মেধস মুনির আশ্রমে

গুমোট মেঘলা আকাশ। এই বুঝি এল বৃষ্টি। দূর থেকে বউ কথা কও পাখির সুরেলা ডাক ভেসে আসছে কানে। পাহাড়ের পাদদেশে ইট বিছানো রাস্তা ধরে যেতেই ঝিঁঝি পোকার অন্য রকম ঝিরিঝিরি সুর। সেগুনসহ নানা গাছগাছালিতে ভরা পাহাড়ের সুনসান নিস্তব্ধ পরিবেশে নানা জাতের পাখির সুরেলা ডাক যখন কান খাড়া করে শুনছিলাম, ঠিক তখনই ভেসে এল মানুষের শব্দ। বোঝা গেল গন্তব্য সন্নিকটে।

কিছু সময় পর দেখা মিলল পাহাড়ের একেবারে পাদদেশে রাস্তার ধারে গণেশ মন্দিরের। এরপরই রাস্তা শেষ। ততক্ষণে আমরা পৌঁছে গেলাম চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার দূরে মধ্যম করলডেঙ্গা গ্রামের করলডেঙ্গা পাহাড়ের ধারে। আমাদের গন্তব্য এ পাহাড়ের ওপরে থাকা মেধস মুনির আশ্রম।

সিঁড়িপথের কয়েকটি ধাপ বেয়ে উঠলেই সুন্দর ফটক। সিঁড়ি বেয়ে উঠছি আর দখিন হাওয়া ও পাখির গান অনুভব করছি। হাতের ডানে দূরে তাকালেই বিশাল সবুজ মাঠ। পুরো পাহাড় সেগুনগাছে ভরা। ভূমি থেকে প্রায় ১৩৫টি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে দেখা মিলল ঝুপড়ি চায়ের দোকান ও ছোলা–বেগুনির দোকান। এইটুকু পথ উঠতেই আমরা হাঁপিয়ে উঠেছি। আরও কয়েকটি সিঁড়ি ওঠার পর মেধস মুনির সমাধি মন্দির।

দ্বিতল মন্দিরের নিচতলায় মেধস মুনির বিগ্রহ ও দোতলায় রয়েছে শিবের বিগ্রহ। এ মন্দির থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার পথে পাঁচটি ফুলের তোরণ পার হলেই মূল চণ্ডীমন্দির। তোড়ণগুলো ফুলে ছেয়ে আছে। প্রকৃতি যেন নিজের মতো সেজে আছে।

আমরা পৌঁছে গেলাম মূল মন্দিরে। তখনও পুজো শুরু হয়নি। বেরিয়ে পড়লাম আশপাশের মন্দির দেখার জন্য। সবাই যে পথে যান, আমরা ঠিক তার উল্টা পথে হাঁটতে শুরু করলাম। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই পেয়ে গেলাম সীতার মন্দির। তখন দূর কোনো মন্দির থেকে ভেসে এল গীতাপাঠের শব্দ। পাশাপাশি পাখির কলরব। সীতামন্দিরের কাছে পৌঁছতেই শুরু হয়ে গেল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। মন্দির দেখা শেষে সেগুনপাতা ছিঁড়ে মাথার ওপর ধরে পরের পাহাড়ের দিকে উঠতে শুরু করলাম। সে সময় যাঁরা সঠিক পথে আসছিলেন, তাঁদের একজন বিশ্বনাথ নাথকে জিজ্ঞেস করলাম, ওই পথে মূল মন্দিরে ফিরে যাওয়া যায় কি না। তিনি হ্যাঁ–সূচক জবাব দিয়ে বললেন, ওই পথে আরও তিনটি মন্দির দেখে মূল মন্দিরে যাওয়া যায়।

ধীর পায়ে ওঠা শুরু করলাম। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রথমে দেখলাম কালীমন্দির। বৃষ্টি বেড়ে গেল। বৃষ্টিতে ভেজা থেকে বাঁচতে কালীমন্দিরের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে আশ্রয় নিলাম। আর বাইরের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি আর প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধন উপভোগ করলাম। প্রকৃতি যে এত সুন্দর হয়, তা গভীর মনোযোগ না দিলে অনুভব করা যায় না। বৃষ্টি কিছুটা কমতে শুরু করলে সঙ্গীরা জানালেন এখন যেতে হবে। আরও পথ বাকি। উঠে আবার রওনা দিলাম।

গাছের ছায়ায় থাকা সিঁড়িগুলোয় শেওলা জমেছে। বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। সাবধানে পা ফেলে কিছু দূর নেমে আবার পাহাড়ি উঠতি পথে পাওয়া গেল শিবমন্দির। এরপর কাঙ্ক্ষিত গীতাপাঠ হওয়া মন্দিরের দিকে যাত্রা শুরু। কিছু দূর হাঁটার পর পাওয়া গেল কামাক্ষ্যার মন্দির। এ মন্দির থেকে কিছু ভক্তের গীতাপাঠের শব্দ মাইকে ভেসে আসছিল। এ মন্দির থেকে কিছু দূর হাঁটার পর রংবেরঙের সিঁড়ি বেয়ে ফিরে এলাম মূল মন্দিরে।

এসব মন্দির চতুর্ভুজ পাহাড়ে স্থাপিত। অসাধারণ সুন্দর মন্দির ও প্রকৃতি যেন প্রতিদিনই পর্যটকদের কাছে টানে। প্রতিটি মন্দির ও সিঁড়িতে ভক্ত ও পর্যটকেরা ছবি ও সেলফি তুলতে ভোলেন না। অসাধারণ প্রকৃতি। পাহাড়, গাছগাছালি ও পাখিদের মেলবন্ধন।

এরপর পুজো শেষ। আশ্রমের এক পাশে ভক্তরা লাইন ধরে বসে প্রসাদ নেওয়ার পর প্লেট জমা দিয়ে গেলাম নিমগাছের গোড়ায় থাকা ১০টি কচ্ছপ দেখতে। ভক্তরা মানত করে কচ্ছপগুলো ছেড়ে গেছে গাছের নিচে। সবাই ছবি তুলছে কচ্ছপগুলোর সঙ্গে।

সর্বশেষ দক্ষিণা কালীবাড়ি পরিক্রমা শেষে আমাদের কাজ শেষ। এবার বাড়ি ফেরার পালা।