মুক্তিযুদ্ধে উর্দু কবি

সালিক লখেনৗভি (১৬ ডিসেম্বর ১৯১৩—৪ জানুয়ারি ২০১৩)
সালিক লখেনৗভি (১৬ ডিসেম্বর ১৯১৩—৪ জানুয়ারি ২০১৩)

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকেরা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একাত্তরের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তাঁদের ভূমিকা ছিল অগ্রসৈনিকের। শুধু লেখালেখি নয়, তাঁরা রাজপথে মিটিং-মিছিল করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দেশের ভেতরে থেকে কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নিয়েছেন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাঁদের পক্ষে ভারতে যাওয়া সম্ভব হয়, তাঁরাও সেখানে গিয়ে বিভিন্নভাবে সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের কবি-লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে তখন যোগ দেন ভারতের বাঙালি কবি-সাহিত্যিকেরা। তাঁরা বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বরতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।
কলকাতার উর্দুভাষী কবি-সাহিত্যিকেরা অনেকেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাসীদের সঙ্গে সংহতি জানাতে এগিয়ে আসেননি। তবে কেউই আসেননি তা নয়। কেউ কেউ শুরু থেকেই বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন কবি ও সাংবাদিক সালিক লখেনৗভি।
এপ্রিলে প্রবাসী সরকার গঠিত হওয়ার কয়েকদিন পরে কলকাতার কবি-লেখক-শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এক শোভাযাত্রা বের করেন। মিছিলটি ছিল খুবই বড়। বাংলাদেশেরও অনেকে তাতে ছিলেন। সালিক লখেনৗভি জানান, সুচিত্রা মিত্র সেখানে গেয়েছিলেন: ‘বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি, বারে বারে হেলিসনে ভাই’। এবং আর এক শিল্পী গেয়েছিলেন: ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার—।’ নজরুলের উত্তেজক গান তো ছিলই।
তিনি বলেন, কিন্তু মিছিলটি উত্তাল হয়ে ওঠে যখন রজরুল-পুত্র কাজী সব্যসাচী সামনে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করতে শুরু করেন: ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির।’
ওই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী একমাত্র উর্দু কবি ছিলেন সালিক লখেনৗভি। তিনি তাঁর একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। কবিতাটির শিরোনাম: ‘জাগ্ উঠা বাংলাদেশ’ (‘বাংলাদেশ জেগে উঠেছে’)।
উর্দুতে কবিতার শুরুটা ছিল এ রকম:
জুলুম কে হাত মে আজ হ্যায় রাইফেল,
আজ মজলুম সিনে সিপার বান্ গায়ে।
হর্ সুহাগান কি আঁখো সে সোলে রাওয়া,
আজ বইনু কে আঁচল সে পরসম বানে
জুলুম সে জঙ্গি করলে বহে নওজোয়ান।

বাংলায় কবিতাটির অনুবাদ এ রকম:
অত্যাচারীর হাতে আজ আছে রাইফেল,
আজ নিপীড়িতের বক্ষ হয়ে গেছে ঢাল।
আজ প্রেয়সীদের চোখে ঝরছে আগুন শিখা।
আজ বোনদের শাড়ির আঁচল হয়ে গেছে পতাকা।
অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেছে যুবকেরা।
জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।

আজ পদ্মা ও মেঘনায় উঠেছে ঝড়
যুবকদের জোশ দেখে ঝড়ও লজ্জিত।
আজ পানির বদলে বইছে নদীতে রক্ত;
মাস্তুলে পাল নেই তবু চলছে নৌকো।
যেখানে মৃত্যু আছে সেখানে জীবন ছাড়া
অন্য কোনো গন্তব্য নেই
(যে মরতে যায় [স্বাধীনতার জন্য] তার সেটা মৃত্যু নয়—
মৃত্যুর ভেতরে অন্য জীবন)
আকাশ রক্তলাল, মুক্তি মিছিলের যুবকদের দেহ
তাদের রক্তের চেয়েও লাল।
জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।

আজ বাংলার বাতাসে যুদ্ধ;
আজ নজরুলের গানে উত্তেজনার ঝংকার;
আজ মাঝিদের গান থেকে আসছে আহ্বান
আজ নৌকার দাড়গুলো হয়ে গেছে তলোয়ার,
আজ রাখালের বাঁশিগুলো হয়ে গেছে হাতিয়ার।
জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।

.
.

মহাত্মা গান্ধী ও নজরুল সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে আমি ভারতের বাঙালি-অবাঙালি বহু নেতা ও কবি-সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিই। কয়েকবার কথা হয় সালিক লখেনৗভির সঙ্গে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে কাছে থেকে দেখেছেন। তাঁর লেখাও উর্দুতে অনুবাদ করেছেন। নজরুলকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জানতেন। সাংবাদিক হিসেবে গান্ধীজির সভা-সমাবেশের রিপোর্ট করেছেন। তিনি দুঃখ করে বলেন, ওই মিছিলে এই কবিতা পড়ার পর চার-পাঁচ মাস কলকাতার অবাঙালি মুসলমানরা আমাকে বয়কট করে। ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো উর্দু পত্রিকা আমার লেখা ছাপেনি। ’৭২ থেকে আবার আমার লেখা নেয়।
লখেনৗভি ছিলেন বাম-প্রগতিশীল শিবিরের মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আমাকে পাঠিয়েছিলেন পিপিআই নেতা ও লেখক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। সালিক লখেনৗভি তাঁর কলমি নাম, প্রকৃত নাম শওকত রিয়াজ কাপুর। তাঁরা আদিতে ছিলেন লখেনৗয়ের বাসিন্দা। তাঁর বাবা তুলসীরাম কাপুর লখেনৗভির জন্মের চার বছর আগে হুঁকা খাওয়া নিয়ে স্বধর্মাবলম্বীদের কাছে অপমানিত হলে ধর্মান্তরিত হন। তখন তাঁর নামকরণ হয় তারেক রিয়াজ কাপুর। তিনি ছিলেন উত্তর প্রদেশ কংগ্রেসের একজন গান্ধীবাদী নেতা এবং মতিলাল নেহেরু জওহরলাল নেহেরুর ঘনিষ্ঠ।
লখেনৗভির জন্ম ১৬ ডিসেম্বর ১৯১৩। তিনি শতায়ু পেয়েছিলেন। মারা যান ৪ জানুয়ারি ২০১৩। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের বিএ এবং বিকম করেন কলকাতা সিটি কলেজ থেকে। এমএর সমমানের ডিগ্রি ‘দাবির-ই-কামিল’ (ফারসি ভাষায়) করেন লখেনৗ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
ছাত্রজীবন থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ছিলেন, বাইরে করতেন কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। গান্ধীজির আহ্বানে ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৩ মাস কারাগারে ছিলেন।
প্রগতি লেখক সংঘের বঙ্গীয় শাখার তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। মুন্সি প্রেমচন্দের সঙ্গে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠতা। সক্রিয় ছিলেন আইপিটিএর সঙ্গে।
১৯৪১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ছোটগল্পের বই আজ্রা আউর দিগার আফসানে। অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, টলস্টয়, ডিকেন্স ও মোপাসাঁর গল্প। বে-সার-ও-পাসহ রয়েছে তাঁর কয়েকটি কবিতার বই।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কংগ্রেসের প্রতি হতাশ হয়ে দল ছেড়েই দেন ১৯৪৯ সালে। কর্মী ছিলেন আগে থেকেই, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ পান ১৯৫১-তে।
১৯৫৬-তে সালিক নাখেনৗভির সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উর্দু দৈনিক আফসার। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন এটির প্রধান সম্পাদক। দুটি দৈনিক আসরে জাদিদ এবং রোসানা হিন্দ্-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজসেবায় সমান সক্রিয় ছিলেন লখেনৗভি। নারী ও শিশু সদন ‘ক্যালকাটা মুসলিম অরফানেজ’-এর তিনি ছিলেন প্রধান পরিচালক। প্রতিষ্ঠা করেন সিএমও হাই স্কুল। ছিলেন আঞ্জুমানে তারাক্কি-ই-উর্দুর পরিচালক। ছিলেন আশির দশকে কলকাতা পৌর কর্পোরেশনের অল্ডারম্যান। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ ও অন্যান্য পুরস্কার। দুই মেয়ে ও চার ছেলের মধ্যে ওয়াসিম কাপুর একজন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী।
মহাজোট সরকার মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখায় বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা দিয়ে একটি জাতীয় কর্তব্য পালন করেছেন। আমি চিনি এমন কেউ কেউ পেয়েছেন যাঁদের অবদান খুবই সামান্য। সম্মাননা প্রাপকদের তালিকায় তাঁর নাম না থাকার বিষয়টি আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করি। ওই সম্মান ও স্বীকৃতি মরণোত্তর হলেও সালিক লখেনৗভি এবং কাজী সব্যসাচীর প্রাপ্য।