রহস্যঘেরা আলীর সুড়ঙ্গ

দিনটি ছিল ২৭ জুন। সকাল থেকে মেঘলা আকাশ। তার পরও রওনা হলাম। উদ্দেশ্য আলীকদমের আলীর সুড়ঙ্গ অভিযান। সঙ্গী হলেন শাহ আলমগীর ও আবু মোরশেদ চৌধুরী। সকাল সাতটায় যাত্রা শুরু। কক্সবাজার থেকে সড়কপথে চকরিয়া। এরপর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা সদর। পাশেই সেনাজোন। তার পাশে মাতামুহুরী নদী। যা মিয়ানমারের পাহাড় থেকে সৃষ্টি হয়ে সর্পিল গতিতে আলীকদম, লামা, চকরিয়া, পেকুয়া হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে।
সেনাজোনের পাশে (সেতুর নিচে) মাতামুহুরী নদী থেকে ডিঙি নৌকায় এবার নদীপথে যাত্রা। আমাদের সঙ্গে যোগ দিল আদিবাসী দুই তরুণ। মূলত তাঁরা আমাদের গাইড।
সেতু থেকে নৌকায় আধা কিলোমিটার গেলে তৈন নদী। এই শাখা নদীর চার কিলোমিটার গেলেই আলীর পাহাড়। নৌকা থেকে নেমে পাহাড়ের দিকে আবার হাঁটা শুরু। দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে পানি মাড়িয়ে এগিয়ে চলেছি। বিস্তৃত সবুজের বুক চিরে যাচ্ছি। পিচ্ছিল পথ। এক কদম এগোয় তো দুই কদম পেছনে যায়। এভাবে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হাঁটলাম। অবশেষে সুড়ঙ্গের দেখা। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুটো উঁচু পাহাড়ের একটির মধ্যভাগে দেখা যাচ্ছে সুড়ঙ্গে ঢোকার প্রবেশমুখ। নিচ থেকে প্রবেশমুখ পর্যন্ত ওঠানামার জন্য রাখা হয়েছে একটি লোহার সিঁড়ি। সিঁড়ি ভেঙে সুড়ঙ্গের মুখে পা রাখলাম। মনে হলো এভারেস্ট জয় করেছি।
সুড়ঙ্গের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একবারে গা ছমছমে অন্ধকার। এর মধ্যে এক ঝাঁক বাদুড় উড়ে গিয়ে ভয়টা আরও বাড়িয়ে দিল। পকেট থেকে মুঠোফোন ফোন বের করে আলো জ্বালানো হলো। সেই আলোয় সুড়ঙ্গের অন্ধকার কিছুটা দূর করে সামনে পা ফেলছি। সুড়ঙ্গের নিচে জমে থাকা অল্পস্বল্প পানিতে পথটি পিচ্ছিল হয়ে গেছে। আদিবাসী তরুণেরা আমাদের হাত ধরে টেনে ৬০-৭০ মিটার পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। ভয়ংকর গুহা। আর সামনে এগোনো যাচ্ছে না। নিচে সাপসহ বন্য প্রাণী থাকতে পারে—এই আতঙ্কে ভর করেছে। এবার ফিরতি পথ ধরলাম। ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল পাঁচটার ঘরে।
আদিবাসী তরুণেরা জানান, এই সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ৭০০ মিটারের মতো হব্ে। তাঁরা পর্যটকদের সঙ্গী হয়ে ২০০ মিটার পর্যন্ত গিয়েছিলেন। বাকি পথ যাওয়া সম্ভব হয়নি।
দুর্গম পাহাড়ে আলীর সুড়ঙ্গটি কীভাবে তৈরি হলো? কে তৈরি করলেন? কেন করলেন—এই ইতিহাস অজানা। তবে এই সুড়ঙ্গ নিয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। জানা গেল, ১৮ জন আরাকানি (মিয়ানমার) রাজা রাজ্য পরিচালনার সুবিধার্থে মুসলিম উপাধি ধারণ করেন। এর মধ্যে ১৪৩৪-৫৯ খ্রিষ্টাব্দে শাসন কাজ পরিচালনা করেন রাজা মংখারি। তাঁর মুসলিম উপাধি ছিল ‘আলী খাঁন’। ১৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে রাজত্ব করেন রাজা থাজাথা। তাঁর মুসলিম উপাধি ছিল আলী শাহ। এ কারণে এলাকার নাম আলীকদম। সুড়ঙ্গের নাম আলীগুহা হতে পারে।
জনশ্রুতি আছে, ৩৬০ আউলিয়া উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। এঁদের মধ্যে একটি অংশ বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলামের জয় নিশান উড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আলী নামের কোনো আউলিয়া থাকতে পারেন। যাঁর পদধূলিতে নাম হয়েছে আলীকদম বা আলী গুহা। যঁারা পাহাড় নদী, ঝরনা আর অরণ্য পাছন্দ করেন-তাঁদের জন্য আলীকদম অনন্য স্থান। তাহলে আর দেরি কেন? বেরিয়ে পড়ুন ঈদের ছুটিতে।
যেভাবে যাবেন : চট্টগ্রাম অথবা কক্সবাজার থেকে সড়কপথে আলীকদম। তারপর সেনাজোন থেকে নৌকায় আলীর সুড়ঙ্গে। সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসা যায়। সুড়ঙ্গে ঢুকতে হলে স্থানীয় আদিবাসীদের গাইড হিসেবে নিতে হবে।