রেস্তোরাঁয় খাওয়া, এখন...

শুধু রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ নয়; যাঁরা খেতে যাচ্ছেন, সচেতন থাকতে হবে তাঁদেরও
মডেল: ফারহান ও সায়রা, ছবি: কবীর হোসেন, কৃতজ্ঞতা: স্টেক রিপাবলিক

খাওয়াদাওয়া বাঙালির চিরন্তন সংস্কৃতির অংশ। রেস্তোরাঁয় বন্ধুরা মিলে খেতে বসবে আর জম্পেশ আড্ডা হবে না—অন্তত বাঙালি তো এমনটা ভাবতেই পারে না। গত কয়েক বছরে রেস্তোরাঁশিল্পের পরিসর বেড়েছে অনেকটাই। একদিকে দল বেঁধে নানা রেস্তোরাঁয় খাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিভিউ লেখাটা ‘ট্রেন্ডি’ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তরুণ উদ্যোক্তারাও আমাদের নতুন নতুন রেস্তোরাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু করোনা মহামারির ধাক্কায় বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এই শিল্প।

গত এপ্রিলে প্রকাশিত একটি জরিপে রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়াকে করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তখন থেকে শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো পৃথিবীতেই বাইরে খাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। রমজান মাস রেস্তোরাঁ ব্যবসার জন্য ‘পিক টাইম’। এই সময়ে রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকাটা একজন ব্যবসায়ীর জন্য কতটা দুঃখজনক, সেটা বলে বোঝানো যাবে না।

তারপরও অনলাইন ডেলিভারি ও খাবার ডেলিভারি অ্যাপগুলোর কল্যাণে কিছু ব্যবসা চালু ছিল। সেটি ফাস্ট ফুড, বার্গার, বিরিয়ানি, তেহারি—এ ধরনের খাবারের জন্য যতটা প্রযোজ্য, ফাইন ডাইনের জন্য নয়। স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট টানা ৪ মাস পুরোপুরি বন্ধ ছিল। নর্থ অ্যান্ড ও গ্লোরিয়া জিনসের মতো কফিশপ তাদের সোফাগুলো সরিয়ে ফেলেছিল। ভোজনরসিকেরাও পছন্দের রেস্তোরাঁগুলোতে না যেতে পেরে হাঁপিয়ে উঠেছিল।

আবার যেন সব স্বাভাবিক

ধীরে ধীরে আবার সব ‘স্বাভাবিক’ হলো। অফিস খুলল, রাস্তায় যানজট ফিরে এল, রেস্তোরাঁগুলোও খোলা শুরু হলো। খাবারের দোকানে আবার বাড়ল মানুষের ভিড়। গত দুই মাসে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। বড় বড় রেস্তোরাঁয় গেলে মনেই হবে না স্কুল এখনো খোলেনি, এইচএসসি পরীক্ষা হয়নি, বেশ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান এখনো কর্মীদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ সুবিধা রেখেছে।

ফুডপান্ডা, সহজ, পাঠাও থেকে শুরু সব ডেলিভারি অ্যাপের অর্ডার বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অনেকে বাসায় রান্না করা খাবারের ফেসবুক পেজ চালু করেছেন, বিক্রিও বেড়েছে বেশ। কিন্তু রেস্তোরাঁয় খেয়ে যাদের অভ্যাস, বাসায় বসে খেয়ে তাদের পেট ভরলেও মন ভরে না। পরিবার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে সপ্তাহান্তে অনেকেই বাইরে খেতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর গুলশান-বনানী-ধানমন্ডিতে বেশ কিছু নতুন রেস্তোরাঁ বা ক্যাফে যেমন খুলেছে, তেমনি অনেকগুলো বন্ধও হয়েছে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে স্টেক আর বারবিকিউয়ের নামকরা রেস্তোরাঁর নতুন কয়েকটি শাখা। বেশ বড় জায়গা নিয়ে শুরু করেও তারা ক্রেতা পাচ্ছে তুলনামূলক কম।

সচেতনতা সবার জন্যই

অনেক নামী রেস্তোরাঁ ঢোকার মুখে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করছে, তাপমাত্রা মাপছে। কিন্তু কারও মধ্যে যদি সংক্রমণ হয়েই যায়, তা তো আর বোঝা সম্ভব নয়। এদিকে খাওয়ার সময় মাস্ক খুলেই খেতে হয়, তাই সংক্রমণের আশঙ্কা অনেক বেশি। ঢাকার ৯৯ শতাংশ রেস্তোরাঁ ভবনের ভেতরে। বাইরে খোলা জায়গায় বসার ব্যবস্থা নেই। তাই শারীরিক দূরত্ব মেনে বসার সুযোগ নেই বললেই চলে। তবু রেস্তোরাঁগুলো সীমাবদ্ধতার মধ্যেই যতটুকু সম্ভব সচেতনতা বজায় রাখতে পারে।

শীতকালে করোনার প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু শীত তো বাঙালির কাছে উৎসবেরও সময়। পিঠা খাওয়া, কাবাব-পরোটা খাওয়া, বাড়ির ছাদে বারবিকিউয়ের আয়োজন, বিয়ে ও কনসার্টের ধুম পড়ার সময়ে বাঙালি কীভাবে নিজেকে সংযত রাখবে, সেটা দুশ্চিন্তার বিষয়।

রেস্তোরাঁর মালিকদের একতরফা দোষ দেওয়াটাও ঠিক হবে না। যেখানে রেস্তোরাঁর ভাড়া দিতে গিয়েই ৪০ শতাংশ খরচ হয়, সেখানে শুধু অনলাইন ডেলিভারি দিয়ে তো ব্যবসা চালানো যায় না। ক্রেতাদের নিজেদের অনেক সংযত হতে হবে। ভিড় দেখলে অন্যত্র যেতে হবে। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা কেমন, তা-ও দেখতে হবে। যতটা পারা যায় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। আজকাল অনেক রেস্তোরাঁ সচেতন হয়েছে। একটি করে টেবিল ফাঁকা রেখে বসার ব্যবস্থা করেছে কোনো কোনো রেস্তোরাঁ। ক্রেতা কম থাকলেও রেস্তোরাঁর কর্মীদের ব্যস্ততা কমেনি। বারবার চেয়ার-টেবিলগুলো মুছতে হচ্ছে যে! এই চেষ্টা যেসব রেস্তোরাঁ চালু রেখেছে, তাদের সাধুবাদ জানাই। দিন শেষে সবাই মিলেই তো ‘ভালো থাকা’। এই দুঃসময় কথাটা আমাদের আরও ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে।