বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা

সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

দেশে ৬৫ শতাংশের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নেয় বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে। চিকিৎসাসেবায় বড় অবদান রেখে চলেছে বেসরকারি খাত। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তিন ধরনের। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায়িক হাসপাতাল বা ক্লিনিক বা ডায়গনস্টিক সেন্টার। বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। এবং দেশি বা বিদেশি এনজিওচালিত প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই বেশি। চিকিৎসার পাশাপাশি মেডিকেল শিক্ষাতেও তারা বড় ভূমিকা রাখছে। এখন সরকারি মেডিকেল কলেজ যত রয়েছে, তার দ্বিগুণ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ।

স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৬৩% চিকিৎসা বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত প্রদান করছে। সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংকট, জনবলের অপ্রতুলতার কারণে মানুষের বেসরকারি হাসপাতালের প্রতি উৎসাহ বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা। কিন্তু অনেকগুলো মানসম্মত নয়। একদিকে যেমন পাঁচ তারকাবিশিষ্ট বিলাসবহুল হাসপাতাল রয়েছে, তেমনই রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের ক্লিনিক। বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা ৫১,৩১৬টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫,০৫৫টি, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৩। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১,১৬৯টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৪৩২টি (ঢাকায় ৩২২, ঢাকার বাইরে ১১০) আর বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৭৩৭টি (ঢাকা মহানগরে ৪৯৪, ঢাকা জেলায় ২৬৭, অন্যান্য জেলায় ২৪৩)। প্রায়ই অপেশাদার ক্লিনিকগুলোয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে সাময়িকভাবে মানুষ এ দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে ভুল বুঝছে এবং অভিযোগ করছে।

কিন্তু সুখবর হচ্ছে, উন্নত বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক চিকিৎসাসেবা বাংলাদেশে বিদ্যমান। হৃদ্‌রোগ চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন গর্ব করে। একসময় একটা এনজিওগ্রাম করার জন্য রোগীকে বিদেশে, কমপক্ষে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেতে হতো। আজ বাংলাদেশে ৫০টির বেশি কার্ডিয়াক সেন্টার রয়েছে এবং প্রতিবছর লাখ লাখ রোগী হৃদ্‌রোগের উন্নত ও সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেশেই নিচ্ছেন।

যথাসময়ে রোগী হাসপাতালে পৌঁছালে অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং গণমাধ্যমের ইতিবাচক সংবাদ প্রচার। আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা এখন শুধু হৃদ্‌রোগের সফল চিকিৎসা করেই থেমে নেই। কিডনি প্রতিস্থাপন, বোন অ্যান্ড জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট (হাঁটু এবং কোমরের হাড়), বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যানটেশন (অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন), ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজমেন্টে সমান পারদর্শিতার ছাপ রেখেছেন এ দেশের মেধাবী চিকিৎসক ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ায় প্রতিবছর প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। করোনা মহামারিতে এ দেশের চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল প্রমাণ করেছে, উন্নত চিকিৎসা প্রদান করতে বাংলাদেশ সক্ষম। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ দেশের চিকিৎসা খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বহু গুণে।

সারা পৃথিবীতে হেলথ ইনসুরেন্সের (স্বাস্থ্যবিমা) প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশে তা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেসব রোগী স্বাস্থ্যবিমার আওতায় চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাঁদের কোনো অভিযোগ নেই। তাই স্বাস্থ্যবিমা এখন সময়ের দাবি।

বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে সম্ভাবনা অনেক। সেগুলোকে যদি সুচিন্তিতভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে এ দেশ থেকে রোগীদের আর বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে হবে না। কিছু মানুষের বিদেশযাত্রা হয়তো কখনোই রোধ করা যাবে না, একসময় একজন ভালো ডাক্তারের চেম্বারে রোগী দেখালে মনে করা হতো, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, কিংবা একটা হাসপাতালে ভর্তি হলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। বিষয়টি অনেকাংশেই ঠিক নয়। প্রায়ই দেখা যায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক খুবই সাধারণ মানের ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ক্লিনিকে রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দিচ্ছেন। দৈবাৎ রোগী কঠিন অবস্থা ধারণ করলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে বলা হয়, উন্নত স্বাস্থ্যসেবার জন্য অন্য হাসপাতালে যেতে। রাস্তার তীব্র যানজট পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যখন হাসপাতালের গেটে আসে, অনেক সময় চিকিৎসক এসব রোগীকে মৃত পান (Brought Dead), অর্থাৎ রোগী সার্বক্ষণিক ক্রিটিক্যাল কেয়ারের চিকিৎসা না পেয়ে বিনা চিকিৎসায় পথেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজন সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন। স্বাস্থ্য খাতকে সেবা খাত বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এর কোনো সুফলই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান পায় না।

পৃথিবীর সব দেশে স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে রাষ্ট্রের স্পেশাল চাইল্ড কিন্তু এ দেশে স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে ‘পথশিশু’। যার যখন খুশি, একে অবজ্ঞা করে চলেছে, ফলে এই খাতে বিনিয়োগের উৎসাহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এর থেকে সমাধানের অন্যতম উপায় হতে পারে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ)। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এই প্রতিষ্ঠান বেসরকারি উদ্যোক্তা/প্রতিষ্ঠানকে চাহিদা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যদি আর্থিক সহযোগিতা করে, তাহলে দ্রুত এসব প্রতিষ্ঠান স্বয়ংসম্পূর্ণরূপে (One Stop Service) জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় আরও পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে (তবে বেসরকারি ক্ষেত্রে অধিক) অযাচিত ব্যক্তির এবং গোষ্ঠীর অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ ও চিকিৎসাকার্যে বিঘ্ন সৃষ্টির কারণে প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনার পাশাপাশি মূল কাজ ব্যতিরেকে চিকিৎসক-নার্সসহ সেবাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্য কাজে সময় ব্যয় করতে হয়, যা অন্য কোনো পেশা বা খাতে বিরল। তাই সেবা খাতে সেবাদানে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ব্যক্তি/দল/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হতে হবে।

গত এক যুগে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী উন্নতি হয়েছে। সরকারি বড় বড় হাসপাতাল স্থাপন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংখ্যাবৃদ্ধিসহ বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ, রোগ নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ এককথায় চমকপ্রদ। এই ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ শর্তে অল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানসহ হেলথ ইনসুরেন্স।