সানজিদা জানেন না, এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে গেছে

নাটোরে শিক্ষার্থী সানজিদার মুখে অ্যাসিড নিক্ষেপের প্রতিবাদে বন্ধুসভার মানববন্ধনছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ থেকে ২০২১ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন সানজিদা খাতুন। সামনে পরীক্ষা, তাই প্রস্তুতি নিতে নাটোরে নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। ২১ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রাইভেট পড়ে বাড়িতে ফিরছিলেন সানজিদা। বাড়ির কাছাকাছি লালমনিপুর সেতুর ওপর উঠতেই একজন তাঁর মুখে অ্যাসিড ছুড়ে পালিয়ে যায়। ওই অবস্থাতেই দৌড়ে বাড়িতে ছুটে যান সানজিদা। তক্ষুনি তাঁকে নাটোর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। অবস্থার অবনতি হলে সেই রাতেই তাঁকে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই এখন তাঁর চিকিৎসা চলছে।

সানজিদার ডান চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটও হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক মো. সাইফুল্লাহ জানান, সানজিদার মুখের একপাশ, ভেতরসহ চোখের কর্নিয়া পুড়ে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর এখন কিছুটা ঠিক হয়েছে। কিন্তু বার্ন ইউনিটের যে সার্জারি এখনো বাকি আছে, সেটা করার মতো অবস্থা এখনো আসেনি। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করলে হয়তো তিনি আবারও দেখতে পাবেন, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া আরও পরের বিষয়। সানজিদার চোখের প্রাথমিক ক্ষতটাই এখনো ঠিক হয়নি।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন সানজিদার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ‘জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা মেয়েটির চোখে একটা লেন্স পরিয়ে দিয়েছেন। এখন আমরা তাঁদের পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করছি। পর্যবেক্ষণ-পরামর্শের পর আমরা সানজিদার চোখে একটি অপারেশন করব। বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরাই এটা করবেন। তারপর সানজিদাকে চোখের চিকিৎসা নিতে হবে।’

২.

সানজিদার এ ঘটনা আমাদের নতুন সহস্রাব্দের প্রথম কয়েক বছরের কথা মনে করিয়ে দিল। তখন প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় আসত অ্যাসিড-সন্ত্রাসের খবর। এর মধ্যে ২০০২ সালে ঘটে সর্বোচ্চ অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা—সারা দেশে ৪৯৪। গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ও বহুমুখী কার্যক্রমের কারণে গত ২২ বছরে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের সংখ্যা কমে এসেছে। অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে ১৬টি আর ২০২১ সালে ৫টি।

সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ অপরাধ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে শক্ত আইন ও তার প্রয়োগ। কিন্তু আশঙ্কার কথা হচ্ছে, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কিছু ঘটনা এখনো ঘটছে। যতই বিচ্ছিন্নভাবে হোক না কেন, যাঁর জীবনে এ দুর্ঘটনা ঘটছে, তিনি ও তাঁর পরিবারই জানে, কতটা প্রাণান্তকর হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর যুদ্ধ। আইনজ্ঞরা বলছেন, অ্যাসিড-সন্ত্রাস কমলেও বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। সানজিদা খাতুনের ঘটনাতেই তার কিছু আলামত পাওয়া গেল।

ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত মাহিম হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি এখন কারাগারে বন্দী আছেন। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নাটোর সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাদাত হোসেন জানান, ‘ভিকটিম (সানজিদা) ঘটনার পর থেকে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এখনো চোখে ঝাপসা দেখছেন সানজিদা। মানসিকভাবেও তিনি এখন অসুস্থ। এ অবস্থায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না। বিচারকের সামনে জবানবন্দি দেওয়ার জন্যও তাঁকে এখনই নেওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া ঘটনার সময় ভিকটিম, আসামির পরিহিত কাপড় ও জব্দ করা অ্যাসিডের বোতল পরীক্ষা করার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেও এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন আসেনি। এ কারণে মামলাটির অভিযোগপত্র এখনই দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

মাহিম হোসেন কীভাবে, কার কাছ থেকে অ্যাসিড সংগ্রহ করেছিলেন, সেটা জানা গেছে কি, এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ‘আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ না করলে এ ব্যাপারে তথ্য পাওয়া মুশকিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমরা আদালতের কাছে আসামির রিমান্ড চেয়েছিলাম। শুনানি শেষে আমাদের আবেদন নাকচ হয়েছে। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। আমরা অ্যাসিড সরবরাহকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।’­

নাটোরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) আরিফুর রহমান সরকার জানান, ‘অ্যাসিড মামলা তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রথমে ৬০ দিন সময় পান। কোনো কারণে তদন্ত শেষ করতে না পারলে আদালতের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারেন। বিশেষ কারণে তিনি হয়তো তা করেছেনও। আশা করছি, ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হবে।’

ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এবং এএসএফ–এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনার সংখ্যা শূন্যে নামানো যাচ্ছে না? তিনি বলেন, ‘সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টিকে দেখেছিল বলেই কিন্তু আমরা এ অপরাধের সংখ্যা কমাতে পেরেছি। আমাদের সুশীল সমাজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সবাই একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু আমরা যখন নীরব হয়ে যাব, তখনই কিন্তু আবার এ অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। নাটোরের এ ঘটনার ক্ষেত্রেও যা আমরা দেখতে পেলাম। এসব ঘটনায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। সেই সঙ্গে জাতীয় অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল, জেলা অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কমিটি এবং ল মনিটরিং সেলের সক্রিয় ভূমিকা খুব দরকার। অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এবং তাঁদের চিকিৎসার জন্য জাতীয় অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। জেলা অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ কমিটি আছে। সেসব জায়গায় বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। দেখতে হবে ভুক্তভোগীর চিকিৎসার জন্য সেই জেলা কমিটি কাজ করছে কি না। ল মনিটরিং সেল নিজেদের কাজ ঠিকমতো করছে কি না।’

৩.

অ্যাসিড-সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন, মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা ও অ্যাসিড-সন্ত্রাস নির্মূলের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে এএসএফ। একই উদ্দেশ্যে ২০০০ সালে গঠন করা হয় ‘অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল’। ‘আর একটি মুখও যেন অ্যাসিডে ঝলসে না যায়’—এই অঙ্গীকার নিয়ে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন, ফিচার, সম্পাদকীয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে প্রথম আলো, যেখানে অ্যাসিড-সন্ত্রাস, সেখানেই প্রতিরোধ-প্রতিপাদ্যে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি, জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি অ্যাসিড-সহিংসতার শিকার নারীদের নানা রকম সহায়তা দিয়েছে ‘অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল’। ২০০৯ সাল থেকে প্রথম আলো ট্রাস্ট এই তহবিলের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। এ পর্যন্ত ৪৫৬ জন অ্যাসিডদগ্ধ নারীকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ঘটনার দিন থেকেই নিয়মিত সানজিদা, তাঁর পরিবার ও চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে প্রথম আলো ট্রাস্ট । তারা দুর্বৃত্তকে শাস্তির আওতায় আনতে মানববন্ধন করেছে। বার্ন ইউনিটের চিকিৎসা শেষ হলে সানজিদার চোখের চিকিৎসার জন্য সব ধরনের সহায়তা করবে প্রথম আলো ট্রাস্ট। তারই খোঁজখবর করতে ২৫ জানুয়ারি কথা হয় সানজিদার সঙ্গে।

অ্যাসিড-সন্ত্রাসের শিকার নারী
প্রতীকী ছবি

এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন সানজিদা, ‘এখান থেকে যখন ছাড়া পাব, তখন হয়তো আর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থাকবে না। কত পড়া বাকি। কী আর করা, আগে তো চিকিৎসা। দোয়া করবেন।’

সানজিদা তখনো জানেন না, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে গেছে। চোখে দেখতে পারছে না বলে জানেন না, কত বদলে গেছে তাঁর চেহারা। তিনি শুধু জানেন, খেতে গেলে, কথা বলতে গেলে তাঁর মুখে একটু টান লাগে। তিনি কেবল জানেন, সংক্রমণটা সেরে গেলেই চোখের অস্ত্রোপচার করা যাবে। আবার তিনি দেখতে পাবেন!

কিন্তু আসলেই কি তিনি দেখতে পাবেন?

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করেছেন প্রথম আলোর নাটোর প্রতিনিধি মুক্তার হোসেন]

লেখক: সমন্বয়ক, প্রথম আলো ট্রাস্ট