে পদ্মা নদীতে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় পিনাক-৬ লঞ্চ।৭ আগস্ট এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মৃতদেহ পাওয়া গেছে ৩৩ জনের। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরেছেন যাঁরা, তাঁরা নেহাতই ভাগ্যবান। অনেকেই লঞ্চে উঠেছিলেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে।নিজে বেঁচে গেছেন কিন্তু হারিয়েছেন পরিবারের অন্যদের।শুনুন লঞ্চ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরে আসা কয়েকজনের কাহিনি।

.
.
আলী জব্বার ও তাঁর ছেলে আনোয়ার হোসেন
আলী জব্বার ও তাঁর ছেলে আনোয়ার হোসেন

মুহূর্তেই লঞ্চে হাঁটুপানি জমে যায়
আলী জব্বার
‘লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সময় আমি নদীতে ঝাঁপ দিই। তখন কে কোথায় বলতে পারব না। ঝাঁপ দেওয়ার পরই নদীর পানিতে ভাসতে থাকি। বড় বড় ঢেউ আর প্রচণ্ড স্রোতের কারণে ভেসে থাকাটাই কষ্টকর। চারদিকে তখন বাঁচাও বাঁচাও আর্তচিৎকার। কিছুক্ষণ পরেই দেখি অনেকগুলো স্পিডবোট আমাদের দিকে ছুটে আসছে। একটা স্পিডবোটে আমাকে টেনে তুলে নেওয়া হয়। আমি বেঁচে গেলাম।’ পিনাক-৬ লঞ্চের যাত্রী আলী জব্বার এভাবেই জানালেন তাঁর বেঁচে ফিরে আসার কথা।
মাওয়া ঘাটের কাছেই পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমএল পিনাক-৬-এ যাত্রী ছিলেন শ্রমজীবী আলী জব্বার, তাঁর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ছেলে আনোয়ার হোসেন। বাবা আর ছেলে বেঁচে আছেন, তবে জব্বারের স্ত্রী ও দুই মেয়ে এখনো নিখোঁজ।
তাঁরা থাকেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নে। শরীয়তপুরের জাজিরায় সপরিবারে গিয়েছিলেন এক আত্মীয়র বিয়ের অনুষ্ঠানে। ‘লঞ্চটি কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে সকাল সাড়ে নয়টায় ছেড়ে আসে। যেখানে লঞ্চটি ডুবেছে, সেখানে ছিল প্রচণ্ড ঢেউ। ঢেউ দেখে আমি স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েদের নিয়ে লঞ্চের নিচতলা থেকে ওপরে উঠতে চাই। কিন্তু লঞ্চের লোকেরা বাধা দেয়। তার পরও আমি দুই মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে আসি। মেয়েদের পাশে রেখে আমি লঞ্চের সামনের অংশে দাঁড়াই। তখন সারেং দেখতে সমস্যা হচ্ছে বলে আমাকে সরে যেতে বলেন। আমি সরে পাশে গিয়ে দাঁড়াই। এ সময় দেখি বড় বড় ঢেউ এসে পেছনের অংশের ডান দিকে আছড়ে পড়ছে আর সেদিক দিয়ে পানি ঢুকছে। মুহূর্তের মধ্যেই লঞ্চে হাঁটুপানি জমে যায়।’
এরপরই আলী জব্বার দেখেন লঞ্চটি ডান দিকে কাত হয়ে যাচ্ছে। লঞ্চে মানুষের চিৎকার আর হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। আলী জব্বার বলতে থাকেন—যাত্রীরা তখন বাঁ দিকে চাপলে পানিও বাঁ দিকে চলে যায়, লঞ্চটি কাত হয়ে ডুবে যেতে থাকে।
লঞ্চটা যখন ডুবছিল, আলী জব্বারের ১৮ বছরের ছেলে আনোয়ার হোসেন তখন তাঁর মাকে বের করে আনতে নিচের ডেকে চলে যান। ‘কিন্তু ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে পানির তোড়ে আমি লঞ্চের সামনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আমার মা আর বেরোতে পারেননি।’ আনোয়ার নদীতে ভাসতে থাকেন। এর কয়েক মিনিট পড়েই একটি ফেরি আসে। আনোয়ারকে উদ্ধার করে।
নিজের মাকে বের করে আনতে পারেননি আনোয়ার, কিন্তু বাঁচিয়েছেন অচেনা দুজনকে। চোখের জল মুছতে মুছতে বলতে থাকেন, ‘ফেরিতে ওঠার পরে দেখি একজন মহিলা পানিতে ভাসছেন। আমি ফেরি থেকে লাফ দিয়ে পড়ে তাঁকে তুলে
নিয়ে আসি। সিনেমায় দেখেছি পানিতে ডুবে গিয়ে জ্ঞান হারালে কীভাবে পেটে চাপ দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়। সেই কথা মনে পড়ায় জ্ঞান হারানো মহিলার পেটে চাপ দিয়ে পানি বের করি।’ এরপর আনোয়ার দেখেন ফেরির কাছেই একজন বৃদ্ধ মানুষ পানিতে ভেসে যাচ্ছেন। ফেরি থেকেই তাঁকে টেনে তোলেন।

রিনা রহমান
রিনা রহমান

জেগে দেখি আমি ঘাটের কাছে
রিনা রহমান
পরিবারের সবাইকে হারিয়ে বেঁচে আছেন বরিশালের উজিরপুরের রিনা রহমান (৩৫)। পিনাক-৬ লঞ্চ দুর্ঘটনায় রিনার স্বামী, দুই মেয়ে ও ছেলে নিখোঁজ।
ঢাকার গাজীপুরে বর্তমানে থাকেন রিনা রহমান। ঈদের ছুটিতে গিয়েছিলেন বাড়ি। সবাইকে হারিয়ে নিজের বেঁচে থাকার কথা জানান রিনা, ‘লঞ্চ যখন ডুবে যাচ্ছিল, দুই মেয়েকে তাদের বাবা ধরে রেখেছিলেন। আমি আমার ছেলে ইমতিয়াজকে বুকের মধ্যে ধরে রেখেছিলাম। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পরে ঢেউ ও স্রোতের তোড়ে ইমতিয়াজ আমার দুই হাত থেকে ছুটে যায়। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জেগে দেখি আমাকে ঘাটের কাছে একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হয়েছে।’
রিনার স্বামী গাড়িচালক মিজানুর রহমান, দুই মেয়ে গাজীপুর মহিলা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী আমিনা রহমান ও আরফিন রহমান এবং ছেলে ইমতিয়াজ রহমান পড়ত গাজীপুরের শাহীন স্কুলে।

সৈয়দ মো. সাদী
সৈয়দ মো. সাদী

হঠাৎ আমি ভেসে উঠি পানির ওপরে 
সৈয়দ মো. সাদী
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার কসবাঘট্টিতে বাড়ি সৈয়দ মো. সাদীর। কাজ করেন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন ঢাকায়। পিনাক-৬ লঞ্চে তাঁর সঙ্গে পুরো পরিবারই ছিল। জলের অতল থেকে ফিরে এসেছেন সাদী, কিন্তু তাঁর স্ত্রী শেফালী ও দুই শিশুসন্তান আরিফ ও এনাম নিখোঁজ এখনো। দুর্ঘটনার দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাওয়ায় পদ্মার তীরে সাদীর সঙ্গে কথা হয়। 

ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে থাকেন সাদী—‘মাওয়া ঘাট তখন আর প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে। প্রচণ্ড ঢেউয়ে লঞ্চটি দুলছিল। প্রথমে এক পাশে কাত হয়ে যায় সেটি। অন্যদিকে কাত হতেই ডুবে যেতে থাকে লঞ্চটি। ডুবে যাওয়ার সময় দুই হাতে দুই সন্তানকে ধরে রাখি। আর স্ত্রীকে বলি আমার প্যান্টের বেল্ট ধরে রাখতে।’ লঞ্চটি ডুবে উল্টে গেলে তিনি এর নিচে প্রায় ৩০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যান। একপর্যায়ে স্রোতের টানে সাদীর হাত থেকে ছুটে যায় তাঁর দুই ছেলে। ‘আমার প্যান্টের পেছনের পকেট ছিঁড়ে নিয়ে শেফালীও হারিয়ে যায়। হঠাৎ আমি ভেসে উঠি পানির ওপরে। একটা স্পিডবোট আমাকে তুলে নেয়। আমি বেঁচে যাই।’ 

লিখেছেন প্রথম আলোর মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি তানভীর হাসান ছবি: হাসান রাজা

মাওয়া ঘাটের কাছে পদ্মা নদীতে ডুবে যায় লঞ্চ এমএল পিনাক-৬। ছবি: মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিও থেকে সংগৃহীত
মাওয়া ঘাটের কাছে পদ্মা নদীতে ডুবে যায় লঞ্চ এমএল পিনাক-৬। ছবি: মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিও থেকে সংগৃহীত