রিমনের ছবিতে সচেতনতার বার্তা

এ ধরনের সচেতনতামূলক ছবি ফেসবুক প্রচারণায় ব্যবহার করেন সাঈদ রিমনছবি: সংগৃহীত

সাঈদ রিমনের ফেসবুক প্রোফাইলে আচমকা কেউ ঢুঁ মারলে, রীতিমতো ধন্দে পড়ে যাবেন। কারণ, ফেসবুকে কখনো তিনি সবজি বিক্রেতা। ঢাকার কারওয়ান বাজারে কাঁচাবাজারের ডালির ভেতরে ঘুমিয়ে রয়েছেন। কখনো চাকরি না পাওয়া বেকার যুবক। সাক্ষাৎকার দিয়ে বের হচ্ছেন। বগলে ফাইল, মাথায় হাত, চোখের কোণে পানি। কখনো মলম পার্টির সদস্য। বাসযাত্রীর মুখে রুমাল ধরছেন। কখনো রিকশাচালক। ভাড়া নিয়ে যাত্রী তাঁর গালে চড় তুলেছেন। কখনো ছিনতাইকারী। বাসযাত্রীর হাত থেকে মুঠোফোন ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছেন। আবার তিনিই মাদকসেবীর ভূমিকায়!

সাঈদ রিমনকে যারা চেনেন, তারা জানেন, এসবই তাঁর অভিনয়। রিমন যেমনটি বলেন, ‘আমি এমন প্রায় ৬৫০ দৃশ্যে অভিনয়ের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছি। এসব ছবির মাধ্যমে আমি মানুষকে সচেতন করাই আমার উদ্দেশ্য।’ এ কারণেই প্রতিটি পোস্টে তিনি লিখে দিয়েছেন জনসচেতনতামূলক বার্তাও।

সাঈদ রিমনের তৈরি করা আরেকটি ছবি

বছর কয়েক আগে তাঁর এই সচেতনতামূলক পোস্ট ব্যবহার করে পুলিশ বিভাগ দেশের বিভিন্ন শহরে বিলবোর্ড তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের দেওয়ার জন্য তৈরি করে হাজার হাজার স্টিকার। এমনকি পর্যটন পুলিশের ফেসবুক পেজেও ব্যবহার করা হয়েছে রিমনের ফেসবুক পোস্ট। সাঈদ রিমন নিজেও প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলি করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, গণপরিবহনে। হ্যান্ডমাইক নিয়ে প্রায়ই ছুটে যান বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনসহ জনাকীর্ণ স্থানে, সচেতন করেন মানুষকে।

সাঈদ রিমন পেশায় বস্ত্র প্রকৌশলী। বর্তমানে গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন। তবে এখন অনেকের কাছে তিনি স্রেফ ‘সচেতনতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে পরিচিত। মানুষের জীবনকে বিপদমুক্ত ও স্বচ্ছন্দ করার জন্য সচেষ্ট সাঈদ রিমনের বয়স ৩২ বছর। ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বস্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক হয়েছেন। সাঈদ রিমনের বাড়ি বরগুনা জেলায়। মানুষকে সচেতন করার শুরুটা তিনি করেছিলেন নিজ জেলা থেকেই। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালের দিকে, আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে সময় বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরি করে স্থানীয় কেব্‌ল অপারেটরদের মাধ্যমে প্রচার করতাম।’

সে সময় সড়ক দুর্ঘটনায় পরিচিত একজনকে হারান সাঈদ রিমন। প্রিয়জন হারানোর শোক বুকে চেপে তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেন। একসময় তা বিস্তৃত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা এখনো তিনি অব্যাহত রেখেছেন।

করোনাকালে অসহায়ের পাশে

সচেতনতার বার্তা ছড়ানো সাঈদ করোনাকালে দাঁড়িয়েছিলেন অসহায় মানুষের পাশে। এ উদ্যোগে তিনি পাশে পেয়েছিলেন শুভাকাঙ্ক্ষীদের। তাঁদের সহায়তায় কেনা খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন অসহায় মানুষের হাতে, কখনো রান্না করা খাবারের প্যাকেট তুলে দিয়েছেন রাজধানীর নিরন্ন মানুষের হাতে।

সাঈদ রিমন জানালেন, করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকলে সরকার যখন ছুটি ঘোষণা করল, সে সময় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের হাতে খাদ্যসামগ্রীর ব্যাগ তুলে দিয়েছেন তিনি। নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আলু আর একটা সাবানসমেত সে ব্যাগে তিন সদস্যের পরিবারের জন্য প্রায় সাত দিন চলার মতো খাবার থাকত। শুধু খাদ্যসামগ্রী বিতরণই নয়, বিমানবন্দরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৯ হাজার পথশিশু ও ভাসমান মানুষকে তিনি বিভিন্ন সময় রান্না করা খাবার খাইয়েছেন।

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয় সম্পর্কে সাঈদ রিমন বলেন, ‘সংকটের সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো তো সবার কর্তব্য। আমি আমার দায়িত্বটুকু পালন করেছি মাত্র।’ আর সচেতনতা কার্যক্রম? সাঈদ রিমনের ঝটপট উত্তর, ‘সে তো আমার রক্তে মিশে গেছে। চেষ্টা করছি আরও বড় পরিসরে সচেতনতার বার্তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার।’